নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের অভিবাসী নারী শ্রমিক

  রীতা ভৌমিক ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের অভিবাসী নারী শ্রমিক
বিদেশগামী নারী কর্মজীবিদের কয়েকজন

বিশ্ব শ্রমবাজারে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এই শ্রমবাজারে অংশ নেয়া এসব নারীর মধ্যে অনেকেই কম দক্ষতাসম্পন্ন হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই সুরক্ষা সমস্যায় পড়েন।

অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী অবলম্বন হিসেবে কাজ করতে পারে নারীর মানবাধিকার ও ক্ষমতায়নবিষয়ক সব কনভেনশন। নারী শ্রমিকরা যাতে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার না হন এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। লিখেছেন- রীতা ভৌমিক

বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা নিজের ভাগ্য বদলাতে চাকরি করতে বিদেশ যান। দেশের জন্য বয়ে আনেন বৈদেশিক মুদ্রা। আর অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে হয়েছেন নিঃস্ব। অনেকে যৌন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মস্থলে এভাবেই নানারকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজ করতে হয়।

এরপরও তারা শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি পান না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে সম-অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সিডও সনদ একটি অগ্রগণ্য দলিল হিসেবে কাজ করতে পারে।

১১.৫ ধারায় সনদে স্বাক্ষরকারী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নারী কর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু অনেক অভিবাসী নারী কর্মী বিদেশে চাকরিকালে এবং চাকরি শেষে দেশে ফিরে আসার পর শারীরিক, মানসিক এবং যৌন হয়রানির শিকার হন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অবারিত সুযোগের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ সুগম হয়েছে সত্যি কিন্তু আরেক দিকে নারীদের মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার মতো সংকটজনক অবস্থা তৈরি হচ্ছে। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের মানবাধিকার লংঘিত হওয়ার কারণে তারা জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য আর সহিংসতার শিকার হন।

যে দেশে অভিবাসী নারী শ্রমিকরা গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন তাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তারা এসব সমস্যায় পড়ছেন। এভাবে তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশ হিসেবে পৃথিবীতে বাংলাদেশের স্থান সপ্তম। অভিবাসী নারী শ্রমিকরা পুরুষ অভিবাসী শ্রমিকদের চেয়ে কম উপার্জন করলেও তারা তাদের আয়ের ৯০ শতাংশ টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পুরুষ শ্রমিকরা পাঠান ৫০ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী গৃহ শ্রমিকদের ধর্ষণ এবং তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের দ্রুত যথাযথ সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও পেশ করে।

অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব নমিতা হালদার বলেন, প্রবাসে নারী শ্রমিক হিসেবে পাঠানোর জন্য যাদের বাছাই করা হয় তাদের অনেকেই যোগ্য নন। এই বাছাই পর্বের দায়িত্বটা এখনও মন্ত্রণালয় নিতে পারেনি। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত হয়ে যখন তারা প্রশিক্ষণে আসেন তখন তারা মোটিভেটেড।

এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সমীক্ষা ধরনের সুপারিশ রাখা হয়েছে। বাছাইকৃত নারী শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি তারা বিয়ে, সন্তান, আসল বয়স এমন অনেক তথ্যই আড়াল করার চেষ্টা করেন। কার পরামর্শে তারা এটি করেন তা কোনোভাবেই প্রকাশ করেন না। সাক্ষাৎকারীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তিনি সৌদি আরবে যেতে চাইছেন, কার মাধ্যমে জানলেন সৌদি আরবের কথা, তখন তিনি সেটাও বলতে চান না। প্রচলিত পদ্ধতির ওপর বাধা দেয়া যায় না। তাই শ্রম অভিবাসন বন্ধ নয়, সবাই চায় নিরাপদ অভিবাসন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি এর মতে, অভিবাসী নারী শ্রমিকরা শুধু গৃহকর্মী হিসেবে নয় অন্য কাজেও যাবেন। এক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ইতিবাচক গল্পগুলোও তুলে ধরতে হবে। অভিবাসী নারী শ্রমিক কোনো সমস্যায় পড়লে টোল ফ্রি হেল্প লাইন ১০৯ নাম্বারে ফোন করতে পারেন।

একনজরে

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্র্রোগ্রামের এক তথ্যে জানা যায়, সৌদি আরবে অবস্থানকারী ১০০ বাংলাদেশি অভিবাসী নারী শ্রমিক শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত হয়ে দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। যৌন হয়রানি, দৈহিক হয়রানি, দৈহিক নির্যাতনের পাশাপাশি কখনও কখনও নিয়োগকর্তা এবং সহকর্মী পুরুষরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করে। নানা রকমের প্রবঞ্চনা, প্রতারণা তাদের বিদেশবাসকে অসহনীয় করে তোলে। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম জানান, অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদনের ভিত্তিতে লিখিতভাবে সৌদি আরবের রিয়াদের সেফহোম থেকে ২৪ নারী কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে ২৪ জনের তালিকাসহ চিঠি দেয়া হয়।

প্রবাসী কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬

‘প্রবাসী কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ (সুযোগের সমতা), ২০ (অধিকার ও কর্তব্যরূপে কর্ম) ও ৪০ (পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা) অনুচ্ছেদগুলোর আলোকে প্রণীত হয়েছে। সংবিধানের এই বিধানাবলী অনুযায়ী মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং যোগ্যতা অনুসারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ২.৪ নারী কর্মীদের শ্রম অভিবাসন এ ২.৪.৮ উল্লেখ রয়েছে- যেসব গন্তব্য দেশে বাংলাদেশি নারী অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা বেশি বিশেষত সেসব দেশের শ্রমকল্যাণ উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো হবে। এসব নারী কর্মকর্তার বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নারী অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, কাজের পরিবেশ পর্যবেক্ষণসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় আইনি, মনস্তাত্ত্বিক, স্বাস্থ্যগত ও আর্থিক বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। ২.৪.৯ উল্লেখ রয়েছে- নারীদের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র ও পেশার সম্প্রসারণ, দক্ষতার উন্নয়ন এবং অভিবাসী নারী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদানে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের আওতায় বিভিন্ন লিঙ্গ-সংবেদনশীল উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিদেশে কর্মরত বা প্রত্যাগত নারী কর্মীদের মধ্যে যারা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি ও অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন তাদের জন্য বিশেষ সহায়তামূলক কর্মসূচিসহ সেবা ও পরামর্শ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এর আওতায় পরিচালিত ৬৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট, সিরাজগঞ্জ, চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, মিরপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, রাঙ্গামাটি, খুলনা, বগুড়া, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, পাবনা, যশোর, জামালপুর, দিনাজপুর, সিলেট, নোয়াখালী, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী, বরিশাল, ঝিনাইদহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শেরপুর, ঝালকাঠি, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রাজবাড়ী, পিরোজপুর, কিশোরগঞ্জ, বরগুনা, গাইবান্ধা ইত্যাদি কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক এসোসিয়েশনের পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সি অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ত্রিশ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। আমরা তাদের তিন দিনের রিডার্পচার ওরিয়েন্টেশন দিয়ে থাকি। এই ওরিয়েন্টেশনগুলোর মাধ্যমে তাদের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট, ফিনানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট, রিএন্টিগেশন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এর মাধ্যমে তারা নিজস্ব দক্ষতা, পেশাগত দক্ষতা, ভিন্ন সংস্কৃতি, পরিবেশ, খাবার ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে আইন সালিশ কেন্দ্রের শিপা হাফিজ বলেন, ১১ নারী শ্রমিককে মধ্যপ্রাচ্য থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশি অভিবাসী নারী শ্রমিক বিনা খরচে যাওয়া-আসা ও সম্মানজনকভাবে কর্মক্ষেত্রে কাজ করবে এমনটাই হওয়ার কথা। এরপরেও কেনো তারা নির্যাতনের শিকার হন এবং বিনা বেতনে ফিরে আসেন এ প্রসঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সি আল ফালাহ ইন্টারন্যাশনালের তোফায়েল আহমেদ বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশি অভিবাসী নারী শ্রমিককে গৃহপরিচারিকার কাজে পাঠানো হয়। ওখানকার মালিকের ওপর তাদের বেতন ওঠানামা করে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি অভিবাসী নারী শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা জানার পর সেখানে নারী শ্রমিক পাঠানো কমে যাচ্ছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষাবিষয়ক জাতিসংঘের কমিটি

২০১৫ সালে জাতিসংঘ গৃহীত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় জাতীয় ও বৈশ্বিক উন্নয়নে অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক জাতিসংঘের কমিটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পেশকৃত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭-এর ৪ এপ্রিল অভিমত প্রকাশ করে, বাংলাদেশ সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ, অধিকার, নিরাপত্তা সুরক্ষায় আইন-নীতিমালা-বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নিয়োগদাতা এজেন্সিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের ভূমিকা বৃদ্ধি পাবে। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকদের ভূমিকার মূল্যায়ন হবে।

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.