নিরাপদ ইন্টারনেট কতটা কার্যকর হবে

  এম মিজানুর রহমান সোহেল ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপদ ইন্টারনেট

২০১০ সাল থেকে নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। গত ৯ বছরে এজন্য নানামুখী উদ্যোগ নিলেও কার্যত তা সফলতার মুখ দেখেনি। জুয়ার ওয়েবসাইট অনেকবার বন্ধ করার পরও তা লাইভ দেখা যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত এক সপ্তাহে ২০ হাজারের বেশি পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়েছে।

‘ঢালাওভাবে’ ইন্টারনেট প্রটোকল বা আইপি ঠিকানা ধরে বিপথগামী সাইট বন্ধ করার কারণে একই আইপির সঙ্গে যুক্ত সাইটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে ই-কমার্স সাইটসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে ইউটিউব ফেসবুকে আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের ডেকে সতর্ক করা হয়েছে; কিন্তু ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) বা মিরর ওয়েবসাইট ব্যবহার করে অনেকেই অনলাইনের পর্নো সাইটসহ বিপথগামী ওয়েবসাইটে ঢুকছেন।

সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, প্রযুক্তির এ যুগে পর্নো ওয়েবসাইট পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

পর্নো ওয়েবসাইটগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত যেভাবে নেয়া হয়

বাংলাদেশ থেকে পর্নো ওয়েবসাইট বন্ধের বিষয়ে অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দ্বিতীয় দফা ক্ষমতা গ্রহণের পর পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এরই মধ্যে গত বছর ১১ নভেম্বর মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন, চাঁদপুরের বাসিন্দা মো. রাসেল হোসেন এবং ময়মনসিংহের খায়রুল হাসান সরকারের পক্ষে সব পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি ও আপত্তিকর কনটেন্ট সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট ছয় মাসের জন্য বন্ধ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন সচিব, তথ্য সচিব, বিটিআরসি এবং সব মোবাইল অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট ৯ জনকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। এছাড়াও পর্নোগ্রাফিযুক্ত ওয়েবসাইট স্থায়ীভাবে কেন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

রুলে ফেসবুক এবং সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বয়স নির্ধারণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর (আইডি) সংযুক্তিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এবং মোবাইল অপারেটরগুলোর পক্ষ থেকে ইন্টারনেটের স্বল্পমেয়াদি ইন্টারনেটের লোভনীয় অফার বন্ধে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়। শুনানিকালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য আদালতে তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ স্কুলগামী শিক্ষার্থী পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এসময় আদালত বলেন, এটি শুধু শিশুদের জন্য নয়, এর মাধ্যমে সমাজের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। এটি নতুন একটি বিষয়। তাই এটিকে জাতির স্বার্থে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

মডেল সানাই ও ইউটিউবার সালমানকে সতর্কবার্তা

পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট বন্ধের বিষয়ে সরকারের মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি ব্যস্ত সময় পার করছে। এরই মধ্যে ইউটিউব ও ফেসবুকে আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে মডেল সানাই মাহবুব এবং ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নেয় পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। প্রথমে ১৭ ফেব্রুয়ারি সানাই মাহবুবকে রাজধানীর মিন্টো রোডের পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগে ডাকা হয়। পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে সানাইকে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকেও ডেকে নেয়া হয়।

ইউটিউবে তার বহুল সমালোচিত আপত্তিকর ভিডিও ‘অভদ্র প্রেম’ নিয়ে আরেক ইউটিউবার তাহসিন এন রাকিব (তাহসিনেশন) রোস্ট ভিডিও প্রকাশ করলে আলোচনার ঝড় ওঠে। অশ্লীল সেই ভিডিওর খবর পৌঁছে যায় তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছেও। তিনি সালমান মুক্তাদিরকে খুঁজতে নিজের ফেসবুকে একটি পোস্টও দেন। সেই পোস্টের একদিনের মাথায় সালমান মুক্তাদিরকে ডেকে নেয় পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি ও ক্রাইম বিভাগ। এরপর তাকেও মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। সানাই ও সালমান তাদের মুচলেকায় লিখেছেন, ‘সাইবার অপরাধ বিভাগ ইউনিটে এসে এটা আমার অনুধাবন হয়েছে, এ কনটেন্টগুলো দেখে যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এটা আমার ভুল ছিল।

আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, এ দেশের সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে এ দেশের আইন মেনে একজন ভালো শিল্পী হতে চাই। ব্যক্তিগত বা যৌথভাবে করা বিব্রতকর ভিডিও বা ছবির জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমি অবশ্যই ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকব। এমনকি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকা সব প্রোফাইল থেকে এ ধরনের কনটেন্ট মুছে ফেলব। এর বাইরে অন্য কনটেন্টগুলোর বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতা চেয়েছি।’

বাংলাদেশে ২০ হাজার পর্নো ওয়েবসাইট বন্ধ

৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নির্দেশনার পর দুই শতাধিক পর্নো ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয় ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি)। এর মধ্যে ইউটিউবের ৬২টি, মোবাইল পর্নো সাইট ১টি, অ্যাডাল্ট ইঞ্জিন সাইট ১০টিসহ ২২টি সাইট ও লিংক বন্ধ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। সাইবার নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এসব সাইট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএসিব)। তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বরাতে ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ২০ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এএফপি বলছে, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নির্দেশে গত সপ্তাহে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি ও জুয়ার ওয়েবসাইটগুলো সরিয়ে নিয়েছে ইন্টারনেট সরবরাহকারীরা। বার্তা সংস্থা এএফপিকে আইসিটিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, আমি বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে চাচ্ছি। আর এজন্যই পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আমার জিহাদ। টিকটক ও বিগোর মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোর অ্যাপ অপব্যহার হচ্ছে বলে অভিযোগ মন্ত্রীর। ‘কাজেই এগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, বন্ধ হওয়া অধিকাংশ ওয়েবসাইট বিদেশি।

কিন্তু কিছু স্থানীয় ও সামাজিক মাধ্যমের প্লাটফর্মও রয়েছে যেগুলো এ ধরপাকড়ের মধ্যে পড়েছে। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের ৯ কোটিই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট অনুসন্ধানের তালিকার শীর্ষে পর্নো তারকাদের নিয়মিত দেখা যায়। ইন্টারনেট সেবাপ্রদানকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, তারা সরকারের নির্দেশ মেনে চলছেন; কিন্তু ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) বা মিরর ওয়েবসাইট ব্যবহার করে অনেকেই অনলাইনের পর্নো সাইটে ঢুকছেন।

সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সরকার

সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয় তখন। এরপর প্রয়োজন হলে মামলা ও পরবর্তী কার্যক্রমগুলো করে থাকেন পুলিশের সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। সাইবার অপরাধ দমনে ডিএমপির সাইবার বিভাগ ছাড়াও পুলিশ সদর দফতরের লফুল ইন্টারসেপশন সেল (এলআইসি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), সারা দেশের পুলিশ সুপারের দফতরগুলোতে থাকা সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কাজ করে যাচ্ছে কয়েক বছর থেকে। ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু প্রধানমন্ত্রীর নামের ৭৫২টি ভুয়া ফেসবুক আইডি ও পেজসহ এক হাজার ৩৩২টি আইডি বন্ধ করেছে তারা।

ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, গত কয়েক মাসে কমপক্ষে ১৫শ’ ওয়েবসাইট বা ওয়েবলিংক বন্ধ করা হয়েছে। যার সঙ্গে যুব, যুবা এবং বিট কয়েন, কারেন্সি বা সরাসরি পর্নোগ্রাফির ইস্যু রয়েছে; সেগুলোকে ব্লক করে দেয়া হয়েছে। সাইবার অপরাধের কাজের সঙ্গে অনেক অংশীদার রয়েছে। কেউ খুঁজে বের করে অনুসন্ধান করে দেখবে যে এটা কোন লিংক, তারপর সেটা হস্তান্তর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তখন কর্তৃপক্ষ সেটা বন্ধ করে দেবে। কাজের ক্ষেত্রেও ভাগ রয়েছে। বিটিআরসির কাজ হল ব্লক করা। পুলিশের কাজ হল কোনটা ব্লক করতে হবে তা খুঁজে বের করা।

এ ব্যাপারে এনটিএমসির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান বলেন, ফেসবুকে গুজব ও অপপ্রচার রোধে এনটিএমসি অনুমোদনহীন ভুয়া পেজ ও আইডি বন্ধে উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে এনটিএমসি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নামে পরিচালিত ৭৫২টি আইডিসহ এক হাজার ৩৩২টি ভুয়া ফেসবুক আইডি বন্ধ করে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর নামে ফেসবুকে পরিচালিত অনুমোদনবিহীন ২৮৮টি পেজ, ২৮টি গ্রুপ এবং ৭১টি প্রোপাগান্ডামূলক পোস্ট বন্ধ করে দেয়া হয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×