বারবার আগুনের বিভীষিকা

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ

চকবাজার ট্র্যাজেডির পরদিন প্রতিবেদকের ক্যামেরায় সেদিনের ভয়াবহতা

চলতি বছর গত ২০ দিনে তিনটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট সে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

সেদিন চিকিৎসক, দমকল বাহিনী আর শিক্ষার্থীদের কল্যাণে হাসপাতালের রোগীদের সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তাতে প্রাণ হারান ৭০ জন। এটিই এ বছরের সবচেতে বড় ধরনের ঘটনা। পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক সপ্তাহ না পেরোতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে মিরপুরের ভাষানটেকে জাহাঙ্গীর বস্তিতে আগুন লাগে।

এরপর দমকল বাহিনীর নয়টি স্টেশনের ২১টি ইউনিট আড়াই ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হয়। এতে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন শত শত মানুষ। এছাড়াও ছোটখাটো আরও কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফলে রাজধানীবাসী এক প্রকার আগুন আতঙ্কে বাস করছেন।

দশ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় হাজার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও ফায়ার ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত দশ বছরে ছোটবড় মিলিয়ে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৬ হাজারের মতো। এতে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় হাজারের মতো মানুষ, আহতের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকারও বেশি। এরমধ্যে ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গরিব অ্যান্ড গরিব গার্মেন্টস গাজীপুরের নিহতের সংখ্যা ২১। একই বছরের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটে সবচেতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এতে প্রাণ হারান ১২৪ জন এবং ১৪ ডিসেম্বর দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার আশুলিয়ায় নিহতের সংখ্যা ২৯। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশন আশুলিয়ায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১১১ জন। এরপর ২০১৬ সালে টঙ্গীর ট্রাম্পকো ফয়েলস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা ৪১ জন। সর্বশেষ ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টার মোড়ে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা ৭০ জন।

২০১৮ সালে ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৭ হাজার ৮২৫টি অগ্নিকাণ্ডই ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। চুলার আগুন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৯টি, আর সিগারেটের আগুন থেকে ৩ হাজার ১০৮টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর সবচেয়ে কম অগ্নিকাণ্ড হয় সিলেট বিভাগে। নতুন গঠিত ময়মনসিংহ বিভাগেও অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা সিলেটের চেয়ে বেশি। এর কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, অন্য বিভাগীয় শহরের তুলনায় ঢাকার আয়তন, বয়স, ভবন ও মানুষের সংখ্যা, কারখানা সবই বেশি। তাই ঢাকায় ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার হার বেশি।

পুরান ঢাকায় বারবার কেন এই ট্রাজেডি

চকবাজার ট্রাজেডির পর গত ২ মার্চ সেখানকার কামালবাগ বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এক ভাঙারির দোকানে অগ্নিকাণ্ডে ৩ জন দগ্ধ হয়েছেন। এই পুরান ঢাকায় বারবার এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। ফায়ার সার্ভিস অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, পুরান ঢাকা অত্যন্ত অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ। ২০১৮ সালে এখানে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের হিসাবে, পুরান ঢাকার লালবাগ, হাজারীবাগ, সদরঘাট এবং সিদ্দিকবাজারে গত বছর অন্তত ৪৬৮টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, পুরান ঢাকায় অবৈধভাবে পরিচালিত প্রায় পাঁচ শতাধিক রাসায়নিক গুদাম এবং কারখানা রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক জরিপে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় ৫৩৭টি রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। যার সবই লালবাগ, হাজারীবাগ, সদরঘাট এবং সিদ্দিকবাজার এলাকায় অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে সদরঘাটে ৩৭৯টি এবং লালবাগে ৮৭টি রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, পুরান ঢাকা অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোতে রাসায়নিক, প্লাস্টিক, প্রসাধনী, রাবার এবং নেইল পলিশের গুদামের অভাব নেই। এসব বস্তুই মূলত অগুন লাগার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটলেও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল দ্রব্যের গুদাম সরানো যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। নিমতলীর পর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ৭০ জন মারা গেছেন। তবে এর দায় কেউ নিচ্ছে না। সরকারি সংস্থাগুলো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ে সরকার চাপের মুখে পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তখন পুরান ঢাকায় ৮০০’র বেশি অবৈধ রাসায়নিক গুদাম এবং কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি এবং পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, পুরান ঢাকায় যত্রতত্র রাসায়নিক দ্রব্যের কয়েক হাজার গুদাম, কারখানা বা দোকানের বেশিরভাগের নিবন্ধন বা লাইসেন্সসহ কোনো কাগজপত্র নেই। এসব ব্যবসায়ী এবং তাদের সহায়তাকারী স্থানীয় লোকজনের ভোটব্যাংক রয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কর্তৃপক্ষ কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয় না। তারা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিভাবেও শক্তিশালী। এবং এ এলাকার ভোটব্যাংক হিসাবে নানাদিকে প্রভাব বিস্তার করে। যার ফলে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা পরিবেশ অধিদফতর তারাও সেভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সিটি করপোরেশন যারা এসবের লাইসেন্স দেয় বা তদারকি করে, তারাও সেটা সঠিকভাবে করেনি।

ভবন নির্মাণে নিয়ম না মানায় অগ্নিকাণ্ড

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা। ২০১৮ সালে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩০ জন। এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণেই বাড়ছে দুর্ঘটনা।

এদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে শিল্পায়ন ও নগরায়ন। ক্রেতাদের চাপে দেশের রফতানিমুখী বেশিরভাগ শিল্প কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন ও অভ্যন্তরীণ শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও পিছিয়ে রয়েছে। গত দশ বছরে শুধু রাজধানীতেই ৫ গুণ বেড়েছে উচ্চ ভবনের সংখ্যা। তবে এসব ভবনে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটুকু জোরদার করা হয়েছে তা নিয়ে আছে সংশয়। অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে বর্তমানে উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অগ্নি দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

গাড়িতে গাড়িতে ‘সিলিন্ডার বোমা’

প্রাথমিকভাবে ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয়তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও চকবাজার ট্র্যাজেডির পর গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। এ আশঙ্কা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষায় কেউ উদ্যোগী হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সিএনজি সিলিন্ডারের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিঃ (আরপিজিসিএল)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গাড়িতে ব্যবহার করা গ্যাস সিলিন্ডার মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। মানহীন ও সময়মতো পুনঃপরীক্ষা না করানোই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। আরপিজিসিএল’র হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে একই সিলিন্ডার পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করা গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকের বেশি। পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই চলছে সড়ক-মহাসড়কে। ফলে গাড়িতে গাড়িতে এক ধরনের সিলিন্ডার বোমা ঘুরছে।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, বাজারে গুণগত সিলিন্ডার আসছে না। এদিকে গাড়িগুলো সিলিন্ডার সঠিক সময় পরীক্ষা করছে না। ফিটনেস দেখা হচ্ছে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার এখন জীবন্ত বোমায় পরিণত হচ্ছে। পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হয়নি

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর যে ১৭টি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটত না বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, কেমিক্যাল অপসারণসহ কয়েক দফা নির্দেশনা চেয়ে করা পৃথক পৃথক তিনটি রিটের শুনানিতে আদালত এসব কথা বলেন।

আদালত বলেন, পুরান ঢাকার রাস্তা দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও যেতে পারে না। ৫ থেকে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে না হয় কিছু হবে না। কিন্তু ৭ থেকে ৮ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে কোনো বিল্ডিং থাকবে না। এ ধরনের ভূমিকম্প হলে কাউকে উদ্ধার করারও কেউ থাকবে না।

এরপর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, শিল্প সচিব, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সচিব, বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।