ফিরতি পথেও চরম ভোগান্তি

জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও দুই বগির সংযোগস্থলে বসে এবং দাঁড়িয়ে শতশত মানুষ কর্মস্থলে ফিরছেন

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোগান্তি

ঈদের ছুটি শেষে আবারও পুরনো রূপে ফিরতে শুরু করেছে কর্মব্যস্ত নগরী ঢাকা। গত শুক্র ও শনিবার রাজধানী অভিমুখে যেন মানুষের ঢল নেমেছিল। তবে ফিরতি পথেও পদে পদে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে ঢাকামুখী লোকজনকে। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, রাস্তার বেহাল দশা আর ছোট ছোট দুর্ঘটনার কারণে সড়কপথে ছিল অসহনীয় ভোগান্তি। ট্রেনে সিডিউল বিপর্যয়, নৌপথেও ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা।

সড়কপথে দুর্ভোগ : ঈদের ছুটি শেষে রাজধানী ফেরার পথেও এবার সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মস্থলে ফেরা লোকজন। লোকজন বলছেন, এবারের ভোগান্তি বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মানুষজনের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। রংপুর থেকে শনিবার রাত ১০টায় নাবিল পরিবহনের বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন ফেরদৌস হাবিব স্বপ্নীল। সাধারণত রংপুরের রাতের বাস সকাল ৬টা বা ৭টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়ার কথা কিন্তু ফেরদৌস পৌঁছেছেন সকাল ১১টায়।

এদিকে গত শুক্রবার থেকে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের উভয় ঘাটে পারের অপেক্ষায় শতশত যানবাহন দেখা গেছে। ঢাকাগামী যানবাহনের বাড়তি চাপের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করছেন পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা।

পাটুরিয়া ফেরিঘাট কর্তৃপক্ষ জানান, ঈদের আগে-পরে তিন দিন রুটে পণ্যবাহী ট্রাক-লরি বন্ধ থাকায় বর্তমানে এর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্ভোগ লাঘবে যাত্রীবাহী বাস-কোচ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপার করায় টার্মিনাল এলাকায় পণ্যবাহী যানের জটলা সৃষ্টি হচ্ছে।

ট্রেনে উপচেপড়া ভিড় : ঈদের ছুটি শেষে ঢাকামুখী ট্রেনগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও দুই বগির সংযোগস্থলে বসে এবং দাঁড়িয়ে শতশত মানুষ কর্মস্থলে ফিরছেন। পরিবহন ক্ষমতার প্রায় তিনগুণ যাত্রী নিয়ে চলছে একেকটি ট্রেন। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় প্রবেশ করা প্রায় সব ট্রেনই কমলাপুরে এসেছে দেরি করে। ভোর থেকে সব ট্রেনই গড়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা দেরি করে এসেছে বলে গত রোববার জানিয়েছেন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক। তিনি বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী আর ট্রেনের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছতে পারছে না ট্রেন। প্রতিটি স্টেশনে যাত্রীদের ওঠার জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এছাড়া যেসব ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে সেই ট্রেনগুলো বিলম্বে ফিরে আসছে ঢাকায়।

শনিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছায় খুলনা থেকে ছেড়ে আসা সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি। এটি ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা ছিল। এছাড়াও শনিবার রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর এসে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু এটি বেলা ১১টায়ও এসে পৌঁছাতে পারেনি। রংপুর থেকে ছেড়ে আসা রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৬টা ৫ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা থাকলেও বিকাল সাড়ে ৩টাতেও ট্রেনটি পৌঁছাতে পারেনি। নীলফামারী থেকে ঢাকা আসা সৈয়দ ফরহাদ নামের এক যাত্রী বলেন, ঈদের সময় ঢাকা থেকে ট্রেনে বাড়ি যেতে যে ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল গ্রাম থেকে ঢাকা ফিরতেও তেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ফিরতি ট্রেনেও যাত্রীদের অধিক চাপ। গরমে হাঁসফাঁস করার মতো অবস্থা। ট্রেনের আসন সংখ্যার তুলনায় দাঁড়ানো যাত্রী বেশি থাকার ফলে দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। এসি বগিতে বাড়তি মানুষ উঠেছে।

ট্রেনের টিকিট কালোবাজারে : ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে মানুষজন। ফিরতি পথেও নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়াও টিকিট পেতে যাত্রীদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে। ট্রেনের কোনো অগ্রিম টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। বাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত অগ্রিম কোনো টিকিট নেই। যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের কোনো অগ্রিম টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যাপেও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, ট্রেনের বেশিরভাগ টিকিট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কালোবাজারে চলে গেছে। সবচেয়ে দুর্লভ ট্রেনের এসি টিকিট। ৬০০ টাকার ট্রেনের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে পনেরোশ’/দুই হাজার টাকায়।

উত্তরের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী নীলসাগর, দ্রুতযান, একতা ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে। সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য আলী আহসান নীলসাগর, দ্রুতযান, একতা ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের মধ্যে কোনো ট্রেনেরই কোনো শ্রেণির টিকিট পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ট্রেনের এসি টিকিট মিলছে। এগুলোর দাম ৯০০ টাকা হলেও কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা।

অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাটে ভিড়ছে লঞ্চ : ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরা প্রতিটি লঞ্চেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঈদফেরত যাত্রীদের কোলাহলে কর্মচঞ্চল পুরো এলাকা। নিরাপত্তার শঙ্কা থাকলেও লঞ্চের ছাদ পর্যন্ত অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চ বিভিন্ন স্থান থেকে ঘাটে ভিড়ছে। এমন যাত্রায় আছে জীবনের ঝুঁকি আবার আছে কর্মস্থলে ফেরার তাড়াও। ক্লান্তি আর ঘুম চোখে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দস্মৃতি নিয়ে ফিরছে ঈদে বাড়ি যাওয়া মানুষ।

শনিবার ও রোববার ভোরে সদরঘাট দিয়ে শতাধিক লঞ্চে প্রায় দুই লাখের মতো যাত্রী ঢাকায় এসেছেন বলে সূত্র জানায়। দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ২২টি জেলা থেকে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছে মানুষ। শনিবার বরিশাল থেকে ফেরা আফজাল যুগান্তরকে বলেন, ‘ফেরার পথে লঞ্চের টিকিট পাইনি। ফলে বাড়তি ভাড়া দিয়ে লঞ্চ ধরেছি। কারণ রোববার থেকে অফিস করতেই হবে। ঝুঁকি থাকলেও ঢাকায় ফিরতেই হবে।’

বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের যাত্রী আফসানা হক বলেন, শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে কাউখালী থেকে লঞ্চঘাটে এসে দেখি, সব লঞ্চের ডেক ভর্তি। পরে কেবিন বয়দের অনুরোধ করে করিডরে বিছানা পেতে জায়গা করে নিয়েছি। যে জায়গাটুকু পেয়েছি, এতে একজনের স্থলে পরিবারের চার সদস্যকে যেতে হবে।

সুরভি-৯ লঞ্চের কেবিনের যাত্রী শামিম হোসেন শিশির বলেন, লঞ্চের কেবিন হল সংরক্ষিত এলাকা। যাত্রীরা অতিরিক্ত পয়সা খরচ করে কেবিন নেয় একটু আরাম করে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অধিক মুনাফার লোভে যাত্রীসেবার কথা ভুলে কেবিনের চলাচলের পথেও যাত্রী বসাচ্ছে মালিকরা। ফলে একবার কেবিনে প্রবেশ করলে আর বের হওয়ার সুযোগ নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×