কেসস্টাডি

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘটনা-১

বছর দুয়েক আগে নাটোরের নাছিমা বেগম রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ওমানে যান। সেখানে ৯ দিন থেকে তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হন। এ প্রসঙ্গে নাছিমা বেগম বলেন, আমাকে ওমানে নিয়ে যাওয়ার আগে বলা হয়, আমি যে পরিবারে কাজ করব সেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনজন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমাকে সাত পরিবারে কাজ করতে দেয়া হয়। এর পাশাপাশি আমাকে গরু দেখাশোনার দায়িত্বও দেয়া হয়। একজন মানুষের পক্ষে সাত পরিবারে কাজ ও গরু দেখাশোনা কোনোমতেই সম্ভব নয়। কাজ করতে করতে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনেক কষ্টে আমার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি ত্রিশ হাজার টাকা পাঠালে আমি দেশে ফিরে আসি।

এ প্রসঙ্গে ওমানের এক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অনেক ঘটনাই ওমানে ঘটেছে। নির্যাতনের শিকার কোনো গৃহকর্মী পালিয়ে এলে গৃহকর্তা তার বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দিয়ে মামলা করে। আমরা কোনো নির্যাতিতা গৃহকর্মীর নির্যাতনের সংবাদ পাওয়ামাত্র উদ্ধার করে আনলে সেখানেও সমস্যায় পড়তে হয়। এতসব ঝুঁকি নিয়েও যখন ওই গৃহকর্মীর মামলা পরিচালনা করা হয়। পরবর্তীতে ওই গৃহকর্মীই মামলায় সাক্ষ্য দেয় তিনি নির্যাতনের শিকার হননি। বেশিরভাগ গৃহকর্মীই মামলার সাক্ষ্যে এ ধরনের সাক্ষ্য দেয় লোকলজ্জার ভয়ে। সত্য ঘটনা আড়াল করায় আমাদের ওপর মিথ্যে মামলার দায়ভার এসে পড়ে।

ঘটনা-২

ঢাকার খিলগাঁও তালতলার একটি গার্মেন্টেসে কাজ করতেন শিল্পী। স্বামী-দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন তালতলা মার্কেটের বস্তিতে। মা পিঠা বিক্রেতা। তার মায়ের সঙ্গে রিয়াজবাগ বস্তির বাচ্চু নামে এক দালালের পরিচয় হয়। ওই দালাল তার মাকে বোঝায়, তোমার মেয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেক কষ্ট করে। মেয়েকে চাকরি দিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দাও। তোমার মেয়ে ভালো থাকবে।

বাচ্চু দালালের কথা শুনে সুখে থাকার স্বপ্ন দেখেন শিল্পীও। এ প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন, একজনের কাছ থিক্যা সুদে ৪০ হাজার টাকা ধার নিই। মা মাটির ব্যাংকে ২০ হাজার টাকা জমাইছিল। আর স্বামী ১০ হাজার টাকা ধার নিয়া দেয়। সব মিলাইয়া বাচ্চু দালালকে ৭০ হাজার টাকা দিই ২০০৯ সালে লেবাননে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্যে। সেখানে কক নামে গ্রামের এক গৃহস্থ পরিবারে আমারে কাজে লাগাইয়া দেয়া হয়। ধোয়া-মোছা, কাপড় ইস্ত্রি, পানির গাড়িতে পাইপ লাগাইয়া তিনতলায় ট্যাংক ভরা ইত্যাদি কাজগুলা করতাম। প্রতি মাসে বাংলাদেশের পনের হাজার টাকা দেয়ার কথা ছিল। দুই মাস নয় হাজার টাকা কইর‌্যা দেয়। এরপর বাকি নয় মাস বেতন বাবদ কোনো টাকা দেয়নি। অসুস্থ হইয়া যাই। হাসপাতালে ভর্তি করায়। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হইলে আবার ওই বাড়িতে ফিরা আসি। আমারে ওরা বাসন ধুইতে দেয়। ফোলা হাত নিয়া দ্রুত বাসন ধুইতে না পারায় আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আমি ওদের বলি, আমারে অফিসে দিয়া আসার জন্য। একথায় আমার ওপর ক্ষিপ্ত হইয়া মা-মেয়ে-বাবা পালাক্রমে মারে। চিৎকার করলে ওরা আমার মুখ চাইপ্যা ধরে। মানুষ জানাজানি না হয় এজন্য আমারে টাইন্যা হেঁচড়াইয়া বারান্দায় নিয়া গিয়া আটকাইয়া রাখে। সারাদিন কোনো খাবার দেয় না। সন্ধ্যায় আমারে খাবার দেয়। আমি ওই খাবার খাই না। ওখান থাইক্যা ওরা আমারে মেমসাহেব অর্থাৎ মামার বাপের বাড়িতে নিয়া যায়। উনার মা-ভায়ের বাসায়ও বাঙালি গৃহকর্মী ছিল। আমার ওপর নির্যাতনের কথা শুইন্যা ওরা আমারে দেশে ফিরা আসার পরামর্শ দেয়। ওই গৃহকর্মী আমারে জানায়, ওরা জানতে পারছে নয় মাসের বেতন না দিয়াই ওরা আমারে দেশে পাঠাইয়া দিব। ওদের মুখে এই কথা শুইন্যা আমি ভোরবেলায় ওই বাড়ি থিক্যা বের হইয়া ওখানকার একজন ড্রাইভারের সঙ্গে দেখা করি। তাকে সব কথা খুইল্যা বলি। তাকে বলি বাংলাদেশের দূতাবাস ভাইরোডে যাব। আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই। ড্রাইভার বয়স্ক মানুষ ছিলেন। তিনি আমারে কাঁদতে দেইখ্যা গাড়িতে তুইল্যা নিয়া ভাইরোড নামাইয়া দেয়। সেখানে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে দূতাবাসের অফিসে যাই। গিয়া দেখি কোনো বাঙালি নেই। লেবাননের লোকজন দেখতে পাই। তাদের পুরো ঘটনা খুইল্যা বলি। এও বলি আমি কক থিক্যা আসছি। ওরা সঙ্গে সঙ্গে আমার ছবি বাইর করে। আমারে জিজ্ঞাস করে ওইটা আমার ছবি কিনা? হ্যাঁ বলতেই ওরা ঠিকানা বাইর কইর‌্যা আমার গৃহকর্তা অর্থাৎ বাবারে ফোন করে। আমি ওদের অনেক অনুরোধ করি, ওই বাসায় আর কাজ করব না। গৃহকর্তা আমারে মারছে, বেতন দেয় না, তেল-সাবান দেয় না, খাবার দেয় না। ওরা বাড়ির বাইরে গেলে আমারে তালা দিয়া ঘরে রাইখ্যা যায়। কাজে ভুল হইলে মারধর করে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয় না। সবকিছু জাইনাও ওরা আমারে টাইন্যা হেঁচড়াইয়া গাড়িতে তুইল্যা ওই বাড়িতেই ফেরত পাঠায়। বাড়ি নিয়া আইস্যা আমারে কয় বাংলাদেশে পাঠাইয়া দিবো। এরপর আমারে দিয়া অনেক কাপড় ইস্ত্রি করায়। টিকিট কাইট্যা বিমান বন্দরে পৌঁছাইয়া দেয়। মামা কোনো কাগজপত্র দেয় না। টাকা-পয়সাও দেয় না। শূন্য হাতে ২০১০ সালে দেশে ফিরলাম। এরপর ওই দালালের মাধ্যমে দুই বছরের চুক্তিতে ৪০ হাজার টাকা দিয়া জর্ডান যাই। প্রতি মাসে বেতন বাংলাদেশি টাকার ১৫ হাজার পাইতাম। প্রতি মাস শেষে দেশে টাকা পাঠাইতাম। এখানে গৃহকর্তাকে টাকা জমানোর সুযোগ দেই নাই। সময় শেষ হইতেই দেশে ফিরা আসার কথা বলি। ওরা আমারে আরও ছয় মাস থাকতে কয়। ওইখানে আমি ওদের যমজ বাচ্চা দেখাশুনা করতাম। অনেক কষ্টে টাকার জন্য দু’বছর কাজ করছি। ওরা আমারে পেট ভইর‌্যা খাইতে দিত না। এরপর ওদের কথায় ছয় মাস থাকি। দেশে ফেরার আগে আমি ওদের কাছ থিক্যা দুই মাসের বেতন নিয়া কিছু কেনাকাটা করি আমার ছেলেমেয়েদের জন্যে। বাকি চার মাসের বেতন দিয়া স্বর্ণ কিনতে চাই। স্বর্ণ কেনার কথা বলায় ওরা আমাকে বলে সন্ত্রাসীরা আমার কাছ থিক্যা স্বর্ণ নিয়া যাইব। তার চাইয়া ভালো এই টাকা আমার ব্যাংকে পাঠাইয়া দিব বলে। বাংলাদেশে টাকা পৌঁছেছে কিনা আমাকে জানতে দেয় না। আমি ওদের কথা বিশ্বাস করছিলাম। বিমানবন্দরে পৌঁছাই। মাল মাপতে গিয়া দেখি বেশি হইছে। মাল বেশি হওয়ায় ওই বিমান আমারে নেয় না। গৃহকর্তারে ফোন করি। তিনি আমার ফোন ধরেন না। কোনো খাবার নাই। খিদায় জীবন যায় যায়। আমার কান্না দেইখ্যা ওই দেশি একজন বিমানবালা আগাইয়া আসেন। তাকে বলি, মামা দুই-তিন দিন ধইর‌্যা এইখানে। তিনি আমাকে গৃহকর্তার নাম জিজ্ঞেস করেন। তাকে গৃহকর্তার নাম বিল্লাল বলতেই তিনি গৃহকর্তাকে ফোন করেন। তিনি গৃহকর্তাকে শাসিয়ে বলেন, ‘আমি এই দেশের মেয়ে। আমি ফিরে এসে যেন শুনি তুমি এই মহিলার টিকিট কেটে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছ।’ তিনি আমাকে রুটি-পানি কিনে দিয়ে যান খাওয়ার জন্যে। পরের দিন গৃহকর্তা বিমানবন্দরে এসে আমার কাপড়-জামা, চকোলেট, বিস্কুট নিয়ে যায়। কোনো খাবার কিনে দেয় না। শুধু টিকিট দিয়ে যায়। তিন ঘণ্টা দুবাই ছিলাম। কোনো খাবার দেয় নাই প্লেনে। খিদায় তাদের কাছ থিক্যা চাইয়া খাবার খাইছি। দেশে ফির‌্যা ব্যাংকে খোঁজ নিয়া জানি তারা কোনো টাকা আমার একাউন্টে পাঠায় নাই। ছয় মাস চুক্তির পরে কাজ করলাম ওদের কথায়। কিন্তু ওরা আমারে ঠকাইছে। জিনিসপত্রও নিয়া গেছে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.