মানবরূপী দানব : নৃশংসতা বাড়ছে

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ

সাম্প্রতিক সময়ে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারকে দীর্ঘসময় পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বাবা ও চাচার হাতে শিশু তুহিনের নির্মম হত্যার বিষয়টি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

শিশু তুহিন হত্যার কয়েকদিন আগে সাভারেও একইভাবে পিটিয়ে শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

ছেলেধরা সন্দেহে বাড্ডায় রেণু নামের এক মহিলাকেও নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে হত্যাই যদি মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে কেন এই নির্মমতা, কেন এই পাষণ্ডতা। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন- সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব আর বিচারহীন সংস্কৃতির কারণে বাড়ছে সহিংতা। মানবের মধ্যে আজ দানবের উদয় ঘটেছে; ফলে বাড়ছে নির্মমতা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইদানীং খুনি শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। ভিকটিমকে নির্মম যন্ত্রণা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারার পর বিভিন্ন অঙ্গহানি করছেন। ধর্ষণের পর খুনের ঘটনাগুলো আরও বিভৎস। কখনও কখনও ধর্ষিতার মুখমণ্ডল বা গোপনাঙ্গ বিকৃত করে দেয়া হচ্ছে। মানুষ নামের এই দানবদের নির্মমতা শিশুদের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে।

খুনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, মায়ের হাতে সন্তান, বাবার হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে বাবা-মা, প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা, প্রেমিকার হাতে প্রেমিক, চাচার হাতে ভাতিজা, ভাইয়ের হাতে ভাই অহরহ খুন হচ্ছেন।

শুধু তাই নয় খুনের পর লাশকে বিকৃত করার পাশপাশি লাশ উদ্ধার হচ্ছে, শয়নকক্ষে, বাড়ির পাশে ঝোপ-ঝাড়ে, নির্জন রাস্তায়, মাটিতে চাপা দেয়া, বস্তার ভেতর, কাদার ভেতর, পানির ট্যাংকে, ড্রেনে, ডাস্টবিন, খাল-ডোবা, নদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে। সহিংসতা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। জার্মানভিত্তিক বাংলা গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে এ বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩৩২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। আর গত বছর হত্যা করা হয়েছে ৫২১ শিশুকে। আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে শিশু হত্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

আসকের হিসাব অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩১২টি আর গত বছরের ১২ মাসে এ সহিংসতার সংখ্যা ছিল এক হাজার ১১টি। জরিপে দেখা যায়, পাঁচ থেকে ১২ বছরের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি হত্যা ও সহিংসতার শিকার। হত্যা ছাড়াও শিশুরা ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অ্যাসিড সন্ত্রাস ও অপহরণের শিকার হয়। এমনকি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেও। স্কুলে শিক্ষকের হাতে শিশু নির্যাতনের সংখ্যাও কম নয়। ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয় শিশু গৃহকর্মীরাও। এদিকে এসব হত্যা ও নির্যাতরে ঘটনায় মামলা হয় অর্ধেকেরও কম?

আসক বলছে চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩৩২টি শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১৫১টি। সম্প্রতি শিশু তুহিন হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান মনে করেন, সমাজে মূল্যবোধ ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রকাশ এই শিশু হত্যা? শিশুর প্রতি সহিংসতা মানে দুর্বলের প্রতি সহিংসতা। এটা বিবেচনা করলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়।

পুলিশের এক হিসাবে বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৭ হাজার। অপরাধ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে এক হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্যাতন সংক্রান্ত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১১টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ১১টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) গত আড়াই বছরে ৩৮ হাজার ১২৪ নারী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪২৮ জনই যৌন পীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতেই চিকিৎসা নিয়েছে তিন হাজার ৬০১ জন নারী ও শিশু। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ৪৯৬ জন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর। ২০১৮ সালে পুরো বছরে ৩৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল আর মারা যায় ২২ জন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) গত সাড়ে চার বছরের পরিসংখ্যান বলছে, শিশুহত্যা বাড়ছে। ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ২০৫টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে সে সংখ্যা ছিল ৪১৮, ২০১৭ সালে এ সংখ্যাটা ছিল ৩৩৯। চলতি বছর নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মানুষের এই সহিংসতার পেছনে বিষণ্ণতাও একটা নিয়ামক বিষয় বলে মনে করছেন মনোবিজ্ঞানীরা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছেন। আর বাংলাদেশে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ৭৪ লাখেরও বেশি। বিগত দশ বছরে বিশ্বব্যাপী এ রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। শুধু বিষণ্ণতার কারণে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, বিষণ্ণতা থেকেও মানুষ সহিংস হয়ে উঠতে পারে। একজন মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে তার মনটাকেও সুস্থ রাখতে হবে। মনের সমস্যায় অবশ্যই চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে।

খবরের কাগজ উল্টালেই চোখে পড়ছে খুনাখুনি, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মারামারি আর হানাহানির খবর। পারিবারিক খুনাখুনি বেশিরভাগের জন্য দায়ী পরকীয়া। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সামগ্রিকভাবে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মূল্যবোধ তথা মানুষগুলোর নৈতিক অবক্ষয়। পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাওয়া এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তারা। কেননা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এক পরিসংখ্যান মতে, ২০১৯ সালের প্রথম ৬ মাস অর্থাৎ ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫৫৭টি তালাকের আবেদন হলে একদিনে আবেদন হয়েছে ২৬টি তালাকের। অর্থাৎ প্রতি ৫৫ মিনিটে একটি সংসার ভাঙার আবেদন করছেন রাজধানীর মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, গত সাত বছরে তালাকের পরিমাণ বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।

পরিবার আমাদের সমাজব্যবস্থার অন্যতম মূলভিত্তি। এ সময়টায় বিভিন্ন কারণে পারিবারিক কলহের ঘটনা বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে পরিবারের এক সদস্যের হাতে আরেক সদস্যের খুন হওয়ার ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবাই একসঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। মানুষ এখন শুধু ঘরের বাইরেই নয়, তার আপনজনদের কাছেও নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্যানুযায়ী বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ সংঘটিত হচ্ছে পারিবারিক কলহের কারণে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অভাব-অনটন, অর্থের প্রতি প্রবল দুর্বলতা, চাওয়া পাওয়ার অসঙ্গতির কারণে দাম্পত্য কলহ ও স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসহীনতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, অন্য দেশের সংস্কৃতির আগ্রাসন, স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা, বিষণ্ণতা ও মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে সামাজিক অশান্তি বাড়ছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ জন। আর এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে।

মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল জানান, সমাজে কেউ অপরাধী হয়ে জন্ম নেন না। মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে। বেশিরভাগ সময়ে সে পরিবেশ তার কাছের মানুষরাই তৈরি করে দেয়। কখনও কখনও সমাজে মানুষের আচরণ ও অসহযোগিতার কারণে সমাজে দ্বন্দ্ব^ সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা বা মনোকষ্টে ভুগলে এসব হতে পারে। এ জন্য কাউন্সিলিং দরকার। প্রত্যেককে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।

সম্প্রতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ‘গ্যাং কালচার’। প্রথমদিকে এরা ইভটিজিং বা বখাটেপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কেনাবেচা, ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম যুগান্তরকে বলেন, যেসব কিশোর অপরাধে জড়াচ্ছে, সেসব কিশোরের পারিবারিক বন্ধন এবং পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ নেই। বাবা-মা সন্তানের খোঁজখবর রাখেন না। কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, ঠিকমতো স্কুল-কলেজে যাচ্ছে কিনা এসব খোঁজখবর বাবা-মায়ের রাখা উচিত। কেননা যারা বিভিন্ন গ্যাং সৃষ্টি করে তারা ঠিকমতো স্কুল-কলেজে যায় না। অভিভাবকরা সচেতন না হলে রাষ্ট্র বলেন, পুলিশ বলেন, কেউই কোনো কিছু করতে পারবে না।