চোরে নিচ্ছে শখের বাইক

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ও আল ফাতাহ মামুন ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাইক

আবু বকর চাকরি করছেন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারির একটি গ্যারেজ থেকে দুটি তালা ভেঙে তার নীল রঙের একটি পালসার মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো-ল- ২১-০৯১৮) চুরি যায়।

এরপর তিনি ওইদিনই ওয়ারি থানায় মামলা (মামলা নং ১০) করেন। এ ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পেরিয়ে গেলেও তার বাইকের কোনো হদিস মেলেনি। শুধু আবু বকরই নন। রাজধানীতে প্রতিমাসেই শখের বাইক হারানোর এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বাইক ফেরত পাচ্ছেন এমন ঘটনা অত্যন্ত কম।

আবু বকর বলেন, আমি প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে আমার বাড়ির পাশের নির্মাণাধীন একটি বাসার গ্যারেজে বাইকটি রাখছিলাম। সেখানে দারোয়ানও ছিল। ১২ ডিসেম্বর ভোরবেলা বাইকটি চুরি যায় বলে কর্তব্যরত দারোয়ান জানান। দারোয়ানের ভাষ্য, তিনি ফজরের নামাজ পড়ে একটু উপরের দিকে গিয়েছিলেন। এর ফাঁকে চোর গেটের তালা এবং বাইকের দুটি তালা ভেঙে বাইকটি নিয়ে যায়। কিন্তু আমার দারোয়ানকে সন্দেহ হয়। এ ব্যাপারে থানায় গেলে প্রথমে মামলা নিতে চায়নি পুলিশ পরে মামলা নিলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে আমার বিশ্বাস পুলিশ এ বিষয়ে একটু পদক্ষেপ নিলেই বাইকটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

পুলিশ চাইলেই যে সবকিছু সম্ভব এর জ্বলন্ত উদাহরণ রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবার চালক শাহনাজ আক্তারের স্কুটি উদ্ধার। গত ১৫ জানুয়ারি শাহানাজ আক্তারের স্কুটি চুরি হয়। ছিনতাইয়ের ১২ ঘণ্টার মধ্যে মঙ্গলবার রাতেই নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে সেই স্কুটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন বুধবার দুপুরে শাহনাজের হাতে বাইকটি তুলে দেয় পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন তৎপর ভূমিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পায়। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ডিএমপির তেজগাঁও জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) আবু তৈয়র মো. আরিফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাইক যদি এমন জায়গা থেকে চুরি যায় যে, বাইকের মালিক আমাদের কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।

কোনো সিসি টিভি ফুটেজ কিংবা সঠিত তথ্য পাওয়া না যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে বাইক উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যায়।

তবে আমরা কিন্তু হাল ছাড়ি না। আর যদি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকে তাহলে অপরাধীকে ধরা পড়তেই হবে। যেমন, নারী উবার চালক শাহনাজের ক্ষেত্রে দেখেছেন আমরা একদিনের মধ্যেই অপরাধীকে ধরেছি।

এমন আরেকটা ঘটনা ২০ তারিখেও ঘটেছে। সেটারও আমরা শেষ পর্যায়ে আছি। বাইক চুরির বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মোটরবাইক হারানোর পর কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেই। প্রতি মাসেই অসংখ্য মোটরসাইকেল উদ্ধারও হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট থানার তদন্ত অফিসাররা তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

৬ মাসে ১২৯টি মোটরসাইকেল উদ্ধার

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সরকারি ওয়েব সাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে ঢাকা মহানগর এলাকায় মোট ১২৯টি চোরাই বাইক উদ্ধার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে জানুয়ারি মাসে ১৩টি মোটরসাইকেল, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮টি মোটরসাইকেল, মার্চ মাসে ২৮টি, এপ্রিলে ৩০টি, মে মাসে ২৬টি এবং জুন মাসে মোট ৩০টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও বাইক চুরির ঘটনা ঘটছে। তবে চোরাই এসব বাইক উদ্ধারের পর সেগুলোর খুব কমই প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, সাধারণত একজন বাইক চোরকে ধরলে তার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাইক উদ্ধার করি। কিন্তু তখন প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাই না। আর চোরেরা সাধারণ এক জেলায় চুরি করে আরেক জেলায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে সে ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করা আরও কঠিন।

বেশিরভাগ ঘটনায় করার কিছুই থাকে না পুলিশের

চুরি যাওয়া বাইক কি পুলিশ খুঁজে বের করতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে শ্যামপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, অন্যসব মামলায় আমাদের সফলতা শতকরা ৯৯ ভাগ। দুঃখজনক হলেও সত্য! বাইক চুরি মামলায় আমাদের ব্যর্থতা শতকরা ৯০ ভাগ। বাইক চুরির ২ ঘণ্টার মধ্যেই পার্ট বাই পার্ট আলাদা করে ফেলে। কিংবা চালান করে দেয় ঢাকার বাইরে। এ সময়ে যদি ট্রাফিকের হাতে ধরা খায় তাহলে আসল মালিক বাইক পেতে পারেন। কিন্তু বাইক খোলা হয়ে গেলে আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। তবে চোরের যদি কোনো ক্লু থাকে, যেমন সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ, চোরের মোবাইল নাম্বার অথবা এমন কিছু যা ধরে তদন্ত এগিয়ে নেয়া যায়, তাহলে বাইক ফিরে পাওয়া সম্ভব। যেমন গেল সপ্তায় শাহনাজের স্কুটি ফিরে পাওয়া গেছে, কারণ চোর শাহনাজের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করেছিল।

অধিকাংশ ভিকটিম মামলায় জড়াতে চান না

বাইক চুরি হওয়ার পর প্রথম করণীয় নিকটস্থ থানায় চুরির মামলা করা। কিন্তু অধিকাংশ ভিকটিমই মামলার ঝামেলায় জড়াতে চান না। এ বিষয়ে আনিস আহমেদ নামে এক ভিকটিমের সঙ্গে কথা হয়। বছর খানেকের মাথায় দু-দুইটি বাইক চুরি হয় তার। তিনি পোস্তগোলার আরসিন গেট থাকেন। বাইক চুরির পর কেন মামলা করেননি এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাইক হারিয়েছি। জানি পাব না। তাই আর মামলা করিনি।’ একই কথা বলেছেন শ্যামপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, মানুষ মামলার ঝামেলায় যেতে চায় না কারণ হল, অধিকাংশ মানুষই থানা-পুলিশ-মামলা-মোকদ্দমা থেকে দূরে থাকতে চায়। যখন বাইক চুরির ঘটনা নিয়ে কেউ আসে, আমরা বলি মামলা করেন। তখন ভিকটিম পিছিয়ে যায়। মামলা না করলে তো আইনি সহায়তা এক্ষেত্রে পাওয়া যাবে না। মামলা করলেও চুরি যাওয়া বাইক খুব একটা পাওয়া যায় না। মামলা না করার এটিও বড় কারণ।

বাসাবাড়িতে বাইক চুরি হয় ভোরে চোর থাকে অপরিচিত

একাধিক কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, রাজধানী ও মফস্বলের বাসাবাড়িগুলোতে মধ্যরাতের পর থেকে শেষরাত ও ভোরের দিকে বাইক চুরির ঘটনা বেশি ঘটে। এক্ষেত্রে চোরেরা খুব সজাগ ও সতর্ক থাকে। এক এলাকার চোর চুরি করে অন্য এলাকায় এসে। এতে করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে চোরের মুখ পরিষ্কার দেখা গেলেও তাকে শনাক্ত করতে পারে না এলাকাবাসী।

যাত্রাবাড়ির একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য মোতালেব (ছদ্মনাম) দৈনিক যুগান্তরকে বলেন, আগের চেয়ে মানুষ এখন আপডেট হয়ে গেছে। আমরাও সতর্ক হয়েছি আরও বেশি। আমরা যে যে এলাকায় থাকি, এলাকার কমবেশি মানুষ আমাদের চেনে। কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমেই তারা আমাদের কাছে আসে। সিসিটিভির ফুটেজ থাকলে তো কথাই নেই, নিশ্চিত ধরা খেতে হয়। তাই আমরা এখন কৌশল বদলেছি।

আমাদের এলাকায় আসে অন্য এলাকার চোর। আমরা যাই তাদের এলাকায়। এতে খুব একটা রিস্ক নেই বললেই চলে। পেশাদার এই চোর আরও জানায়, অন্য এলাকার চোর আসে ঠিকই, তবে সার্বিক সহযোগিতায় আমরাই থাকি। কোন বাসায় গেলে ভালো গাড়ি পাওয়া যাবে, ওই বাসা থেকে গাড়ি কীভাবে বের করতে হবে এসব তথ্য নিখুঁতভাবে বলে দিই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×