বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজে বেপরোয়া ছাত্রলীগ

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুদ্ধি অভিযান

দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সগংঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শিক্ষা, শান্তি আর প্রগতির বার্তা নিয়ে ১৯৪৮ সালে পথচলা শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনটির।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরাচার পতনসহ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ।

অতীতে দেশের যে কোনো সংকটে প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়ার ইতিহাস আছে সংগঠনটির। কিন্তু বর্তমানের ছাত্রলীগ তাদের সেই সম্মান-গৌরব হারাতে বসেছে। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাস্তানি, সন্ত্রাসী, মাদকসহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজ ক্যাম্পাসগুলোও বেপরোয়া ছাত্রলীগ।

ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের নির্মম নির্যাতন আর খুনের ঘটনাও ঘটেছে একাধিক। সম্প্রতি দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির অভিযোগে ছেঁটে ফেলা হয় সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতা রেজওয়ানুল হক শোভন আর গোলাম রাব্বানীকে। সংগঠনটির একাধিক পুরনো নেতা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ আজ ছাত্রলীগের মধ্যে নেই ফলে তারা বেপরোয়া আচরণ করছেন। এদিকে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব আল নাহিয়ান খান জয় আর লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগে সন্ত্রাসীদের কোনো ঠাঁই নেই।

চলতি মাসের শুরুতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করা হয়। আবরার হত্যার পর বুয়েটসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। এরপরই মূলত বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্তৃক সাধারণ শিক্ষার্থী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসছে। হলগুলোতে গণরুম, গেস্টরুম কালচারসহ ভিন্নমত বা প্রতিপক্ষকে দমন করতে ব্যবহৃত বিভিন্ন টর্চার সেলের কথাও বলা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত। এর আগেও একাধিবার তিনি ছাত্রলীগকে সতর্ক করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের হলগুলোতে তল্লাশি চালানো হবে। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ছাত্রলীগে সন্ত্রাসবাদের জায়গা নেই। ধারণা করা হচ্ছে, যুবলীগের মতো ছাত্রলীগেও শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে পারে।

ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংগঠনগুলোর এমন বেপরোয়া রাজনীতি এবারই প্রথম নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখন যেই দল ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই দলের ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন সাত ছাত্রনেতা।

আলোচিত সেই সেভেন মার্ডারের ঘটনায় ফাঁসির আদেশও হয়েছিল ছাত্রলীগের তৎকালীন (বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক মরহুম শফিউল আলম প্রধানের। পরে ৭৫-পরবর্তী সরকারের সাধারণ ক্ষমায় ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা পান তিনি। এরপর থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিক্ষাঙ্গনে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭০ জনের অধিক শিক্ষার্থী। আর কত শিক্ষার্থী যে আহত আর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করাও কঠিন।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৯১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৬১ জন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৮২ জন। সর্বশেষ দশ বছরে নিহতের সংখ্যা ২০ জনের অধিক। এসব ঘটনায় প্রতিবারই আন্দোলন হয়েছে মামলা হয়েছে, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেছে অপরাধীরা।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে। অনেকক্ষেত্রে আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশ্লেষকরা বলছেন, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিই মূলত এসব হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ।

ক্যাম্পাসে সহিংসতার ব্যাপারে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মানুষ তার মত প্রকাশ করবে, এটি সংবিধানে বলা আছে। বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা সংবিধানের অঙ্গীকার। অথচ মত প্রকাশের কারণেই বুয়েটের একজন শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হল। এমন ছাত্ররাজনীতি কারও কাম্য হতে পারে না। আবরারকে হত্যা, বাংলাদেশে গভীর অন্ধকারের ইঙ্গিত। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×