কুলিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় ঈদে

  মো. বিল্লাল হোসেন ২৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ

পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল হয়ে নৌপথে পাড়ি জমান বরিশাল, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, ভোলা, মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার প্রায় কয়েক লাখ যাত্রী। এসব যাত্রীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে টিকিটকেন্দ্রিক তেমন সমস্যা না থাকলেও টার্মিনালে এসে কুলি ও ঘাট-শ্রমিকদের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল হতে হয়।

পাশাপাশি ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। আর ঈদ এলে এসব সমস্যা দ্বিগুণ আকার ধারণ করে। ঘরমুখো মানুষকে টার্গেট করে কুলি ও ছিনতাইকারী চক্র। এছাড়াও যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে নেয়া হয় নির্ধারিত টাকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। আর এসব ঘটনা ঘটছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনেই। যাত্রী হয়রানির বিষয়টি স্বীকার করে ঘাট-কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ব্যাপারে তারা যথেষ্ট সচেতন। অভিযোগ পেলে তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেন।

সদরঘাটে সরেজমিন দেখা যায়, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে লঞ্চগুলোতে নেই পর্যাপ্ত সেফটির ব্যবস্থা। ঈদকে কেন্দ্র করে ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া হচ্ছে অহরহ। টিকিটের দাম বৃদ্ধির অভিযোগ করেছেন অনেকে। এমডি অ্যাভেঞ্জার-৫ ও কীর্তনখোলা-১০ এ কথা বলে জানা যায়, লঞ্চের ডেকের ভাড়া ২০০ থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা, প্রতি কেবিনের ভাড়া বেড়েছে ৩০০ টাকা করে।

জানা গেছে, ঘাটের বাণিজ্যিক মালামাল ব্যবহারের জন্য নিউভিশন ইকোসিটি লি.-এর মাধ্যমে কুলি নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ আওয়ামী লীগ যুবলীগের সদস্য শিপু আহমেদ। অভিযোগ আছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কুলিরা রাজত্ব করে এ ঘাটে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পারে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে যাত্রীদের মালামাল বহন করার জন্য কুলি নিয়োগ দেয় বিআইডব্লিউটিএ। এদের অনেকই রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ হয়ে ঘাটে রাজত্ব করে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের নিয়ম না মেনেই সদরঘাটের প্রবেশপথে ইজারাদারের লোকেরা ইচ্ছামতো টোল আদায় করেন। হাতে কোনো মালামালের ব্যাগ দেখলেই টান দিয়ে লঞ্চে পৌঁছে দেয়ার পর দাবি করে অতিরিক্ত টাকা। কম দিতে চাইলে কুলিদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয় যাত্রীদের। এছাড়াও ঈদ এলে মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের উৎপাত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে।

বরিশালগামী যাত্রী শফিক মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এ যে আমার হাতে ব্যাগ দেখছেন এটা আমি নিজে নিয়ে লঞ্চে নিয়ে আসতে পারি কিন্তু কুলি জোর নিয়ে আসছে ১০০ টাকা দাবি করেছে ৭০ টাকা দিয়েছি। খুব অত্যাচার করে এরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঘাটশ্রমিক বলেন, ‘ভাই এহানে মলামাল টাইনা যে টেহা (টাকা) পাই তার ভাগ দিতে হয় নেতাদেরও, না হয় এখানে কাজ করা যাই না’।

ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাতায়াত করেন ওহাহেদুদ জামান রিয়াদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মাসে প্রায় দু-একবার যাতায়াত করি। ঘাটে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় কুলিদের হয়রানিতে, হাতে ব্যাগ থাকলেই এদের টাকা দিতে হয়। ওরা যত টাকা চায় ঠিক তত টাকাই দিতে হয়। মোট কথা ঘাটের যাত্রীরা এখানের কুলিদের কাছে জিম্মি। কয়েকটি লঞ্চ ছাড়া প্রায় লঞ্চের ভেতরে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট নেই। আর ঈদের সময়তো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা নিয়মিত দৃশ্য।

ঢাকা নদী বন্দরের বন্দর ও পরিবহন বিভাগের উপ-পরিচালক একেএম কায়সারুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অন্য বছরের মতো এবারও আমরা নৌপথে যাত্রীদের যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। প্রতিদিন এ বন্দর দিয়ে প্রায় ষাট সত্তর হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। ঈদের ছুটিতে যেদিন গার্মেন্টস ছুটি হয় সেদিন প্রায় ৮-১০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে।

ঘাটে যে কুলির দৌরাত্ম্য, তা নিয়ে আমরা সংকটের মধ্যে আছি, এদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের বির্বতকর অবস্থায় পড়তে হয়। তবে হুট করেও এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। বিআইডব্লিউটিএ পুলিশ প্রশাসন ও টার্মিনালের সব সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কুলি হয়রানির বিষয়ে হেল্প লাইনে গত একমাসে যেসব অভিযোগ এসেছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।

ছিনতাই ও মলমপার্টির দৌরাত্ম্য কমছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরা একটা সংঘবদ্ধ চক্র তারা বংশগতভাবে এসব করে, এদের জন্য সিসি ক্যামেরাগুলোও সচল রাখা যায় না।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সেক্রেটারি সিদ্দিকুর রহমান পাটুয়ারী যুগান্তরকে বলেন, কুলি হয়রানি বন্ধে বন্দর কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার পরও ঈদ সিজনে অনেক যাত্রী থেকে যায়। সবগুলো সমস্যা সমাধানে আমাদের উদ্যোগ নিচ্ছি।

বাংলাদেশ যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল বলেন, এবারের ঈদ ভরাবর্ষায় তাই নৌপথে কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই যাত্রীদের নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনে নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধে কঠোর হতে হবে। আমরা প্রতি বছরই দেখি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলেন, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেয়া হবে না। কিন্তু ঠিকই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েই নৌযানগুলো ছাড়ে। তাই দুর্ঘটনা ঘটার আগেই অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধে প্রশাসনের আন্তরিকতা কামনা করছি।

এছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি সদরঘাটে যাত্রী ভোগান্তির সবচেয়ে বড় কারণ কুলিদের দৌরাত্ম্য। এবার ঈদে কুলিদের দ্বারা যাত্রী হয়রানি বন্ধে প্রশাসন তৎপর হলে যাত্রীরা স্বস্তি পাবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×