সাত কলেজ অধিভুক্তি ইস্যুতে আন্দোলন

আন্দোলনের সাতকাহন

  এম এস আই খান ৩০ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সরকারি সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পর প্রায় এক বছর হতে চলল অথচ এখনও সমাধান মেলেনি নতুন করে অধিভুক্ত হওয়া কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের। তাই শুরুর দিকে অধিভুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ-উল্লাস থাকলেও নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও ফলাফল না পাওয়ায় আনন্দের চেয়ে এখন হতাশাই যেন বেড়ে চলেছে।

অন্যদিকে, সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি থেকে বাদ দেয়ার দাবিতে চলতি বছর বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় এক অংশ শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অফিসের তথ্য মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সাত কলেজ যুক্ত হওয়ার আগে ১০৯টি প্রতিষ্ঠান অধিভুক্ত ছিল। আর নতুন করে অধিভুক্ত হওয়া এই সাত কলেজ নিয়ে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৬টি। সাত কলেজ অধিভুক্ত হওয়ার প্রায় এক বছরের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন এত বড় অসন্তোষ দেখা দিল?

এমন প্রশ্নের অনুসন্ধানে নেমে দেখা গেছে, কোনো ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন থেকে এই সাত কলেজকে নিজের অধীনে নিয়ে নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও ফলাফল না দিতে পারায় বড় ধরনের অসন্তোষ জন্ম নেয় অধিভুক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এক ব্যাচের পর আরেক ব্যাচ আসতে থাকে আন্দোলনে। এসব আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে সিদ্দিকুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থী নিজের চোখ হারিয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের হিমশিম অবস্থা:

নতুন অধিভুক্ত শিক্ষার্থীদের এমন লাগাতার আন্দোলনের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ২০১৭-২০১৮ সেশনে প্রথম বর্ষ ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলে এসব কলেজে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মেধাতালিকা ধরে ভাইভার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অফিসে ডাকা হয়। আবেদনের ফি জমা দিতে তারা ভিড় করতে থাকে ক্যাম্পাসের ব্যাংকে। হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাত কলেজের ৩২ হাজার আসনে ভর্তিচ্ছু বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকদের ভিড় দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসার সমালোচনা করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে মানববন্ধনের ডাক দেয়। গত ১১ জানুয়ারি হাজারখানেক শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে নতুন অধিভুক্ত কলেজকে বাদ দেয়ার দাবি জানায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ১০৯টি প্রতিষ্ঠান অধিভুক্ত হিসেবে থাকলেও কেন এই সাত কলেজের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলন? জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, বাকি অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কেউ এখানে (ক্যাম্পাসে) ভিড় করে না। ১৯৯২ সালের আগে এসব কলেজ অধিভুক্ত থাকলেও তখন অনলাইনের যুগ ছিল না। এখন সবাই অনলাইনে চাকরির আবেদন করে। বিশ্ববিদ্যালয় অপশনে তারা এবং আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয় লিখছি। বাকি অধিভুক্তদের পড়ার বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন থাকায় তাদের সাবজেক্ট দেখে বোঝা যায় তারা অধিভুক্ত। কিন্তু এই সাত কলেজে পড়ানো ৩০টি বিষয়ই আমাদের আছে। তাই অনলাইনে বোঝা যাচ্ছে না কে অধিভুক্ত কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাই চাকরির শর্ট লিস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাদ পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও শেষ পর্যায়ে গিয়ে অধিভুক্ত শিক্ষার্থীর আসল পরিচয় জানা যাবে, কিন্তু ততক্ষণে তো শর্টলিস্টের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ছিটকে পড়বেন।

অধিভুক্তবিরোধী আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা :

১১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অধিভুক্তবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বৃহৎ হতে শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা দমনে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে গত ১৫ জানুয়ারি সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন অধিভুক্তবিরোধী আন্দোলনকারীদের দমিয়ে দেয়। সে সময় অভিযোগ ওঠে, ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করে এবং আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক মশিউর রহমান সাদিককে মারধর করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলো নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্রী লাঞ্ছনার বিচার দাবি করে আন্দোলনে নামে। ১৭ জানুয়ারি নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা প্রক্টর কার্যালয়ের ফটক ভেঙে প্রক্টরকে চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রক্টরকে নিয়ে তারা উপাচার্যের কাছে যান এবং ঘটনার বিচার চেয়ে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। ১৮ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাতনামা ৫০-৬০ জন ছাত্রকে আসামি করে উল্টো মামলা দিয়ে বসলে ওইদিন মধ্যরাত থেকেই ক্যাম্পাসে ফের বিক্ষোভ শুরু হয়। ছাত্রী নিপীড়নকারীদের বহিষ্কার, প্রক্টরের পদত্যাগ, মামলা প্রত্যাহার ও সাত কলেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ২৩ জানুয়ারি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানকে অবরুদ্ধ করেন। এসময় প্রশাসনের আমন্ত্রণে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপাচার্যকে উদ্ধার করতে গেলে ব্যাপক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। সাত-আটজন সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। ২৩ জানুয়ারি নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী ও বাম ছাত্র নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ঘটনার পর সচেতন শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে গত কয়েক দিনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালন করেছে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা।

প্রশাসনের বক্তব্য :

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানান হয়েছে, অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নিজ নিজ কলেজ বা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী। তাদের পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম স্ব-স্ব কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। তারা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচয়পত্র গ্রহণ করবে। তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরিচয়পত্র দেয়া হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পাঠাগার প্রভৃতির কোনটিই ব্যবহার করার সুযোগ উল্লেখিত কলেজ বা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের নেই। অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভর্তি, ব্যবহারিক পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রভৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেয়া হবে না, তাদের নিজ নিজ কলেজ ক্যাম্পাসে, সুবিধাজনক স্থানে অনুষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে কোনো নিয়মতান্ত্রিক ও যৌক্তিক দাবির আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও একমত। তবে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। উপাচার্য বলেন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে হঠাৎ করে ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণের ফলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্বতন্ত্র লোকবল ও ব্যবস্থাপনা দ্বারা অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে বিধায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সামগ্রিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না।

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজ

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×