বিশেষজ্ঞের অভিমত

হাতুড়েরাও প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার করে

  ডা. মোহাম্মদ শরীফ ০২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রসূতি

পরিচালক, এমসিএইচ সার্ভিসেস, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর

বাংলাদেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব মাতৃমৃত্যুর একটি কারণ।

বেসরকারি সেক্টর অর্থাৎ ক্লিনিকগুলোতে শতকরা ৮৩ ভাগ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হয়। পৃথিবীর মধ্যে এর হার সবচেয়ে বেশি। সরকারি হাসপাতালে অর্থাৎ পাবলিক সেক্টরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শতকরা ৩৪ ভাগ সন্তান প্রসব হয়। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মাতৃমঙ্গল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শতকরা ১০ ভাগের উপরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হয় না। স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক এবং যারা সার্জন নয় নরমাল চিকিৎসক তাদের জন্য এ ঘটনা ঘটছে।

আমাদের পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, বেসরকারি সেক্টরে দেশের উপজেলা পর্যায়ের ক্লিনিকগুলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ঘটনা বেশি ঘটছে। এর কারণ উপজেলা পর্যায়ে ব্যাঙের ছাতার মতো কিছু বেসরকারি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এই ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যসেবা মানসম্মত নয়। শতকরা ৯০ থেকে ৯৯ ভাগ এসব ক্লিনিকের লেবার রুম নেই। সরাসরি ওটি রয়েছে।

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্লিনিকগুলোর ওই ওটিতে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের ঘটনা নেই। শতকরা ৯৯ ভাগ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হচ্ছে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছুসংখ্যক চিকিৎসক ও হাতুড়ে ডাক্তারের দ্বারা। যারা ইউএসএ ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের দ্বারা ক্লিনিক পরিচালনা করে থাকে। রোগী আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়।

ওই রোগীদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করার জন্য দু-একজন চিকিৎসক রাখেন। যারা সপ্তাহে একদিন শুক্রবার ওইসব বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করায়। এ ধরনের ক্লিনিকের সংখ্যাও কম নয়। এছাড়া ওই ক্লিনিকগুলোতে অচিকিৎসকরাও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করায়।

কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে মাস সাতেক আগে রয়্যাল হাসপাতালে একজন গর্ভবতীর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়। প্রথমে ওই চিকিৎসক তার পরিচয় দেয় তিনি রাশিয়ান ডিগ্রিধারী এমবিবিএস চিকিৎসক। তিনি নিজেই গর্ভবতীর আলট্রাসনোগ্রাম করেছেন, নিজেই সেই আলট্রাসনোগ্রামের এনএমসি দিয়েছেন।

নিজেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করিয়েছেন। এর একদিন পরেই প্রসূতি মা এবং নবজাতক উভয়ই মারা যায়। কুমিল্লার নামকরা একজন সিভিল সার্জন বিষয়টি তদন্ত করে জানতে পারলেন, কুমিল্লার ওই লোক চিকিৎসক নন। তিনি আইএ পাস একজন ব্যক্তি। রাশিয়ান ডিগ্রিধারী বলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক গর্ভবতীর সন্তান প্রসব করেছে। মা ও নবজাতকের মৃত্যুর পর থেকে ওই ব্যক্তিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। উত্তরবঙ্গেও এ ধরনের অনেক ক্লিনিকে অচিকিৎসক রয়েছেন, মেডিকেল অফিসার রয়েছেন যারা সার্জন না হয়েও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করায়।

তারা নিজেরাই আলট্রাসনোগ্রামের এনএমসি দেয়। যার জন্য মাতৃমৃত্যুর হার আমাদের দেশে কাক্সিক্ষত যে পর্যায়ে নামা দরকার ছিল সে পর্যায়ে নামেনি। এটা রোধ করতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর থেকে একটি উদ্যোগ নিয়েছি। প্রত্যেক উপজেলাতে স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, সব বিভাগের প্রধান, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে সেনসিডাইজ সভা করা হচ্ছে।

স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের কী কী সুবিধা, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোতে কী কী অসুবিধা, কখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো দরকার, সরকার কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে ইত্যাদি বিষয়গুলো ১৯০টি উপজেলায় সভার মাধ্যমে তুলে ধরে সচেতন করা হচ্ছে। এতে ফলও পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রশাসনিকভাবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে লেবার রুম থাকার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের জন্য যা যা প্রয়োজন সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া। তাহলেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবে মাতৃমৃত্যু হার এবং সন্তান প্রসবের হার কমানো সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×