হাফ ভাড়া কার্যকর নেই

ওস্তাদ সামনে স্টুডেন্ট, জোরে চালান!

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাইফুল ইসলাম খান

শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে মুখে মুখেই। ধূর্ত বাস মালিকরা বাসে বাসে ‘হাফ পাস নেই’ স্টিকার সাঁটিয়েই দায় সেরেছে।

অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ হাফ ভাড়া তো দূরে থাক স্টুডেন্ট বুঝতে পারলে বাসেই তোলেন না হেলপাররা। উল্টো হাঁক ছাড়েন, ওস্তাদ সামনে স্টুডেন্ট জোড়ে চালান।

ভাড়া বিতণ্ডা হলে মাঝপথে শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেয়ার ঘটনা এখন নিত্যকার দৃশ্য। সু-প্রভাত, গাজীপুর লিংকে চলাচলকারী ইমরান খান প্রিন্স নামে এক শিক্ষার্থী জানান, ছাত্র হিসেবে হাফ ভাড়া তো দূরের কথা, আরও বেশি ভাড়া দাবি করে। না দিলে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেয়। টঙ্গী স্টেশন রোডে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল কন্ড্রাক্টর। ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছি।

হাফ পাস বিড়ম্বনার কথা বলতে গিয়ে ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র মো. সালমান খান বলেন, বিকাশ, ভিআইপি ২৭ বাস সিটিং সার্ভিসের নাম করে প্রায় সম্পূর্ণ রাস্তা ৫-৬ জন লোক দাঁড় করিয়ে নেয়। আর স্টুডেন্ট ভাড়ার কথা শুনলে এরা আকাশ থেকে পড়ে। মনে হয় জীবনে কোনোদিন এমন কথা শুনেই নাই। এরা সম্পূর্ণ ভাড়া না পেলে টাকাই হাতে নিতে চায় না।

বেকায়দায় পড়ে মাঝে মধ্যে হাফ ভাড়া নিতে বাধ্য হলে নামার সময় তারা অকথ্য কিছু কথাও শুনিয়ে দেয়। মূল সমস্যা হল কেউ প্রতিবাদ করলেও অধিকাংশ যাত্রীরা চুপচাপ থাকে। লোকালের মতো চড়ে কিন্তু ভাড়া দেয় সিটিংয়ের। একই সুরে তিতুমীর কলেজের ছাত্র দেলওয়ার হোসেন দ্বীপ বলেন, বলাকা, গাজীপুর পরিবহন, প্রভাতী, ভাওয়াল এরা সিটিং সার্ভিসের নামে চিটিং সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছামতো লোক নিচ্ছে কিন্তু তারা নাকি সিটিং সার্ভিস। তারা ভুলেও স্টুডেন্ট ভাড়া নেয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহাম্মদ বাধনের অভিযোগ, শুক্রবারে কোনো হাফ নেই। অথচ শুক্রবারে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকে। সবদিনেই হাফ ভাড়া থাকার কথা। কিন্তু বাস হেলপাররা পুরো ভাড়াই নেয়। প্রায় সব বাস। বন্ধের দিনে ফুল ভাড়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দর্শনের ছাত্রী সায়মা সাদিয়া মুনাও। তিনি বলেন, শুক্রবার কেন হাফ ভাড়া নিতে চায় না? শুক্রবার কি শিক্ষার্থীরা অনেক বড়লোক হয়ে যায়?

ছাত্রাবস্থায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর হাতেই খুব সীমিত পরিমাণে টাকা থাকে। বাবা-মায়ের দেয়া টাকাই তাদের খরচের প্রধান উৎস। এর বাইরে টিউশনি বা অন্য কোনো সোর্স থেকে প্রাপ্ত টাকার পরিমাণও খুব বেশি হয়ে থাকে না। বাস ভাড়ার একটি খসড়া হিসাব জানিয়ে মোহাম্মাদ আলী আকবর শুভ নামে এক ছাত্র বলেন, শুধু বাসে যাতায়াতের জন্যই যদি রাস্তায় প্রতিদিন গুনতে হয় ৫০ থেকে ৮০ টাকার মতো। তবে মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০০/২৪০০ টাকায়। যা বহন করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তাই স্টুডেন্ট ভাড়া যৌক্তিক দাবি। এ ক্ষেত্রে বাস কন্টাক্টর যদি আইডি কার্ডও দেখতে চায় তাও গ্রহণযোগ্য। ঢাকার রাস্তায় সিটিং সার্ভিস নামে যে বাস চলে তা রীতিমতো ডাকাতি! এ সিটিং সার্ভিস প্রথা তুলে দেয়া উচিত।

শিক্ষার্থী সায়েম আশরাফি সাজিদ মনে করেন, কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া নিলে তখন হাফ ভাড়া না নিলেও সমস্যা হয় না। বেশিরভাগ রুটে নামের সিটিং বাস চলে যেগুলোতে অর্ধেক গন্তব্যে সম্পূর্ণ রুটের ভাড়া দিতে হয়।

নারীদের দুর্ভোগ আরও বেশি : নারী যাত্রীরা পুরুষের মতো লড়াই করে বাসে উঠতে ও নামতে অস্বস্তিতে পড়েন। বাড়তি ঝামেলা মনে করে অনেক বাসই নারী যাত্রীদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। আর নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া যেন অমাবস্যার চাঁদ। ছাত্ররা অনেক সময়ই অধিকারের জোর দেখাতে পারলেও ছাত্রীদের অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় হেলপারদের দৌরাত্ম্যের কাছে। ইডেন মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী মৌসুমী আক্তার বলেন, আগে ভিআইপি ২৭ নাম্বার নামে লোকাল বাস চলত, যেখানে ২০ টাকা নিতো উত্তরা থেকে আজিমপুর পর্যন্ত। এখন এই একই রুটে বিকাশ ও ভিআইপি বাসে ৪০ টাকা করে ৮০ টাকা ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে। অনেকের কাছে হয়ত এই ভাড়া কিছুই না তবে আমরা যারা মধ্যবিত্ত আছি তাদের কাছে এই টাকাটা অনেক। অনেক সময় দেখেছি ঢাকা কলেজের ভাইরা চেকারদের কাছ থেকে হাফ পাস নিতে পারে। তবে আমরা অনেক মেয়েরা আছি যারা এই কাজটা করতে পারি না। তাই ফুল ভাড়াটাই দিতে হয়।

সিদ্ধেশ্বরী কলেজের ছাত্রী শারমিন বিনতে হায়দার স্কাই লাইন ও আজমেরী গ্লোরী বাসে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, এমনও হয়েছে আমি নামব মগবাজার, আমার ভাড়া চেয়েছে ২৫ টাকা আর যে নামবে তেজগাঁও তার ভাড়া চেয়েছে ২০ টাকা। শুধু আমি স্টুডেন্ট বলে। হাফ পাশের কথা তুললে ২০ টাকা দিতে বলে। অনেক বাসেই দেখা যায় পুলিশ সদস্যরা বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করে। এ বিষয়ে রবরব পরিবহনের যাত্রী সিমু আক্তার বলেন, স্টুডেন্ট পাশের কথা বললে তারা বলে শুধু পুলিশ পাশ আছে। আর কোনো পাশ নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ফারহানা মৌসুমী মৌ বলেন, মিরপুর টু আজিমপুর রুটের কোনো বাসই হাফ ভাড়া নেয় না। মিরপুর লিংক, সেফটি, দ্রুতি এগুলো সব ২৫/২৬ টাকা করে ভাড়া নেয়। যেখানে স্টুডেন্ট ভাড়া ১০ টাকা ছিল সেখানে এখন আড়াই গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে যাওয়া লাগে। হাফ ভাড়ার কথা বলাও যায় না এসব বাসের হেলপারদের সঙ্গে, বললেই নেমে যেতে বলে। এদের কাছে অসহায়ভাবে জিম্মি আমরা।