আনন্দযাত্রায় বিষাদের কালো ছায়া

ঈদের আগে ও পরে ১৩ দিনে ২৪৪ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৩ জন আহত ৯০৮

  সাইফুল ইসলাম খান ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কালো ছায়া

ঈদ মানে আনন্দ, পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর অবসর। জীবন ও জীবিকার তাগিদে যারা পরিবার ছেড়ে দূরে অবস্থান করেন তাদের জন্য ঈদ হাজির হয় ছুটির উপলক্ষ হিসেবে। সেই সুবাদে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উৎসব পালন ও নাড়ির টানে বাড়ি ছুটে যাওয়ার মাঝে কাজ করে শত আনন্দ-আগ্রহ।

ঈদের ছুটি শেষ হতেই ফিরতে হয় কর্মস্থলে। ঈদ উৎসবে এমনি করে যাওয়া-আসা কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে অনেক সময় উৎসবের সব আনন্দ ভেসে যায় বিষাদের নোনাজলে। প্রতি বছর ঈদ এলে মৃত্যু, আহত কিংবা পঙ্গুত্বের কালোছায়া নেমে আসে বহু মানুষের জীবনে। দুর্ঘটনায় কেবল যাত্রীরাই পড়ে তা নয়। এর শিকার হতে হয় মহাসড়কের এবং তার পাশের বিভিন্ন স্থাপনাসহ সাধারণ মানুষকে।

পবিত্র ঈদুল আজহায় ঈদের আগে ও পরে মোট ১৩ দিনে ২৪৪টি দুর্ঘটনায় ২৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন আর আহত হয়েছেন ৯০৮ জন। ১২ দিনের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধু সড়ক পথে ২০৩টি দুর্ঘটনায় ২২৪ নিহত ও ৮৬৬ জন আহত হয়েছেন। আর রেলে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ নিহত ও ১৫ জন আহত এবং নৌপথে ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৬ নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য ৪১টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক ১১টি অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি।

সংগঠনটির হিসাবমতে, দু’মাস আগে ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৩ দিনে সারা দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ২৫৬টি দুর্ঘটনায় ৮৬০ জন আহত হয়েছেন। আর ২৯৮ যাত্রীর জীবনে ওটাই ছিল শেষ ঈদ। আর গত বছর (২০১৮ সালে) ঈদুল আজহায় সড়ক পথে ২৩৯টি দুর্ঘটনায় ২৫৯ নিহত ও ৯৬০ জন আহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে ২১৪টি দুর্ঘটনায় ২৫৪ নিহত ও ৬৯৬ জন আহত এবং ২০১৬ সালে ১৯৩টি দুর্ঘটনায় ২৪৮ নিহত ও ১ হাজার ৫৫ জন আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে, চলতি বছর ঈদযাত্রা শুরুর দিন ৬ আগস্ট থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১২ দিনে ৩৭ চালক, তিনজন শ্রমিক, ৭০ নারী, ২২ শিশু, ৪২ ছাত্রছাত্রী, তিনজন সাংবাদিক, দু’জন চিকিৎসক, আটজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, তিনজন রাজনৈতিক নেতা, ৯০০ যাত্রী ও পথচারী সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে ১১টি, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে একটি, ট্রেন যানবাহন সংঘর্ষে একটি, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার একটি ঘটনায় ১৩ নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে নৌপথে ২৪টি ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় ১৬ নিহত, ৫৯ নিখোঁজ ও ২৭ জন আহত হয়েছেন।

সড়কে দুর্ঘটনার চিত্র

দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৬ আগস্ট ১৮টি দুর্ঘটনায় ২০ নিহত ও ৪১ জন আহত হয়েছেন। ৭ আগস্ট ১৫টি দুর্ঘটনায় ১৫ নিহত ও ৬৩ জন আহত হয়েছেন, ৮ আগস্ট ৭টি দুর্ঘটনায় সাত নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন, ৯ আগস্ট ২০টি দুর্ঘটনায় ১৯ নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন, ১০ আগস্ট ১৪টি দুর্ঘটনায় ১৪ নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন, ১১ আগস্ট ৭টি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন, ১২ আগস্ট ২০টি দুর্ঘটনায় ২৭ নিহত ও ৫২ জন আহত হয়েছেন, ১৩ আগস্ট ২৪টি দুর্ঘটনায় ২৬ নিহত ও ৭৬ জন আহত হয়েছেন, ১৪ আগস্ট ১৬টি দুর্ঘটনায় ১৫ নিহত ও ১১৬ জন আহত হয়েছেন, ১৫ আগস্ট ২১টি দুর্ঘটনায় ৩০ নিহত ও ২২১ জন আহত হয়েছেন, ১৬ আগস্ট ২২টি দুর্ঘটনায় ২৭ নিহত ও ১৩৪ আহত হয়েছেন এবং ১৭ আগস্ট ১৯টি দুর্ঘটনায় ১৮ নিহত ও ৭৭ জন আহত হয়েছেন। এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি নিহত ও আহত হয়েছেন বাসচাপা ও বাইক দুর্ঘটনায়। ঈদের ১২ দিনে ৬৭টি দুর্ঘটনায় ৭৭ নিহত এবং ৭৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ আগস্ট বাদে ৬ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন বাইক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

রেলপথে দুর্ঘটনার চিত্র

রেলে সারা দেশে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ নিহত ও ১৫ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ট্রেনে ধাক্কা বা কাটা পড়ে ১১টি দুর্ঘটনায় ১২ নিহত ও ১৫ আহত হয়েছেন এবং ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও একটি করে ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ও ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। আর অন্যান্য (বগি লাইনচ্যুত-ইঞ্জিন বিকল) কারণে আরও তিনটি দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। নৌপথে দুর্ঘটনার চিত্র

সারা দেশে ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৬ নিহত, ৫৯ নিখোঁজ এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। নৌকা-ট্রলার-লঞ্চ-জাহাজ-স্পিডবোট ডুবির ১৫টি দুর্ঘটনায় ১১ নিহত, ৫৯ নিখোঁজ ও ২২ জন আহত হয়েছেন। নৌকা-ট্রলার-লঞ্চ-জাহাজ-স্পিডবোট থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি; এতে তিনজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। লঞ্চ-নৌকা-ট্রলার-জাহাজ-স্পিডবোটের ধাক্কায় একজন নিহত। আর অন্যান্য (নৌদুর্ঘটনা-ডাকাতি-ট্রলার বিকল) তিনটি দুর্ঘটনায় একজন মারা গেছেন। দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ

সড়কপথে সংঘটিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে বাসে (মোট দুর্ঘটনার ২৭.৪ শতাংশ)। আর ছোট যানবাহন হলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে (২৬.৩৩ শতাংশ)। এর বাইরে ১৬.৪ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, লরি, ৭.৮২ শতাংশ কার-মাইক্রো, ১৩.৫২ শতাংশ অটোরিকশা, ৩.৫৫ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৪.৯৮ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক এবারের ঈদুল আজহার দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। অন্যদিকে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৫২.২১ শতাংশই পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার। এছাড়াও ২১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায় ও ৯.৮৫ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সুপারিশমালা

চালক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ইস্যু পদ্ধতি আধুনিকায়ন, যানবাহনের ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন, রাস্তায় ফুটপাত-আন্ডারপাস-ওভারপাস নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং অঙ্কন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও গবেষণা, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ সড়ক নিরাপত্তায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাসহ ১২টি সুপারিশ করেছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এবারের ঈদে বিগত বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা ৬.৪০ শতাংশ, নিহত ৬.২৫ শতাংশ ও আহত ১.৫০ শতাংশ কমেছে। এ বছর মোট সংঘটিত ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনার ৬৭টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে; যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ। যেখানে মোট নিহতের ৩৪.৩৭ শতাংশ এবং মোট আহতের ৮.৪২ শতাংশ। অন্যদিকে পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা ৫২.২১ শতাংশ ঘটেছে। আগামী ঈদে এ দুটি ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৮৫.২১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

এছাড়াও তিনি ঈদের আগে পড়েও সড়ক-মহাসড়কে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার রাখা, ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা, মহাসড়কে গতি নিরাপদ করা, ধীরগতি ও দ্রুত গতির যানের জন্য আলাদা আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং চালক-শ্রমিকদের যুগোপযোগী বেতন, বোনাস ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিরতি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×