তৃতীয় পর্ব : চট্টগ্রাম: কক্সবাজার : সমস্যায় আটকে গেছে সম্ভাবনা

  শফিউল্লাহ শফি, কক্সবাজার প্রতিনিধি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমস্যা

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে যেমন সমস্যা রয়েছে ঠিক তেমনি প্রচুর সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু সমস্যার কাছে সম্ভাবনা আটকা পড়ে আছে যুগ যুগ ধরে।

মূলত সঠিক পরিচালনা ও মহতী উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত বিশ্বের দীর্ঘতম এ সমুদ্র সৈকতসহ এ অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলো। বিভিন্ন সময় পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু অধিকাংশ সিদ্ধান্তই আলোর মুখ দেখেনি। বছরের পর বছর পর্যটন এলাকাগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে। তবে সব সমস্যাকে পেছনে ফেলে পর্যটকসহ স্থানীয়দের চেপে ধরেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

চলাচলের রাস্তা : পর্যটন এলাকা হিসেবে কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কসহ বিভিন উপ-সড়কের বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক। পাশাপাশি পর্যটন স্পটগুলোতে নির্মিত ফাইভ স্টার মানের হোটেল-মোটেলেরগুলোর সামনে এমন কিছু রাস্তা রয়েছে যা দেখলে কখনও মনে হবে না এটি পর্যটন শহর কক্সবাজার।

পর্যটন এলাকার লাবণী ও সি-ইন পয়েন্টের মাঝামাঝি হোটেল স্রিগাল এর সামনের পর্যটন এলাকার প্রধান রাস্তাটির অবস্থা শ্রীহীন। বর্ষা এলে রাস্তাই খুঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়াও শহরের প্রধান সড়কসহ উপ-সড়ক খানা-খন্দরে পরিণত হয়েছে। কোনো অসুস্থ রোগী নিয়ে গাড়ি করে হাসপাতাল কিংবা গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ নেই। এলাকার রাস্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় পত্রিকায় সমালোচনা ও আলোচনার ঝড় চলছে। কিন্তু তার পরেও পরিবর্তনের কোনো আভাস নেই।

বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা : শহরের অলি গলিতে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো প্রায় চার শতাধিক হোটেল-মোটেল ও কটেজ গড়ে উঠলেও বেশিরভাগ হোটেলের নেই বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে ময়লা আর্বজনা রাস্তার ওপর এসে পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটায়। এমন কিছু টু-স্টার, থ্রি-স্টার মানের হোটেলের গলি আছে যা দিয়ে দুর্গন্ধে চলাচল করা যায় না। পর্যটন এলাকার এই বেহাল অবস্থার জন্য যেমন পৌরকর্তৃপক্ষ দায়ী ঠিক তেমনি দায় এড়াতে পারবে না হোটেল কর্তৃপক্ষও।

অপরিকল্পিত ভবন : যত্রতত্র বহুতল ভবন ওঠার কারণে পর্যটন শহরের প্রকৃতিক সৌন্দর্য বিলীন হওয়ার পথে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকলেও তাদের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিত ভবন হচ্ছে। পাশাপাশি শহরের হলিডে মোড় থেকে বাসটার্মিনাল পর্যন্ত প্রধান সড়কটির অবস্থা আরও বেহাল। এই প্রধান সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেওয়ারিশ লাশের মতো পড়ে রয়েছে।

রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালক কর্তৃক পর্যটক হয়রানি : পর্যটন শহর হিসেবে ভরা মৌসুমে কয়েক লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে এই শহরে। কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত আর্থিক ও শারীরিকভাবে রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকের হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। এছাড়া অনেক সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হয় পর্যটকদের।

আইনশৃঙ্খলা : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যটন শহর হিসেবে তুলনামূলক ভালো। তবে কিছু ছোটখাটো ছিনতাইয়ের ঘটনা রোধ করতে পর্যটন স্পট কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, পাথুরে বিচ ইনানি, পাহাড়ি ঝর্ণা হিমছড়ি, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা সাফারি পার্কসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে আরও বেশি নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজনসহ আগত দেশি-বিদেশি পর্যটক।

অবৈধ ঝুপড়ি ও দখল : জেলার সব পর্যটন স্পটগুলোর পাশেই অবৈধ স্থাপনা ও দখলবাজি সবসময় লেগেই থাকে। এক কথায় কক্সবাজার পর্যটন এলাকায় সর্বদা সরকারি জমি দখলের মহোৎসব চলে। এছাড়া ঝাউবাগানে এবং সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে যেমন ভাসমানদের ঝুপড়ি নির্মিত হয়েছে ঠিক তেমনি প্রভাবশালী কর্তৃক চলছে দেদার দখল। ঝুপড়ির কারণে পরিবেশের চরম বিপর্যয়সহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলীন হচ্ছে। বাড়ছে পতিতা ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ হরেক রকমের অপরাধ। তীরের সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি ছোট হয়ে আসছে পর্যটন স্পটের পরিমাণ।

হোটেল-মোটেল কর্তৃক রাজস্ব আদায় ফাঁকি : পর্যটন শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪শ’ হোটেল, মোটেল ও কটেজ রয়েছে। কিন্তু কতিপয় কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাসিক চাঁদাবাজি ও মাসোহারা আদায়ের কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এতে সংশ্লিষ্ট ধান্ধাবাজদের পকেট ভারি হলেও উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র রাজস্ব পাচ্ছে সরকার।

সমুদ্রে গোসল করতে নেমে পর্যটকের মৃত্যু : কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা লেগেই রয়েছে। বিগত ১২ বছরে সমুদ্রে গোসল করতে নেমে প্রায় ২৬৩ জন পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আলম জানান, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নতুন ৫টি বড় প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার পৌর এলাকায় ৮৭ কোটি টাকার কাজ শুরু হবে। কক্সবাজার পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সড়ক উপ-সড়কের দীর্ঘদিন নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শীঘ্রই এগুলো সংস্কার করা হবে।

কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে মিউনিসিপ্যাল গভার্নেন্স অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রজেক্ট (এমজিএসপি) প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার উন্নয়ন কাজগুলো বাস্তবায়নে ই-জিপি সিস্টেমে টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হবে। এদিকে সচেতন মহলের দাবি, পর্যটন শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে চিহ্নত করে সংশ্লিষ্ট মহল যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা বাস্তবায়ন করে তাহলে সরকার যেমন লাভবান হবে তেমনি কক্সবাজারবাসীরও নানা স্বপ্ন পূরণ হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×