সড়কে দিনে মৃত্যু ২০ জনের : দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তরুণদের দুঃসাহসিকতা

  সাইফুল ইসলাম খান ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্ঘটনা

মোটরসাইকেল, তরুণ সমাজের মধ্যে যার জনপ্রিয়তা ও চাহিদা তুঙ্গে। তুলনামূলক ছোট আকৃতি এবং অধিক গতিসম্পন্ন হওয়ায় এর চাহিদা দিন দিনই বেড়ে চলেছে।

যানজটের মধ্যেও ফাঁকা জায়গার মধ্য দিয়ে চালিয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারার সুযোগও মেলে মোটরসাইকেলে। ফলে রাইড শেয়ারিংয়ের প্রচলনের পর থেকে মোটরসাইকেলের সংখ্যা এখন যেন জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে।

এক ধরনের ঝোঁক থেকে পূর্বে মোটরসাইকেল চালালেও এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবিকা অর্জনের সুযোগও। তবে জীবিকা অর্জন করতে গিয়ে বেপরোয়াভাবে ড্রাইভিং করে অমূল্য জীবনটাই খুইয়ে ফেলেন অনেক যুবক। ট্রাফিক আইন লংঘন করার ফলে সৃষ্ট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ফি বছর হতাহতের সংখ্যা তাই বেড়েই চলছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির বিগত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২ দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হন। ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হন। আগের বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে ৬৬৭ বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এক হাজার ৩৪২ জন মানুষ বেশি মারা গেছে। এছাড়া ২০১৭ সালে এক হাজার ৬৩৫ ট্রাক-কার্ভাডভ্যান, এক হাজার ৪৭৫ মোটরসাইকেল, এক হাজার ২৪৯ বাস, ২৭৬ হিউম্যান হলার, ২৬২ প্রাইভেট কার, জিপ, মাইক্রোবাস, এক হাজার ৭৪ অটোরিকশা, ৩২২ ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ৮২৪ নছিমন-করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, বাস দুর্ঘটনায় বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি ঘটছে মোটরসাইকেলে।

একই সংগঠনের হিসাব মতে, ২০১৮ সালে সড়কে ঘটে যাওয়া পাঁচ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২২১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১৫ হাজার ৪৬৬ জন আহত হয়েছেন। প্রাণহানির সংখ্যাটি আগের ২০১৭ সালের তুলনায় কিছু কম। ওই বছর চার হাজার ৯৭৯টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হন। দেখা যাচ্ছে, আগের বছরের তুলনায় ৫৩৫টি দুর্ঘটনা বেশি হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ১১৬ জন এবং আহতের সংখ্যা ৭২৭ জন কমেছে। তবে গত দুই বছরের বার্ষিক দুর্ঘটনার দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়।

নিরাপদ সড়ক চাই নিসচা’র সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, গত বছর (২০১৮) দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি চাপায়, ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে দুই বাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে, সাত শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি উল্টে, চার শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি খাদে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আর এসব দুর্ঘটনায় যাদের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে ৫৬৬ জনই চালক। আর চালকদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি ১৬০ জন।

অন্যদিকে গত ঈদুল ফিতরে ২৭৩ জন নিহত ও ৮৪৯ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এই তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, ঈদ যাত্রা শুরুর দিন ৩০ মে থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা ১১ জুন পর্যন্ত ১৩ দিনে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় এ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এ বছর মোট সংঘটিত ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনার ৭৬টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আগামী ঈদে এ দুটি ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলে এ দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যাধিক্য লক্ষ্য করা যায়। বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যসূত্র থেকে দেখা যায়, মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাটাগরির নিবন্ধনকৃত যানবাহন ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৮৪টি। যার মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৯টি। অর্থাৎ মোট নিবন্ধনকৃত যানবাহনের ৬৩ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর বাইরেও অনিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী শহর এবং উপজেলাগুলোতে। জানা গেছে, মোট নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে ২০১৫ সালে ৭৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৭৮ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৭৯ শতাংশ মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৪টি, সেখানে ২০১৮ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৯টিতে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালকরা প্রতিনিয়ত ট্রাফিক আইন লংঘন করায় সড়কে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। ঢাকা শহরে সড়কের উল্টোদিক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বাধিক বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ২ হাজার ৫৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ২৪১টি হচ্ছে মোটরসাইকেলের। ওই বছর শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৪১ জন; আহত হয় ৯০ জন।

পরবর্তী বছরগুলোতে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমলেও ২০১৭ সালে তা বেড়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে আসে। ওই বছর সংঘটিত ২ হাজার ৯১৭টি দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ৬৩৭টি। শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গত বছর প্রাণ হারায় ৭৪৪ জন এবং আহতের সংখ্যা ৪০৫। অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান মনে করেন, গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে, বিশেষ করে এলজিইডির সড়কে সংঘটিত অনেক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসে না। ফলে তা পরিসংখ্যানেও ধরা পড়ে না। মোটরসাইকেল চালক যারা হতাহত হচ্ছে তাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যেই বেশি। প্রতি বছর আমরা কর্মক্ষম দক্ষ জনগোষ্ঠী সড়ক দুর্ঘটনার কারণে হারাচ্ছি, জাতির জন্য যা বড় ধরনের ক্ষতি। তাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×