এবারও সিন্ডিকেটের দখলে রোজার বাজার

‘রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হবে না’- বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির এমন ঘোষণার পরও শবেবরাতের আগেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বাজার দর। হু হু করে বাড়ছে প্রতিটি নিত্যপণ্যের মূল্য। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্যবারের মতো এবারও সিন্ডিকেটের কবলে রোজার বাজার। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংসহ নানা পদক্ষেপ নেয়ার পরও রোজার বাজারে অনিয়ন্ত্রিতই থেকে যাচ্ছে পণ্যদ্রব্যের মূল্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে আইনের আওতায় না আনলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় বাজারের আগুন। বিস্তারিত লিখেছেন-

  আল ফাতাহ মামুন ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোজার বাজার

রোজার আগেই বাজার গরম

অন্যান্য বছর রোজার শুরুতে দাম বাড়লেও এবার বেশ আগেভাগেই সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এ বছরের জানুয়ারি মাসে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে রোজার বাজার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এপ্রিলের শুরুতেও বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম রোজার পণ্য সিন্ডিকেটের দখলে পড়ার কথা বলে। চলতি সপ্তাহে যখন হু হু করে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় তখন প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করছে। প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানের পণ্য সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে। কিন্তু এবার ব্যবসায়ীরা একটু আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। যাতে করে রমজান উপলক্ষে দাম বাড়ানোর দোষ থেকে মুক্ত থাকা যায়। কিন্তু হঠাৎ এ দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতাই দেখাতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের নয়া কৌশল

শ্যামবাজার-কাওরান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাছ-মাংস, শাক-সবজি, চিনি-ছোলা সব ধরনের পণ্যে ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি রাখা হচ্ছে। হঠাৎ এ দামবৃদ্ধিতে অবাক সাধারণ ক্রেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্যামবাজারের এক সবজি আড়তদার বলেন, ‘রোজার শুরুতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ালে আলোচনা হয়, অভিযান হয়, জেল-জরিমানাও হয়। তাই এবার আমরা রমজানের আগেই দাম বাড়িয়ে দেই।’ মাংসবিক্রেতা জুম্মন কসাই বলেন, ‘রোজার মাস শুরুর আগে মাংসের দাম নির্ধারণ করে থাকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে এ দাম নির্ধারণ করা হয়। তাই বৈঠকের আগেই গরুসহ সব ধরনের মাংসের দাম বাড়িয়ে দেই আমরা।’

সঙ্কট নেই, তবুও মূল্যবৃদ্ধি

রমজানের দাম বাড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দেখান হয়- পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা। কিন্তু রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে- সরকারিভাবে এমন ঘোষণার পরও থামানো যাচ্ছে না মূল্যবৃদ্ধি। ব্যবসায়ী নেতারাও স্বীকার করেছেন, তাদের স্টকে পর্যাপ্ত পণ্য রয়েছে। তারপরও রোজার আগেই কয়েক দফায় বেড়ে গেছে মাছ-মাংস, শাক-সবজি, চিনি-ছোলাসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। পর্যাপ্ত সরবরাহের বক্তব্যটি সঠিক- এমন তথ্য উঠে এসছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের করা প্রতিবেদনে। গত ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, চাহিদার তুলনায় নিত্যপণ্যের মজুদ অনেক বেশি। তাই এবারের রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না। শুক্রবার ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। খাতুনগঞ্জের শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মহিউদ্দিন জানান, বাজারে রোজার পণ্যের কোনো সঙ্কট নেই।

চাহিদা শেষে উদ্বৃত্ত থাকছে রোজার পণ্য

চাকতাই-খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী গণমাধ্যমকে জানান, ট্যারিফ কমিশন ও সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি মাসে ছোলার চাহিদা গড়ে ১২ হাজার টন। বছরের চাহিদা ১ লাখ ৪৪ হাজার টন। শুধু রমজানে চাহিদা ৮০ হাজার টন। ইতিমধ্যেই দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণে ছোলা আমদানি করা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার টন। সেই হিসাবে কোনো সংকট নেই। দুই বছর ধরে আমদানিকারকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোলা আমদানি করে আসছে। এতে কয়েক বছর ধরে দেশে ছোলার সংকট থাকছে না। বরং উদ্বৃত্ত থাকছে। চলতি বছর প্রচুর পরিমাণে ছোলা আমদানি করা হয়েছে। স্থানীয় আমদানিকারক ছাড়াও দেশের কয়েকটি শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ছোলা আমদানি করেছে। এসব ছোলা ইতিমধ্যেই বাজারে প্রবেশ করেছে। আরও কয়েকটি জাহাজে ছোলা আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া গত রমজানের জন্য আমদানি করা ছোলার মজুদ রয়েছে। একইভাবে রোজার অন্যান্য পণ্যও চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত থাকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুগান্তরসহ প্রায় সব ক’টি সংবাদ মাধ্যম।

সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সাধারণ ভোক্তা

পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও নানা কারণ দর্শিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয় একদল অসাধু সিন্ডিকেট। বৃষ্টি হলেও দাম বাড়ে, না হলেও দাম বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম কিংবা বেশি যাই হোক না কেন, অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়ায় তাদের ইচ্ছামতো। অবাক হলেও সত্য! রোজার আগে স্থিতিশীল বাজার অস্থিতিশীল করতে অসাধু চক্র সময় নিয়েছে মাত্র ২ দিন। সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়াচ্ছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কয়েকজন আমদানিকারক ২ দিনে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ছোলা-চাল-ডাল-চিনি কিনে নেয়। এতে করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয় এবং দাম বেড়ে যায়। সিন্ডিকেটের কারণেই এসব ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের বাজার চাকতাই-খাতুনগঞ্জ থেকে পণ্য কিনে বিভিন্ন স্থানে খুচরা বিক্রি করেন বিক্রেতারা। তারা জানান, রমজানকে সামনে রেখে চাকতাই-খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা আগেভাগে ভোগ্যপণ্য মজুদ শুরু করার ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে রমজানের অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের দাম।

ভুয়া অজুহাতে দাম বাড়ে কয়েক দফায়

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পর বেশি দামে পণ্য বাজারে ছাড়ার পর বলা হয়- বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, তাই আমরাও বেশি দামে বিক্রি করছি। তবে ব্যবসায়ীদের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, একজন ব্যবসায়ী আজকে যে পণ্য বাজারে তুলেছেন সেটা ৪-৫ মাস আগে এলসি খুলেছেন। সেই হিসাবে তার পণ্যের দাম আজকের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। এটা একটি অসাধুতা। কারওয়ান বাজারের একাধিক চালের আড়তের মালিক মাহবুব ভুইয়াঁ। তিনি বলেন, একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয় নিত্যপণ্যের। রোজার আগেই তিন-চার দফায় বেড়েছে চাল-ডাল-চিনি-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এ ছাড়া দাম বাড়ানোর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতাও লক্ষণীয়। যখন পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় তখন পাইকাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করেন, আর খুচরা ব্যবসায়ীরা দোষ দেন পাইকারদের। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অসাধু সিন্ডিকেটচক্র।

সুফল মিলছে না বাজার মনিটরিংয়েও

অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামাতে এবং দ্রব্যমূল্য ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য বিশেষ অভিযান, মোবাইলকোর্ট, জেল-জরিমানাও করা হয়ে থাকে। এত সব সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য যেন থামানই যাচ্ছে না। এর কারণ সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা বলেন, যখন বাজার মনিটরিংয়ের লোক আসে তখন নির্ধারিত দামেই পণ্য বেচাকেনা চলে। মনিটরিং আওয়ার শেষ হলেই আবার আমাদের দামে কেনাবেচা হয়। এ ছাড়া বাজার মনিটরিং ব্যর্থতার বড় কারণ হল- বাজার পরিদর্শন শেষে টিম লিডাররা রিপোর্ট প্রদানে প্রায়ই বিলম্ব করেন এবং পরিদর্শন প্রতিবেদনে পরামর্শ বা স্পষ্ট মতামত প্রদান করেন না। পরিদর্শিত বাজারে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করলে মন্ত্রণালয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু মনিটরিং টিম এসব করে না। তাই বাজার মনিটরিংয়ের তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায় না। বাজার মনিটরিংয়ের সাবেক এক টিম লিডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরে এসব কথা বলেন।

সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে হবে

গোলাম রহমান

সভাপতি, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

দুঃখজনক হলেও সত্য! রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ইতিমধ্যে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। ক্যাবের পক্ষ থেকে আমরা প্রতি বছরই বলি, বাজারে যেন লোক দেখান অভিযান পরিচালনা করা না হয়। অনেক সময় দেখা গেছে, অভিযানের সময় বাজারে পণ্যের দাম ঠিক থাকে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে করে বাজার মনিটরিংগুলো কাক্সিক্ষত সফলতা পাচ্ছে না। একইসঙ্গে কমছে না অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও। এজন্য আমাদের পরামর্শ হল- সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করতে হবে। যতক্ষণ বাজার চলবে ততক্ষণ বাজারে মনিটরিং টিমও থাকবে। গুদাম, পাইকারি ও খুচরা বাজারসহ সর্বস্তরে নজরদারি বাড়াতে হবে। রমজানের আগে বা রমজানের সময় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার লোভে পণ্যের দাম বাড়ায়। দেশে যে পরিমাণে পণ্য আছে তাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর কথা নয়। আবার কিছু কিছু পণ্যের দাম রমজানের এক মাস আগ থেকেই বাড়ানো হয়। এ কারণে সরকারের মনিটরিং সংস্থাগুলোর উচিত কঠোরভাবে মনিটরিং করে অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা।

অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেই

মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর

মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর

‘ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ভোক্তারা যে কোনো প্রতারণার স্বীকার হলে তারা আমাদের কাছে অভিযোগ জানালে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। আপনারা জানেন, আগের চেয়ে আমাদের সেবা আরও বেড়েছে। পবিত্র রমজানে যেন কোনো অসাধু চক্র ভোক্তাদের প্রতারিত না করে এবং নিত্যপণ্য ক্রয়সীমার মধ্যে থাকে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি করা হবে। রোজায় যেন পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, সে জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী কয়েকবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আমাদের টিম নিয়মিত বাজার তদারক করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ টিমও আছে। আমরা বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছি। আশা করি, ভোক্তারা অহেতুক হয়রানি থেকে নিষ্কৃতি পাবেন। তাদের রমজান সুন্দরভাবে কাটবে।

কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো কবিরা গুনাহ

মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ এহছানুল হক মুজাদ্দেদী

এম ফিল গবেষক, মুফাসসিরে কোরআন, খতিব, মণিপুর বাইতুর রওশন (মাইকওয়ালা) জামে মসজিদ, মিরপুর, ঢাকা।

হালাল উপায়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য করা শ্রেষ্ঠ ইবাদত। পবিত্র হাদিস শরিফ থেকে জানা যায়, রাসূল (দ.) রজব মাস থেকেই মাহে রমজানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতেন। আর পুরো শাবান মাস নফল রোজা রেখে দেহ-মনকে প্রস্তুত করতেন প্রেমমাস রমজানের জন্য। সাহাবিরাও রমজান উপলক্ষে আত্মাকে সতেজ করতেন কোরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত আর দান সদকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে। রাসূল (দ.) এবং আমাদের রমজান প্রস্তুতি সম্পূর্ণ উল্টো। ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যরে প্রশিক্ষণের মাস রমজানে ভ্রাতৃঘাতী ও নির্মমতার চর্চাই বেশি হয় আমাদের দেশে। মাহে রমজানকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী গুদামজাত করা হয় বেশি মুনাফার লোভে। পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা রোজাদারদের গলায় ছুরি ধরে বেশি লাভের আশায় ৬ মাস ১ বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেই। অথচ অনেক অমুসলিম দেশেও রোজার মাসে রোজাদারদের জন্য বিশেষ সেবা দেয়ার কথা শুনে থাকি। যেসব ব্যবসায়ী পণ্যমজুত করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে তাদের ব্যাপারে রাসূল (দ.) কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা, বেশি মুনাফার লোভে দ্রব্যসামগ্রী গুদামজাত করা স্পষ্ট হারাম। মানুষকে কষ্ট দিয়ে খাদ্যদ্রব্য গুদামজাতের ব্যাপারে অসংখ্য সহি হাদিস থেকে কিছু হাদিস এখানে উল্লেখ করা হল। হজরত মা’মার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (দ.) বলেছেন, ‘জনগণের জীবিকা সংকীর্ণ করে যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে সে বড় অপরাধী গণ্য হবে। আর জেনে রাখ! সে গোনাহগার সাব্যস্ত হবে। (মুসলিম ও তিরমিজি।) প্রিয়নবী (দ.) আরও বলেন- ‘মুজরিম তথা অপরাধীর পক্ষেই সম্ভব পণ্যমজুত করে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা।’ (মুসলিম।) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা বলেন, আলোচ্য হাদিসে মজুতদারকে অপরাধী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অপরাধী’ শব্দটি সহজ কোনো শব্দ নয়। মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে অপরাধী শব্দটি ফেরাউন, হামান ও কারুনের মতো প্রতাপশালী এবং অহঙ্কারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। যেমন পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল।’ (সূরা কাসাস : ৮)।

মজুতদারের নোংরা মানসিকতা ও কদর্যপূর্ণ স্বার্থপরতাকে মহানবী (দ.) এভাবে ব্যক্ত করেছেন- হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলকে (দ.) বলতে শুনেছি, ‘গুদামজাতকারী কতই না ঘৃণিত মানুষ। আল্লাহ তায়ালা দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দিলে সে চিন্তায় পড়ে যায়। আর বাড়িয়ে দিলে সে আনন্দিত হয়। (শুআবুল ইমান ও মেশকাত।) হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (দ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখবে, মানুষকে কষ্ট দেবে, সে এ সম্পদ দান করে দিলেও তার গোনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট হবে না। (মেশকাত।) খাদ্যদ্রব্য গুদামজাতকারী সম্পর্কে রাসূল (দ.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমদানি করবে সে রিজিক প্রাপ্ত হবে। আর যে গুদামজাত করবে সে অভিশপ্ত হবে। (ইবনে মাজাহ ও সুনানে দারেমি।)

আসন্ন মাহে রমজানে ব্যবসায়ী ভাইরা মজুতদারি থেকে নিজে বেঁচে থাকবেন। অন্যকেও এ ভয়াবহ গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। রোজাদারদের ঠকানোর গোনাহ থেকে আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেফাজত করুন। হালালভাবে ব্যবসা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দুনিয়ার সুখ, আখেরাতের মুক্তি লাভের পাশাপাশি নবী-সিদ্দিকদের সঙ্গে জান্নাতি হওয়ার তাওফিক আল্লাহ তায়ালা আমাদের দিন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×