আসছে বাঙালির মননের মেলা

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেলা

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, বরকতসহ আরও অনেকে।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্ব সভার স্বীকৃতি লাভ করেছে। ভাষা শহিদদের সম্মান এবং বাংলা সাহিত্যের চর্চা-প্রচার-প্রসারের জন্য ফেরুয়ারির ১ তারিখ থেকে ঢাকায় বইমেলার আয়োজন করা হয়, যা অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামেই পরিচিত। এবারও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা।

বইমেলার যাত্রাকথা

মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এ ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এ বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি একাই বাংলা একাডেমি চত্বরে বইয়ের পসরা নিয়ে বসতেন। ১৯৭৬ সালে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।

এ সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। সেই ৩২টি বইয়ের ক্ষুদ্র মেলা কালানুক্রমে বাঙালির সবচেয়ে বড় বইমেলায় পরিণত হয়েছে। বাংলা একাডেমি চত্বরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৮০ সালে মেলার স্টল ছিল মাত্র ৩০টি। এখন স্টলের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। প্রতি বছরই মেলার দর্শক, পাঠক ও লেখকের সংখ্যা বাড়ছে।

মেলার পরিসর

প্রতিবছরের মতো এবারও অমর একুশে গ্রন্থমেলা বসছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং একাডেমির বিপরীত দিকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লক্ষাধিক বর্গফুট জায়গায়। এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ৪৫০টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৫০টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ বেশকিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মোট প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিনকে বর্ধমান হাউসের দক্ষিণ পাশে ‘লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে’ স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, প্রকাশকের সংখ্যা বেড়েছে, প্রত্যেকের প্রত্যাশা, মেলায় বড় স্টল পাবে। আমরা বিষয়গুলো সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। এ মেলায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন। এমনকি প্রবাসীরাও আসেন একুশে বইমেলায় অংশ নিতে। সে কারণে মেলার পরিধি বাড়াতে হয়েছে। এবার প্রতিদিন মেলা শুরু হবে বিকাল তিনটায়। চলবে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার মেলা বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত চলবে।

প্রবেশপথের ফুটপাতের বেহালদশা

দুদিন পরই শুরু হচ্ছে বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯। প্রতিবছর মেলায় হাজার হাজার ক্রেতা দর্শনার্থীর সমাগম হয়। মানুষ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে মেলায় আসেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় মেলা শাহবাগ থেকে মেলায় প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশাল প্রতিবন্ধকতা। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাত একদম চলাচলের অনুপযোগী।

একেতো খানাখন্দ তার ওপর শাহবাগ থানা থেকে টিএসসি পর্যন্ত ফুটপাতের কয়েক জায়গায় দিনে-দুপুরে চলে মূত্র বিসর্জনের কাজ। মোটকথা এ রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করা একেবারেই কষ্টসাধ্য। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, আমিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাস্তাটি পরিদর্শন করেছি। রাস্তাটি সত্যি চলাচল অনুপযোগী। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এবং সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি, মেলা শুরুর আগেই সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হবে।

বই প্রকাশের নানা সমস্যা

বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা নানা সমস্যায় ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে। এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয় বই সম্পাদনা ও উৎপাদিত বই বিপণনে। বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা আর্থিক মানদণ্ডে বেশিরভাগ সময় ভারসাম্য বিন্দুর নিচে অবস্থান করেন।

ফলে টিকে থাকার সংগ্রামে দহন হতে হতে উন্নয়নের দৌড়ে খুব একটা সফল হতে পারে না। এ বিষয়ে গবেষক ও প্রকাশক খান মাহবুব যুগান্তরকে বলেন, বই প্রকাশনার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সুসম্পাদিত করে মুদ্রণের ব্যবস্থা। আমাদের দেশের প্রকাশকদের দক্ষ সম্পাদক নেই। এর কারণ অবশ্য অনেক। প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে প্রকাশকদের আর্থিক সঙ্গতি নাজুক, ফলে স্বাদ থাকলেও সম্পাদক রাখার মতো সামর্থ্য নেই। আধুনিক বই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কপি এডিটর, রিভিউ এডিটর, রিভিউয়ার, এডিটর- এসব ব্যক্তির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বই আকারে প্রকাশের জন্য একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়।

কিন্তু আমাদের দেশে সৃজনশীল প্রকাশকদের প্রকাশনা ফার্মে অনেকেরই একজন কপি এডিটরও নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধু বানান সংশোধকদের দিয়ে সংশোধনী কাজ সম্পন্ন করে পাণ্ডুলিপি হতে বই উৎপাদন করেন। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানে এডিটিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও সার্বিক চিত্র হতাশাব্যঞ্জক। তিনি আরও জানান, আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে- এদেশে ভালো এডিটিং ফার্মও গড়ে ওঠেনি। আমি মনে করি, ভালো এডিটিং ফার্ম গড়ে উঠলে প্রকাশকরা অবশ্যই তাদের কাজের জোগান দেবেন।

কারণ এতে করে দু’পক্ষেরই সুবিধা হবে। সম্পাদনার ব্যয় এতটাই অধিক যে এর প্রভাবে বইয়ের মুদ্রণ ব্যয় বেড়ে যাবে আশঙ্কা করে প্রকাশক অনেক সময় সম্পদনার বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হল- লেখক বই উৎপাদনের জন্য আমাদের দেশে মোটেও সময় দিতে রাজি না। ফলে তড়িঘড়ি করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সম্পাদনার ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যায়। আরেকটি অন্তর্গত সমস্যা হচ্ছে যথার্থ সম্পাদনার জন্য সম্পাদক আমাদের সমাজে গড়ে ওঠেননি। তার বড় কারণ সম্পাদনা শেখার মতো ভালো কার্যক্ষেত্র নেই।

বিপণন সংকট

বইয়ের বিপণনের বিষয়ে গবেষক ও প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বইয়ের জগতে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিপণনের। এ দেশে একজন প্রকাশক পাণ্ডুলিপি থেকে বই প্রস্তুতের মতো সৃজনমনস্ক কাজ করেই রেহাই পায় না। তার উৎপাদিত পণ্যের বিপণনও তাকেই করতে হয়। বিপণনের জন্য কোনো ফার্ম বিস্তৃত পরিসরে গড়ে ওঠেনি। বিপণন চ্যানেলের অবস্থাও ভালো না। বইকে পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে পাঠ আন্দোলন গড়ে তোলার সরকারি ও বেসরকারি প্রয়াস যথেষ্ট নেই। সৃজনশীল উৎপাদিত বইয়ের একটা বড় অংশ দীর্ঘদিন প্রকাশকের গুদামে পড়ে থাকে। এতে পণ্য উৎপাদন ও বণ্টনের যে ঘূর্ণায়মান চক্র তা ব্যাহত হয়। অর্থের প্রবাহের তারল্য ঘাটতিতে পতিত হয়ে প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হন। বই পরিবহনের সুবিধার জন্য বাজারে হালকা ওজনের উন্নত মানের কাগজেরও স্বল্পতা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের সরকার বই ও প্রকাশনার সম্পর্কে অনেক স্তুতিবাক্য বললেও এদেশের প্রকাশনার সার্বিক উন্নয়নে লাগসই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়নি। এ দেশে লোকসংখ্যার তুলনায় পাঠক সংখ্যাও সন্তোষজনক নয়।

ওঁৎ পেতে থাকে ইভটিজাররা

বইমেলায় ঘুরতে এসে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির শিকার হন বইপ্রেমী তরুণীরা। ইভটিজিংয়ের অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের কাছে যেতেও রাজি থাকেন না অনেক তরুণী। অভিযোগ আছে, বইমেলায় আসার নাম করে বিশেষ একটি চক্র বইমেলায় আসা তরুণীদের পিছু নেয়। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি কিংবা ভিড়ের মধ্যে হাতের কনুই ইচ্ছাকৃতভাবে প্রসারিত করে মেয়েদের উত্যক্ত করে এ চক্রটি। বইমেলা বা যে কোনো জমায়েতে একটি চক্র থাকে যারা মেয়েদের টার্গেট করে কৃত্রিম জটলা সৃষ্টি করে। এরপর ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। তরুণীরা প্রত্যাশা করছেন, এবার এ ব্যাপারে তৎপর হবে প্রশাসন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×