গেমিং নেশা একটি মানসিক রোগ

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আল ফাতাহ মামুন

প্রযুক্তির উৎকর্ষে শিশুরা প্রতিনিয়তই আনন্দ খুঁজে ফিরছে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের পর্দায়। অনেক সময় এ গেমসের প্রতি তাদের আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে।

অবাক করার বিষয় হল, বিভিন্ন ডিভাইসে গেম খেলার প্রতি নেশাকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ১১তম ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস বা আইসিডিতে এটিকে ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের কিছু দেশে গেমিং আসক্তিকে ইতিমধ্যে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১২ মাস সময় ধরে অস্বাভাবিক গেমিং আসক্তি বা আচরণ দেখা গেলে তা নির্ণয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশ্বজুড়ে গেমিং আতঙ্ক

লন্ডনের নাইটিংগেল হাসপাতালের টেকনোলজি অ্যাডিকশন স্পেশালিস্ট ডা. রিচার্ড গ্রাহাম জানান, বছরে তিনি ডিজিটাল আসক্তির প্রায় ৫০টির মতো কেস দেখেন। এ আসক্তির কারণে তাদের ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, সামাজিক মেলামেশা এবং শিক্ষার ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটার ওপর ভিত্তি করে আসক্তির সমস্যার মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হয়। রোগী দেখার সময় একটি বিষয় তিনি খুব খুঁটিয়ে দেখেন। ডা. রিচার্ড গ্রাহাম বলেন, গেমিং আসক্তি ‘নিউরোলজিক্যাল সিস্টেম’কে ভয়াবহ প্রভাবিত করছে।

এটি চিন্তার ক্ষমতা বা নিবিষ্ট থাকার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তো সরকার এমন আইন করেছে- যাতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অনলাইন গেম খেলতে না পারে। জাপানে কেউ যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গেম খেলে তাকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। চীনে সেখানকার সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট শিশুরা কতক্ষণ গেম খেলতে পারে তার সময় বেঁধে দিয়েছে। চীনের অনলাইন ভিডিও গেম বাজারে উল্লেখযোগ্য দখল রেখেছে স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি টেনসেন্ট হোল্ডিংস। চীনের তরুণ প্রজন্ম অনলাইন গেমে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়ায় দেশটির সরকার তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

গেমিংয়ে কমছে সৃজনশীলতা

মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে গেমিং করে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয়, এমনকি সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি করতে দেখা যায় এ ধরনের শিশুদের। ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত জরিপটির ফলাফল সম্প্রতি ‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী ১০১৩ জন শিশুর ওপর জরিপটি করা হয়। এদের কেউ কেউ দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত টিভি দেখে অথবা কম্পিউটারে গেম খেলে সময় অপচয় করে। আবার কেউ কেউ এক মুহূর্তও টিভি দেখে না বা কম্পিউটারে খেলে না। ওই শিশুদের ২৫টি করে প্রশ্ন করা হয়। দেখা গেছে, যেসব শিশু দুই ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলাধুলা করে তাদের চেয়ে যেসব শিশু এত সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে না তারা বেশি নম্বর পেয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, যেসব শিশু শারীরিকভাবে সবল অথচ স্ক্রিনের সামনে দিনে ২ ঘণ্টা বা ততোধিক সময় অতিবাহিত করে তারাও মানসিক সাস্থ্যের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নগরে দুর্লভ খেলার মাঠ

সোনালি শৈশব বলতে এ প্রজন্মের শিশুদের কোনো স্মৃতি থাকবে কি না বলা মুশকিল। কারণ সুন্দর শৈশবের জন্য প্রয়োজন খোলা মাঠ। আর রাজধানী ঢাকাতে খোলার মাঠ যেন সোনার হরিণ। দুর্লভ বললেও খুব একটা ভুল হবে না। রাজধানীর শিশুদের সুস্থ বিকাশ এবং সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশন মোট ৫৪টি পার্ক ও ২৫টি খেলার মাঠ দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য! এসব পার্ক ও মাঠের অধিকাংশেরই এখন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায়। বেশিরভাগ মাঠ ও পার্ক দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী চক্র। যে গুটিকয়েক মাঠ দখলমুক্ত রয়েছে, সংস্কারের অভাবে খেলার উপযুক্ত পরিবেশ নেই সেগুলোতেও। ‘ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না, বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নেই। ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নেই। ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না এবং ৪৭ শতাংশ শিশু দিনে গড়ে তিন ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটায়।

শিশুদের পছন্দ প্লে-জোন

খেলার জায়গার অভাবে নগরীর শিশুরা এখন টেলিভিশন দেখে সময় কাটাচ্ছে। গেম খেলছে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপে। অদ্ভুত সব খেলা খেলতে শিশুরা ছুটছে বিভিন্ন প্লে-জোনে। এ রকম প্লে-জোন এখন ঢাকার ধানমণ্ডি, কলাবাগান, গুলশান, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। এসব প্লে-জোনে ঢোকার শর্ত খুবই অদ্ভুত ধরনের। কোথাও প্লে-জোনে শিশুদের ঢোকার শর্ত হিসেবে বেঁধে দেয়া হয়েছে ফাস্টফুড কেনা। দামের ওপরে হিসাব করে গেম কয়েন দেয়া হয়। আবার কোথাও আলাদা টাকা দিয়ে কিনতে হয় গেম কয়েন। নগরীর বিভিন্ন প্লে-জোন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শিশুদের কাছে। অনেকটা নিরুপায় হয়েই এসব প্লে-জোনে ছুটছেন অভিভাকরা। কারণ, প্রিয় সন্তানের সুস্থ-বিনোদনের জন্য বিকল্প কিছু নেই তাদের সামনে। একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্লে-জোনগুলোতে যেসব খেলা আছে, সেগুলোর বেশ কিছু শিশুদের অনুপযোগী। অনেকটা জুয়ার মতো বললেও ভুল হবে না। এক ধাপের পর আরেক ধাপে যেতে পারলে দেয়া হয় ডিসকাউন্ট। কোনো খেলা আবার রীতিমতো হিংসাত্মকও বলে মন্তব্য করেছেন অভিভাবকরা।

নিরাপদ নয় প্লে-জোনও

সাইফুল ইসলাম বলেন, শহরের কোলাহলে সন্তানের বিনোদনের জন্য প্লে-জোনই আমাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু বেশিরভাগ প্লে-জোনের সার্ভিসম্যানদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। তারা জানেন না কোন বয়সের শিশুদের জন্য কোন গেম উপযোগী। তাদের কাজ হল কোনো বিবেচনাবোধ ছাড়াই যে কোনো বয়সের শিশুদের যে কোনো গেমস খেলতে উদ্বুদ্ধ করা। আবার দেখা যায়, অভিভাবকরাও কোন শিশুর জন্য কোন ধরনের গেম উপযোগী- এ বিষয়ে সচেতন নন। আর ওইসব গেম আদৌ শিশুদের খেলার উপযোগী কি না, তার শারীরিক-মানসিক বিকাশ এতে কতটুকু হয় আর কতটুকু বাধাগ্রস্ত হয়- সে প্রশ্ন তো রয়েছেই।

রাজধানীর বিভিন্ন প্লে-জোন ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগই ভার্চুয়াল গেমস। সেখানে হাত-পায়ের ব্যবহার করে খেলা যায় এমন গেমস কিংবা রাইডের সংখ্যা একেবারেই কম। আবার হাতেগোনা কয়েকটি গেমস থাকলেও সেগুলো সব শিশুর উপযোগী নয়। শপিংমলটির গেমস সেকশনে থাকা সার্ভিসম্যান নাহিদ (ছদ্মনাম) বলেন, বড়দের গেমসেই শিশুদের আগ্রহ বেশি। তিনি স্বীকার করেন, শিশুদের সঙ্গে এসব গেমস দিয়ে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়।

বাড়ছে ওবেটিসি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এতে করে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন অভিভাবক এবং বিশেষজ্ঞমহল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স ও শারীরিক কাঠামোর তুলনায় অতিমাত্রায় ওজনের (যা ওবেসিটি নামে পরিচিত) কারণে শিশুরা যেমন শৈশবের চঞ্চলতা হারাচ্ছে, তেমনি শিশু বয়সেই ভুগছে এ সংক্রান্ত নানারকম অসুখে। তাদের ভবিষ্যৎ জীবন দাঁড়াচ্ছে মারাত্মক হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওবেসিটি বা স্থূলতা শিশুদের ভয়াবহভাবে ঠেলে দিচ্ছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, হার্টের সমস্যা, চোখের সমস্যা, বাত ও হেপাটাইটিসসহ নানা ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন তারা।

বেশি ঝুঁকিতে ৫-১২ বছর বয়সী শিশুরা

ওবেসিটি বা মাত্রাতিরিক্ত ওজন ২০১৩ সালে প্রথম বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার প্রকোপ এবং খাদ্যাভাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ধরন শীর্ষক এক জরিপ করে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি)। সেখানে দেখা যায়, দেশের শহরাঞ্চলের ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় ভুগছে। আর ঢাকায় এর সংখ্যা ২১ শতাংশ। কম ওজন, স্বাভাবিক ওজন, অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা- এই চারভাগে ভাগ করা হয় জরিপে। সেখানে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে ১০ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে এবং ৪ শতাংশ শিশু ভুগছে স্থূলতায়। আর ঢাকা মহানগরে এর সংখ্যা যথাক্রমে ১৪ এবং ৭ শতাংশ। স্থূলতা এবং অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ৭০ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১২ বছর এবং বাকি ৩০ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুর সংখ্যা শিক্ষিত পরিবারে বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।