ইন্টারনেট আসক্তিতে বিপন্ন শৈশব

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শৈশব

একটা সময় ছেলেমেয়েদের শৈশব শুরু হতো বাড়ির উঠোনে। শিশু একটু বড় হলেই ব্যাট-বল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত মাঠঘাট।

গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, লাটিম, মার্বেলসহ কত ধরনের খেলাধুলায় মেতে থাকত শিশু। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত সেসব মাঠ। ছোট ছোট আনন্দ রাঙিয়ে যেত শৈশব। বর্তমানে সোনালি অতীতের সেসব খেলাধুলার কথা যেন কল্পনাই করা যায় না। বিশেষ করে শহরের শিশুদের জীবন যেন চার দেয়ালে বন্দি। শিশুর বুদ্ধি বিকাশের সোনালি সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস আর ইন্টারনেট।

প্রযুক্তিনির্ভরতা ডেকে আনছে বিপদ

বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতির ফলে দিন দিন সহজলভ্য হয়ে উঠছে নানা প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ এবং তার সঠিক শিশু-কিশোরদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে যেমন শিক্ষার বিরাট মাধ্যম হতে পারে, আবার অন্যদিকে সৃষ্টি করতে পারে মারাত্মক আসক্তি। নিত্যনতুন প্রযুক্তি বা গেজেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়া মোটেও দোষের কিছু নয়। তবে স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের মতো স্মার্ট ডিভাইসগুলো যখন শিশুদের আনন্দের একমাত্র উপকরণ হয়ে যায় তখন সেটা আসক্তির পর্যায়ে পড়ে।

আফজাল আর শারমিন দম্পতির একমাত্র মেয়ে সুমি। দেড় বছর বয়সী সুমি যখন খেতে চায় না তখন শারমিন তার বাচ্চার হাতে তুলে দেন স্মার্টফোন বা ট্যাব। এসব ডিভাইসে চালিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন কার্টুন বা স্নো-হোয়াইটের মতো কাহিনী। এতে করে প্লেটের সব খাবার নিমিষেই শেষ করে ফেলে সুমি। চাকরিজীবী শারমিন কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে সন্তানের হাতে তুলে দেন স্মার্ট ডিভাইস। কৌশলটি কাজে লাগছে, এজন্য খুশিই ছিলেন শারমিন। তবে বিপত্তিটা ঘটল যখন বছর তিনেক পর শারমিন দেখলেন তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান বিভিন্ন কাহিনীচিত্র, কার্টুন দেখা থেকে শুরু করে সবধরনের গেম ও মিউজিক এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরিণত শিশুদের জন্য আপত্তিকর বিষয়াদির ভিডিও চিত্র ডাউনলোডের প্রতি চরম আসক্ত হয়ে পড়েছে। আধুনিক সমাজে এমন ঘটনাই ঘটছে প্রতিনিয়ত।

ভারতের ফর্টিস ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ কাউন্সিলের চেয়ারপারসন এবং কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ড. সামির পারিজ বলেন, শিশুরা সহজেই বিভিন্ন ডিভাইস পরিচালনায় পারঙ্গম হয়ে উঠছে। বাচ্চাদের একটি ডিভাইস ব্যবহার করতে দেয়ার মাধ্যমে ব্যস্ত রাখার একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আজকাল বাবা-মা’দের মধ্যে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে; কিন্তু এ সাময়িক স্বস্তি তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় বয়ে আনছে। তিনি বলেন, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক আনন্দ পাওয়ার চেয়ে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দেয়া এবং গঠনমূলক শখকে উৎসাহিত করা- এসবই তাদের এ আসক্তি থেকে দূরে রাখার ভালো উপায়।

অনলাইন বিপদের মুখে দেশের ৩২ শতাংশ শিশু

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩২ শতাংশই অনলাইন বিপদের মুখে আছে। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালনা করেছে ইউনিসেফ। জরিপটিতে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া এক হাজার ২৮১ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ শিশুই ১১ বছরের কম বয়সে ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করেছে এবং ৯৪ শতাংশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট আছে। শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩ শতাংশ) নিজের ঘরে বসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা ‘বেডরুম কালচার’ অর্থাৎ কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ছেলেরা ৬৩ শতাংশ ও মেয়েরা ৪৮ শতাংশ। শিশুরা ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডিও দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিংয়ের ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকি জরিপে অংশ নেয়া ১৪ শতাংশ শিশু নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই অনলাইন ‘বন্ধুদের’ সঙ্গে সরাসরি দেখা করার কথাও স্বীকার করেছে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডয়ার্ড বেগবেদার বলেন, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা আমরা শুনেছি এবং তারা যা বলছে তা পরিষ্কার। ইন্টারনেট একটি নির্দয় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ।

ইউনিসেফের মতে, অনলাইনে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অনলাইনে অনির্দিষ্টকাল ধরে এগুলো থেকে যেতে পারে। অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় যারা অনলাইনে ভয়ভীতির শিকার হয়, তাদের অ্যালকোহল ও মাদকে আসক্ত হওয়া ও স্কুল ফাঁকি দেয়ার হার বেশি। এছাড়া তাদের পরীক্ষায় ফল খারাপ করা, আত্মসম্মান কমে যাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। চরম পরিস্থিতিতে, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে বলে ওই জরিপে উঠে এসেছে।

ঘুম কমে যাচ্ছে শিশুদের

স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট নিয়ে বেশি সময় কাটানো বাচ্চারা অন্যদের তুলনায় কম ঘুমায়। দিনে এক ঘণ্টা মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেটের টাচস্ক্রিন নিয়ে নাড়াচাড়ার কারণে নিত্যকার অন্তত ১৫ মিনিটের ঘুম কমে যায় বাচ্চাদের। গবেষকরা বলছেন, এসব ডিভাইস থেকে নীল রঙের এক ধরনের আলো বিচ্ছুরিত হয়, যা মানুষের ঘুমানোর ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। মূলত এ কারণেই ঘুম কমে যায় বাচ্চাদের। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। তিন বছরের কম বয়সী ৭১৫ বাচ্চার মা-বাবার ওপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায়, বাচ্চারা রাতে কম ঘুমায়; কিন্তু দিনে তা পুষিয়ে নেয়। সাইবার অপরাধের প্রবণতা বাড়ছেই

পৃথিবীতে নানা জাতির রয়েছে নানা ভাষা। সংস্কৃতিও বৈচিত্র্যময়। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ আর আকাশ সংস্কৃতির দাপটে বিশ্বব্যাপী চলছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে গোটা পৃথিবী পরিণত হচ্ছে এক সংস্কৃতিতে। আকাশ সংস্কৃতির এ যুগে হাত বাড়ালে ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে পুরো পৃথিবী। শুধু ক্লিক করলে হাজির হচ্ছে আপনার চাওয়া যে কোনো ছবি, গান, কিংবা শিক্ষণীয় বিষয়। তবে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে কিশোর-কিশোরীদের সাইবার অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ফারহান ফয়সাল আবির। ১৪ থেকে ১৫ বছরের এক কিশোর। বাবা ফেনী শহরের একজন ব্যবসায়ী। তিন ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় ৮ম শ্রেণীতে পড়াকালীন মোবাইল পেয়ে যায় আবির। এরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আসক্ত হয়ে পড়ে। মোবাইল টেপাটেপি চলে গভীর রাত অবধি। একপর্যায়ে ফেসবুকের মাধ্যমে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে সহপাঠী ও ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে প্রতারিত করছে। ফেসবুক আইডি হ্যাক, টাকা আদায় ও অশ্লীল ছবি দিয়ে প্রতারণার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাইবার বাচ্চাদের কাছে এক ধরনের গেম। মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহারে বেশি অ্যাপস শিখে ফেলে শিশু-কিশোররা। স্বভাবতই নিষিদ্ধ জিনিস মানুষকে বেশি টানে। খেলাধুলা করতেই হবে

শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজন খেলাধুলার। ঢাবির চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম বলেন, আপনার শিশুকে খেলতে দিন, প্রতিটি শিশু জীবনের বিভিন্ন ধাপ বা স্তর অতিক্রম করে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রয়োজন হয়। শিশুর অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, মা-বাবা এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত বলি, খেলাধুলা করে শিশু সময় নষ্ট করছে। এ কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কনসালটেন্ট সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. মেহজাবীন হক বলেন, খেলতে চাওয়া শিশুর স্বাভাবিক চাহিদা। সুতরাং শিশুকে খেলতে দিন। একেক বয়সে শিশুর খেলার চাহিদা একেক রকম থাকে। কেজি শ্রেণীর একজন শিশু যতটা পড়াশোনা করবে পঞ্চম শ্রেণীর একজন শিশু কিন্তু ততটুকু করবে না। যাদের পড়াশোনার চাপ কম তারাই কিন্তু খেলতে চাইবে বেশি। সুতরাং মা-বাবাকে এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না খেলার মাধ্যমেই শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। সুতরাং খেলার মাধ্যমে শিশু সময় অপচয় করছে এটি ভাবা যাবে না। তিনি বলেন, শিশুকে বলুন হ্যাঁ, তুমি অবশ্যই খেলবে। তবে যখন তোমার খেলার সময় তখন খেলবে। এতে শিশুর মন বুঝে নেবে যে তাকে খেলতে বাধা দেয়া হচ্ছে না।

প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজন সচেতনতা

দৈনন্দিন প্রায় প্রতিটি কাজকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে জড়িয়ে গেছে প্রযুক্তি। আধুনিক জীবনযাপনের তাগিদেও প্রযুক্তির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হচ্ছে সবার। তবে অন্ধ ভালোবাসা অনেক ক্ষেত্রে হতে পারে হিতে বিপরীত। কারণ বড়দের পাশাপাশি ছোটদের মাঝেও প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বাড়ছে ক্রমশই। এমনকি বাচ্চাদেরও এতে আসক্তি বাড়ছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ট্যাব, গেমিং ডিভাইস, ইন্টারনেট কোনোটাই তাদের অজানা নয়। তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, বর্তমানে প্রযুক্তি ছাড়া চলা সম্ভব নয় তা আমরা ভালোভাবেই জানি। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশু-কিশোররাও এর সঙ্গে চলছে। শুধু প্রযুক্তি নয়, ভালো-মন্দ সবকিছুতে থাকে, তাই বলে ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে এমন নয়। শিশুরা প্রযুক্তির সঙ্গে যে গতিতে চলছে, তা রোধ করা ঠিক হবে না। তবে প্রযুক্তির মন্দ দিকগুলো থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। এজন্য পরিবারকে হতে হবে সচেতন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×