রক্তে ভেজা সড়ক : এর শেষ কোথায়

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ০২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বেপরোয়া বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি রাজধানীর নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণি রোডে জেব্রা ক্রসিংয়ে বাসচাপায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার নিহতের ঘটনায় আবারও উঠেছে নিরাপদ সড়কের দাবি।

এত আন্দোলন, সচেতন মহলের উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞের মতামত আর সংশ্লিষ্ট মহলের আশ্বাসের পরও সড়ক পথে নৈরাজ্য চলছেই। প্রতিদিনই কারও না কারও রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ। বাসচালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা, যত্রতত্র থামান, চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার- সবই চলছে।

ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাসের চলাচল, উল্টোপথে বা ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে গাড়ি চালান, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার কিংবা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হওয়ার ঘটনাও থেমে নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াদের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহতদের সাড়ে ১৮ শতাংশ ১৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ ঝরে যাচ্ছে প্রতিদিন- এর যেন কোনো শেষ নেই, বিচার নেই।

সড়ক দুর্ঘটনার গত দশ দিনের চিত্র

১৯ মার্চ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা গেট এলাকায় সুপ্রভাত বাসের চাপায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী আবরার আহম্মেদ চৌধুরী। এরপর তার সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নামে। পরে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করে শিক্ষার্থীরা। এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে শিক্ষার্থী নিহতের জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা।

শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দফায় চলা এ আন্দোলনের মধ্যেই সারা দেশে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নিহত কয়েকজন হতভাগা শিক্ষার্থীর ঘটনা তুলে ধরা হল। ওই ঘটনার একদিন পরই ২১ মার্চ সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে কাভার্ডভ্যানের চাপায় হৃদয় (১৭) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হয়। সেদিনই খুলনার রূপসা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে ইটবোঝাই ট্রলির চাপায় প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী আখি মনির (৭) মৃত্যু হয়। এছাড়াও ওই নরসিংদীর বেলাবোর বারৈচা এলাকায় কাভার্ডভ্যানের চাপায় ৭ম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্র প্রাণ হারায়। একই দিন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী মা পারভীন আক্তার সানজিদা (৩০) ও তার স্কুল পড়ুয়া ৯ বছরের মেয়ে ফেরদৌসী আক্তার জান্নাত ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

২৩ মার্চ বরিশাল নগরীর গড়িয়ারপার সংলগ্ন তেঁতুলতলা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় বিএম কলেজের ছাত্রী শীলা হালদারসহ ৭ জন নিহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও ২০ মার্চের দুর্ঘটনার জেরে ২৩ মার্চ পা হারাতে হয় যশোর বেনাপোলের নাভারন বরুজবাগান পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী মোফতাহুল জান্নাত নিপাকে।

একই দিন ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের মেদিনীমন্ডল এলাকায় উল্টো পথে গিয়ে অনন্ত (১২) নামের এক শিক্ষার্থীকে পিষে দেয় ‘বনফুল পরিবহন’ নামে একটি বাস। ২৩ তারিখেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরীর সালনা এলাকায় বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই কলেজছাত্র নিহত হন। এরপর ২৪ মার্চ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চাপায় সুমন মিয়া (২৪) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হন।

সব মৃতুই যন্ত্রণার তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে নির্মম মৃত্যুবরণ করেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আফনান (২১)। তার সহপাঠীদের অভিযোগ, ওয়াসিমসহ আরেকজন ছাত্র এ বাসে করে বাড়ি থেকে সিলেট আসছিল। বাসে ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে দুজনকেই বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় বাসটির চালকের দুই সহকারী। এর মধ্যে ওয়াসিমের ওপর দিয়ে আরেকটি গাড়ি চলে যাওয়ায় ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। ২৪ মার্চ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চাপায় সুমন মিয়া (২৪) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হন। সেদিনই চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা ও চান্দগাঁও থানা এলাকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ দুজন প্রাণ হারান। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে কুমিল্লায় পৃথক দুই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দুই স্কুলছাত্রী। ২৮ মার্চ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ আটজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেদিনই লোকাল বাসে ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া পীরের বাড়ি থেকে ফেরার পথে মাদারীপুরের কলাবাড়িতে ট্রাকের ধাক্কায় ব্রিজের রেলিং ভেঙে খাদে পড়ে ৮ বাসযাত্রী মারা যান। ২৯ মার্চ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় সিএনজি অটোরিকশাকে চাপা দিয়ে কলেজ ছাত্রসহ চারজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ‘সুগন্ধা পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস। শিক্ষার্থী ছাড়াও আন্দোলনের মধ্যেও বিগত দশ দিনে প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা যান। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বিগত চার বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯ হাজার ৩১৫ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে সড়কে প্রাণ গেছে ২০ জনের। সর্বশেষ ২০১৮ সালে মারা গেছেন ৭ হাজার ২২১ জন।

হাত তুললেই যত্রতত্র বাস স্টপেজ

গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসগুলোর জন্য নগরীতে কোনো নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত স্টপেজ চিহ্নিত নেই। যেখানেই উঠছে যাত্রীর হাত সেখানেই থামছে বাস। অর্থাৎ সেখানেই ‘বাস স্টপেজ’। এদিকে বিআরটিএ অথবা ট্রাফিক বিভাগের কোনো দৃষ্টিই নেই। যাত্রী হাত তুললেই অথবা বাস থেকে কেউ নামতে চাইলেই নগরীর সড়কপথে যেখানে-সেখানে বাস থামে, আর যাত্রীরা ওঠানামা করেন। যানজটের এটা একটা প্রধান কারণ। অথচ কোনো কর্তৃপক্ষের মুখেই আজ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নগরীর সড়কপথে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ চিহ্নিত করে, স্টপেজ ছাড়া অন্য কোনোখানে বাস থামানো কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ করা গেলে যানজট ও দুর্ঘটনা সমস্যার এক চতুর্থাংশ সমাধান করা সম্ভব।

বেপরোয়া বাস, অসুস্থ প্রতিযোগিতা

সড়ক দুর্ঘটনার যতগুলো কারণ বিশ্লেষকরা বের করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাসের বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক আর গাড়ির ফিটনেস অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউট (এআরআই) বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ।

২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এ সময়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬৬৬টি। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই বাসের কারণে ঘটেছে। আর এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ বেপরোয়া বাস চালানো। অন্যদিকে গত চার বছরের সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ছাড়াও বিপজ্জনক ওভারটেকিং (পাল্লাপাল্লি), সড়ক-মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মুঠোফোন ব্যবহার, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা এবং সড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখের কাছাকাছি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানান, সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরানোর দায় কম-বেশি সবার। বিআরটিএর যানবাহনের ফিটনেস যাচাই করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দক্ষ চালকের সংকট কাটাতে চালক প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলাসহ লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে।

রাজধানীর বেশিরভাগ চালকই মাদকাসক্ত

রাজধানীর অধিকাংশ বাসচালকই মাদকাসক্ত। বেসরকারি সংস্থার একটি জরিপের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর ৮৯ শতাংশ বাসচালকই মাদকের সঙ্গে জড়িত।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে বাসচালকদের মাদক গ্রহণের ভয়াবহ চিত্র। পাশাপাশি চালকরাও স্বীকার করেছেন, নিয়মিত গাঁজা-ইয়াবা সেবনের কথা। জানিয়েছেন, কেন তারা মাদক সেবন করেন, কীভাবে এসব আসে তাদের নাগালে। বাসচালকদের মাদকাসক্তির বিষয়টি স্বীকার করেছেন মালিক সমিতির নেতারাও। বিশেজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালালে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও আবদুল্লাহপুরে গিয়ে দেখা গেছে, চলন্ত বাসের পেছনের সিটে শুয়ে আছেন একজন মাদকসেবী। পরিচয় গোপন করে আলাপচারিতায় জানা গেল, তিনি পেশাদার চালক। তার দাবি, গাড়ি চালনায় মনোযোগ ও যাত্রীদের সঙ্গে বিতর্কের সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই সেবন করেন মাদক। তিনি বলেন, যাত্রীরা যেভাবে গালাগাল করে সেগুলো কানে না লাগানোর জন্য আমাদের নেশা করতে হয়। কেউ কেউ বলছেন, গাঁজা না খেলে অসুস্থ হয়ে যান।

বাসস্ট্যান্ডের কিছু বাসের ভেতর প্রকাশ্যেই চলছে ইয়াবা সেবন। ইয়াবাসেবীরা জানান, মাদক ছাড়া জীবন অচল তাদের। ইয়াবা সেবনে নাকি শক্তি ফিরে পান শরীরে। একজন ইয়াবাসেবী বলেন, ইয়াবা খেলে শরীরে শক্তি বেড়ে যায়। এ গরমে শক্তি পেতেই ইয়াবা খাই। এটা খেলেই সব ওকে। আরেকজন বলেন, গাড়ির গরম, মানুষের গরম, রাস্তার গরম সবকিছু মোকাবিলা করতে ইয়াবার বিকল্প নেই। তাছাড়া সারাদিন শত শত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। এটা সবকিছু সহ্য করতে সহায়তা করে। এদিকে পরিবহন শ্রমিকদের টার্গেট করে রমরমা বাণিজ্য চলে মাদকের।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহও চালকদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমরা হাজারবার বলার পরও এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আসছে না। অন্যদিকে পরিবহনের তুলনায় দক্ষ চালকের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা এই সুযোগটা নিচ্ছেন। হিসাব করলে দেখা যায় প্রায় ২০ লক্ষাধিক চালকের অভাব রয়েছে আমাদের। আর শুধু রাজধানীতেই সেই সংখ্যাটা দুই লক্ষাধিক। আমরা বারবার মালিকদের বলেছি, লাইসেন্সবিহীন এবং মাদকাগ্রস্তকে গাড়ি না দিতে। হয়তো নিরুপায় হয়েই তাদের এটা করতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকাসক্ত কোনো চালকই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে পারেন না। জাতীয় মানসিক রোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদক গ্রহণের ফলে শরীরে এক ধরনের সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এতে সে হয়তো কিছুটা ভালো বোধ করে। কিন্তু এটি তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শরীরের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়। একজন মাদকাসক্তের পক্ষে কখনোই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।

লাখ লাখ ভুয়া চালক

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, চলতি গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪২২টি। আর বিভিন্ন শ্রেণীর যানবাহনের জন্য চালক লাইসেন্স আছে প্রায় ২৮ লাখ। এর মধ্যে একই লাইসেন্সে মোটরসাইকেল ও অন্য যানবাহনের লাইসেন্সও আছে। এদের বাদ দিলে মোট চালক সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী ১৮ লাখের বেশি যানবাহন চালাচ্ছেন ‘ভুয়া’ চালকরা।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, সড়কে দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা। এখানে বাসের রুট পারমিট দেয়া হয় অবৈজ্ঞানিকভাবে। রুটগুলোতে কতগুলো বাস চলতে পারবে, সেটি বিবেচনায় নেয়া হয় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে অদক্ষ, প্রশিক্ষণহীন ও লাইসেন্সবিহীন চালক। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের জন্যই অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। চালকের অধৈর্য, নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ক্লান্তি দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। একজন চালকের দিনে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর নিয়ম থাকলেও আমাদের দেশের বেশি মুনাফা এবং ট্রিপের আশায় চালকরা ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালান। দ্রুত ট্রিপ দিতে গিয়ে বেপরোয়া গতি ও রেষারেষিতে মেতে ওঠেন।

অকার্যকর সিগন্যাল বাতি

রাজধানীর যানজট নিরসনে কোটি কোটি টাকার সিগন্যাল বাতিগুলো অকেজো হয়ে গেছে। বাতির জায়গায় বাতি আছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই জ্বলে না। ফলে ট্রাফিকদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে হাতের ইশারায়, অনেক সময় ট্রাফিকদের রশিও ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশ্বের উন্নত দেশ ও নগরে পরিবহন ব্যবস্থা অটোমেটিক সিগন্যালনির্ভর হয়েছে বহু আগে। এর অনুকরণে নব্বই দশকে ঢাকা মহানগরে অটোমেটিক সিগন্যাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার তথা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। সেই থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতি-পোস্ট স্থাপনের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ আর স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের। ফলে দুই সংস্থার মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষেরও সিগন্যাল না মানার সংস্কৃতি চলে আসছে বছরের পর বছর।

ডিজিটালাইজড ট্রাফিক সিগনাল না থাকাকে বাংলাদেশের ট্রাফিকের অব্যবস্থাপনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে দায়ী করেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের এখনও ম্যানুয়ালি হাত উঁচিয়ে যানবাহন দাঁড় করিয়ে কাজ করতে হয়। ট্রাফিক এরফোর্সমেন্টের পুরো কাজ জনে জনে হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে করতে হয়। বিষয়টি যদি অটোমেশনে থাকত, তাহলে এত সময় দেয়া লাগত না। কেউ যদি সিগন্যাল লাইট লঙ্ঘন করত তাহলে অটোমেটিক গাড়ির নাম্বার প্লেট স্ক্যান করে সব তথ্য ওই ব্যক্তিকে এসএমএসে জানিয়ে দেয়া হতো। এত মানুষের পেছনে দৌড়াতে হতো না। পুরোপুরি অটোমেশনে না যাওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞ অভিমত

আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে : ইলিয়াস কাঞ্চন

সড়কে প্রতিনিয়তই ঝড়ছে তাজা প্রাণ, সংশ্লিষ্টরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে আসা ইলিয়াস কাঞ্চন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর চেয়ারম্যান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু আইন করলেই চলবে না পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু চালকরা দায়ী নয়। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। ওভারটেক ওভার স্পিড যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তেমনি ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলও বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, চালকদের মানসিকতা পরিবর্তন করার দায়িত্ব যাদের তারা কেন এত উদাসীন? তবে সরকার কঠোরভাবে সড়ক পরিবহন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও মালিক-শ্রমিকদের সংগঠনের বিরোধিতার কারণে তারা সফল হচ্ছে না। একই ধরনের ঘটনা বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার জন্য এবং এর প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার জন্যই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকার যদি এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা না করে তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।

সড়ক দুর্র্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা

সম্ভব : কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ

বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেছেন, সাধারণত রাস্তার মোড়ে, পথচারী পারাপারে, বাস স্টপেজে, লেভেল ক্রসিংয়ে, হাট-বাজার এলাকায়, রাস্তার বাঁকে, সেতু কালভার্ট এলাকায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। দুর্ঘটনা যেমন চালকের কারণে ঘটে থাকে তেমনি পথচারীও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হয়। একইভাবে ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, আইনপ্রয়োগে শিথিলতা এবং লাইসেন্সপ্রদানে কর্তৃপক্ষের ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ বেপরোয়া গতি এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা। পরিবহন শ্রমিকদের ট্রিপভিত্তিক উপার্জন তাদের। যত ট্রিপ তত আয়। অন্য গাড়ির আগে থাকার জন্য এক ধরনের মাথা খারাপ হয়ে যায় তাদের। ফলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে একটুও ভাবে না চালকরা। দুর্ঘটনার পেছনে যাত্রীরাও দায়ী। ফুটপাথ কিংবা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার প্রবণতা দুর্ঘটনার বড় কারণ।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অবশ্যই বাসের লেন আলাদা করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের উপার্জন ট্রিপভিত্তিক নয় দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক ভাতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দূরপাল্লার যানে দু’জন চালক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্সপ্রদান কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল মানসিকতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস সনদ দিতে হবে। যাত্রীরা রাস্তা পারাপারে আইন মেনে চললে এবং ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারসহ অনান্য বিষয়ে সচেতন হলে আশা করা যায় চলমান সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।

সড়কে সেনাবাহিনী নামানো

উচিত : আশীষ কুমার দে

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। গত বছরের জুলাই ও চলতি বছরের ১৯ মার্চ দুটি সড়ক দুর্ঘটনার পর ছাত্ররা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলায় তারাই এখন বেপরোয়া পরিবহন শ্রমিকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পুলিশ ও বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও সড়ক পরিবহন খাতে বিরাজমান নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করা যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের এক বক্তব্যে এ ব্যর্থতার কথাই ফুটে উঠছে।

যুগান্তরকে তিনি বলেন, মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতার কাছে প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়েছে। এছাড়া এর পেছনে বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এক শ্রেণীর পুলিশ সদস্যর অনিয়ম-দুর্নীতিও রয়েছে। ফলে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা কঠোর নির্দেশনায়ও গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরছে না। এ অসহনীয় পরিস্থিতিতে সারা দেশে সড়ক পরিবহন খাতে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা নিরসন এবং সড়ক দুর্ঘটনা ও অনাকাক্সিক্ষত প্রাণহানি হ্রাসে সড়কে সেনাবাহিনী নামানো উচিত। তা না হলে সড়কে এভাবে প্রাণ ঝরতেই থাকবে। সরকারের কাছে অনুরোধ করব যাতে অন্তত এক বছরের জন্য সড়ক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : সাইফুল ইসলাম খান ও আল ফাতাহ মামুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×