ডাকসু নির্বাচন ২০১৯

আশার নির্বাচন হতাশায় শেষ

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ১৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের দিনই ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময়ের আগে ছাত্রলীগ বাদে সবগুলো প্যানেল নির্বাচনে কারচুপি-জালিয়াতির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করে। তারপরও ভোট গণনায় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভনকে হারিয়ে ভিপি নির্বাচিত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নূরুল হক নূর। এছাড়াও সমাজসেবা পদে নির্বাচিত হন ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্নফাঁসের পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে ৫৪ ঘণ্টা অনশনকারী কোটা সংস্কার আন্দোলনের আরেক নেতা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আখতার হোসেন। অবশ্য এ নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে ডাকসুর নব-নির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূরসহ বিভিন্ন প্যানেল এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের সেই দাবিতে সাড়া দেবেন না বলেই মনে হচ্ছে। এদিকে ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে আশা-হতাশার বলেই অভিহিত করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

ডাকসুর ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এখানে বরাবরই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ছাত্ররা হেরেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ডাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। সেই নির্বাচনে ছাত্রলীগ একটি পদও পায়নি। তবে ভোট গণনার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি। পরে পরবর্তী ছয় বছর কোনো নির্বাচনই হয়নি। এরপর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে ৭৯, ৮০ ও ৮২ সালে তিনটি নির্বাচন হয়। ৮০ ও ৮২ সালের নির্বাচনে ছাত্রদল বেশ কয়েকটি হলের ভিপি ও জিএস পদে জয় পায়। তবে ৭৯ ও ৮০ সালের নির্বাচনে পরপর দু’বার ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান পরিষদ। আর ৮২ সালের নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন আখতারুজ্জামান ও জিএস নির্বাচিত হন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। এরপর টানা সাত বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। পরে ডাকসু নির্বাচন হয় ৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। সেই নির্বাচনে ভিপি হয়েছিলেন ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের জোটের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। পরের বছর ’৯০ সালে ডাকসুর ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুখ কবির খোকন। এরপর দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি।

নানা ঘটনায়

বিতর্কিত নির্বাচন

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন বর্জন করেছে ছাত্রলীগ বাদে অংশ নেয়া সব প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিভিন্ন হলে অনিয়ম, ব্যালট পেপারে আগাম সিল, ভোটে বাধা, কারচুপিসহ নানা অভিযোগে তারা নির্বাচন বর্জনের পর পুনঃতফসিলের দাবি করেন। ছাত্রদল ও অন্য পাঁচটি প্যানেলের প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। কুয়েত মৈত্রী হলে ব্যালট কেলেঙ্কারির পর তাৎক্ষণিকভাবে হল প্রভোস্টকে অপসারণ করা হয়। রোকেয়া হল থেকে তিন ট্রাঙ্ক সাদা ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়। কোনো হলে লাইনে দাঁড়ানোর নামে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করা হয়। বেশ কয়েকটি হলে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটের দিন ভিপিপ্রার্থী নূরুল হক নূরসহ কয়েক নেতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। তবে বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে সরব ছিলেন ছাত্রীরা। শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে নামে ছাত্রলীগ বাদে সব ছাত্র সংগঠন।

নির্বাচন বর্জনকারী প্যানেলগুলোর মধ্যে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্যানেল বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপিপ্রার্থী নূরুল হক নূর দাবি করেন, ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ পরাজয় নিশ্চিত জেনে রাতেই ব্যালটে সিল মেরে রেখেছে। এছাড়াও বহিরাগত ও গণরুমের শিক্ষার্থীদের দিয়ে কৃত্রিম লাইন তৈরিরও অভিযোগ করেন তিনি। এদিকে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

এবার ডাকসুর ২৫টি পদ এবং হল সংসদের ১৩টি পদে প্রতিনিধি নির্বাচনে এ ভোট আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পদের মধ্যে ডাকসু ও হল সংসদে আছে ভিপি, জিএস, এজিএস একটি করে তিনটি। এছাড়া সম্পাদকীয় ৯টি এবং ১৩টি সদস্যপদ আছে ডাকসুতে। অন্যদিকে প্রত্যেক হল সংসদে ১৩টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস, এজিএস একটি করে তিনটি। আরও আছে সম্পাদকীয় ছয়টি আর সদস্য চারটি। হল সংসদ ও ডাকসু মিলিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গড়ে ৩৮টি করে ভোট দিতে হয়। এবার ভোটের কাজ শেষ করতে রিটার্নিং অফিসারসহ (আরও) ৪২ জন কাজ করেন।

সাহস দেখাল

ঢাবির মেয়েরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পাঁচটি হলে ছাত্রলীগের মেয়েরা সেভাবে জিততে পারেননি। সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাবি, মেয়েরা রাত জেগে হল পাহারা দেয়ায় ক্ষমতাসীনরা সেভাবে কারচুপি করতে পারেনি। তবে রোকেয়া হল ও বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হলে ভোটের দিনই কারচুপির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাবির শামসুন নাহার হলে স্বতন্ত্র হিসেবে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত শেখ তাসনিম আফরোজ ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আফসানা ছপা যুগান্তরকে বলেন, সারা রাত জেগে আমরা ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়েছি। দিনের বেলাও নজরদারিতে রেখেছি। এ অবস্থায় আমাদের হলে কারচুপি করার কোনো সুযোগ ছিল না। ভোটের আগের দিন থেকে নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সজাগ ছিলাম। আমরা বিভিন্নভাবে ভাগ ভাগ হয়ে কাজ করেছি। আমাদের হলের ভেতরে কলাপসিবল গেট ২টায় বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আমরা বলেছিলাম, একটা দিন অন্তত আমাদের বাইরে থাকতে দেয়া হোক। সেটাও দেয়া হয়নি। আমাদের ব্যালট বক্স ছিল প্রভোস্ট ম্যাডামের অফিস রুমে। আর ভোটকেন্দ্র হল অনার্স বিল্ডিং এবং মিট বিল্ডিংয়ের মাঝখানে টিভিরুমে। আমরা কয়েকজন বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে তিনজন তিনজন হয়ে যাই। কয়েকজন একটা রুমে ছিলাম, সেখান থেকে স্পষ্ট প্রভোস্ট ম্যাডামের রুম দেখা যায় এবং অন্যরা ছিল আরেকটি জায়গায়। মাঝখানে যেখানে সংযোগ জায়গা সেখানে ছিল আরও তিনজন। এভাবেই সারা রাত জেগে আমরা চেষ্টা করেছি যেন ভালো একটি নির্বাচন হয়।

ছাত্রী হলগুলো ছাড়া ঢাবির অন্য হলগুলোতে ছাত্রলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ১৮টি হলের মধ্যে ১২টিতে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ছাত্রলীগ ও ৬টিতে সহসভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। আর সাধারণ সম্পাদক পদে ১৪টিতে ছাত্রলীগ ও ৪টিতে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।

বুমেরাং হল শিবির ট্যাগ

সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলন। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মামুন, নূরুল হক নূর, রাশেদ খান ও ফারুক হোসেনরা। শুরু থেকে নূরকে ছাত্র শিবিরের কর্মী বলে প্রচার করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী নূরের এমন কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। তবে প্রশ্নবিদ্ধ ডাকসু নির্বাচনে নূরুল হক নূর ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে জামায়াত শিবিরের কর্মী বলে আন্দোলনে নামে ছাত্রলীগের একটি অংশ। নির্বাচনের দিন থেকেই নূরকে ‘শিবিরের কর্মী’ দাবি করে নানা স্লোগান দেয় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ১২ মার্চ বিকালে ভিপি পদে পরাজিত ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ও নূর একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এর আগে ভোটের দিন যুগান্তর লাইভে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নূরকে নিজেদের দলের এবং একসঙ্গে রাজনীতি করার বিষয়টি জানান। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘নূর আমার সঙ্গে রাজনীতি করত। আমার ছোট ভাই। ও ভালো কাজ করেছে। আমরা বলছি- শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই কোটার ইমোশনকে ব্যবহার করে এখন যেগুলো করছে তা মিথ্যাচার। এর চেয়ে নিচুমানের কাজ হয় না।’ এরপর ১৬ মার্চ গণভবনে ছাত্রলীগের রাজনীতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ লালন করার বিষয়টি স্বীকার করেন ভিপি নূর। প্রধানমন্ত্রীও আদর করে নূরকে পাশে বসান।

সাবেক দুই

নেতার ভাষ্য

ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ১১ মার্চের নির্বাচন প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ১৯৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচন হওয়ার পরও ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। পরে আর ভোট গণনাই হয়নি, কোনো ফলাফলও হয়নি। এরপরে আর ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। এত বছর পরে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে এত অনিয়মের ঘটনা ঘটল।

তিনি বলেন, ‘এবারের ডাকসু নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা অনিয়মের অভিযোগ করেছে, ভোট বর্জন করেছে। ভোটের দিন আন্দোলন-কর্মসূচি ঘোষিত না হলে ভিপি হিসেবে নূরুল হকের নাম ঘোষণা হতো না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখেই নূরুল হকের পদটি ক্ষমতাসীনরা নিতে পারেনি। অন্যদিকে মেয়েদের হলে পেশিশক্তি কিছুটা কম দেখানো যায় বলে সেখানে অনেকেই নিরপেক্ষভাবে জয় পেয়েছে। এটাকে কোনোভাবেই ভোটের নির্বাচন বলা যায় না। এবারের ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে, কারও কারও ইচ্ছাপূরণের নির্বাচন।

১৯৮৯-৯০ মেয়াদে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোস্তাক আহমেদ। ডাকসুর সাবেক এই জিএস বলেন, গত ১০ বছর ধরে ক্যাম্পাসে সরকার সমর্থক ছাত্রগোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। তাদের বিরুদ্ধেই সাধারণ ছাত্রদের রায় ভোটের মাধ্যমে বেরিয়ে আসত। ছেলেদের হলগুলোয় ছাত্রলীগ দখলদারিত্ব ধরে রাখতে পেরেছে বলে সেখানে তারা জয় পেয়েছে। আবার মেয়েদের হলে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ কম থাকায়, সেখানে ভিন্নমত বা স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রলীগের বিকল্প কাউকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল।

ডাকসুর সাবেক এ জিএস বলেন, অতীতে নির্বাচনের পর ছোটখাটো অভিযোগ শোনা যেত। কিন্তু ফলাফলে সব ছাত্রের আস্থা ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনের মতো অনিয়ম, ভোট কারচুপির অভিযোগ কখনও শোনা যায়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×