আগে রুখতে হবে মাদক

  ড. মোহিত কামাল ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদক

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনা আমাদের মনে বেশ কষ্ট দিয়েছে। একজন মানুষ কীভাবে আরেকজনকে এত নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে।

কিছু আগে আমরা দেখেছি, রেণু নামের এক মেয়েকে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে কোনো বোধ-বিবেচনা না করে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করল, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারকেও নির্মমভাবে দীর্ঘসময় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, আমরা বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড দেখেছি, প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত হত্যাকাণ্ড দেখেছি।

এমন অসংখ্য ঘটনা চারপাশে দেখছি। সম্প্রতি তুহিন নামের এক শিশুকে মারার পর কান ছিড়ে ফেলা, গোপনাঙ্গ কেটে ফেলা এবং পেটের মধ্যে ছুরি ঢুকিয়ে মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছি। খুন করা অবশ্যই একটি অপরাধ। অবশ্যই প্রতিটি খুনের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু এ খুনের মধ্যে আমরা সাম্প্রতিক সময়ে নিষ্ঠুরতা দেখছি।

যে কোনো নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, ভয়াবহতা বা সহিংসতার পেছনে অনেক কারণ থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মানুষের মধ্যে যখন হতাশা সৃষ্টি হয়, এটি থেকে এগ্রেশন সৃষ্টি হয়। এটি যে কোনো কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কিছু আছে ব্যক্তিত্বের গড়ন। যারা মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় হন না। আমরা এদের সাইকোপ্যাথ বলতে পারি। এদের মধ্যে নিষ্ঠুরতা বা মানবিক জিনিসগুলো থাকে না। যখন তাদের রাগ উঠে তখন তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এ সময় তারা যে কাণ্ডগুলো ঘটায় সেটা ভয়াবহতায় রূপ নিতে পারে।

তবে বিভিন্ন কেসস্টাডিগুলো পর্যালোচনা করে আমরা যেটি সব চেয়ে বেশি পাচ্ছি, মানুষের এ হিংস্রতার পেছনে রয়েছে মাদকের প্রভাব। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা-মাকে হত্যা করা ঐশী থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে আমরা মাদকের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। মাদকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমরা হিংস্রতা দেখছি, নির্মমতা দেখছি। এ মাদকই মানুষকে মানব থেকে দানবে পরিণত করে। মাদক একটা রাসায়নিক দ্রব্য। সে যে পথেই আমার ব্রেনের মধ্যে ঢুকুক না কেন। সেখানে সেটি আরেকটি রাসায়নিক দ্রব্যের নিঃসরণ ঘটায়।

সেই রাসায়নিক দ্রব্য ব্রেনের সামনের অংশ অকেজো করে। অর্থাৎ ব্রেনের যেই অংশ বোধ-বিবেচনা, মূল্যবোধ-মানবিকতা জাগ্রত করে সেই অংশটিকে অকেজো করে। মাদকের কারণে বরং সেখানে তাৎক্ষণিক তাড়নার এগ্রেশন কাজ করে। এ এগ্রেশন ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আছাড় দিয়ে নিজের সন্তানকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। বর্তমানে আমার কাছে আসা অধিকাংশ ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক।

তিনি বলেন, আজকের প্রজন্ম অনলাইন গেমসে বুঁদ হয়ে থাকে বা পর্ণগ্রাফিতে যারা আসক্ত। অর্থাৎ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্রেন যদি অন্য কোনো জায়গা থেকে মজা পেতে থাকে। তাহলেও ব্রেনের বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ব বা মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়ার বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। ব্রেনের এই অংশগুলো কম কাজ করে। যারা এমন অনলাইন গেমস বা পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত তারাও নৃশংস-সহিংস কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে।

এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে এ মনোবিজ্ঞানী বলেন, এক নম্বরে মাদকের উৎপাদন, বিপণন বন্ধ করতে হবে। বর্ডার সিলগালা করতে হবে। ভারত বা মিয়ানমার থেকে কোনোভাবেই যেন মাদক বাংলার মাটিতে প্রবেশ না করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি ইয়াবা, ফেন্সিডিল এবং গাঁজার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাহলে এমন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মাদকের জন্য আজ ঘরে ঘরে হাহাকার। যে ঘরে মাদক আছে সে ঘরটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের ক্যারিয়ার, পরিবার, পড়াশোনা, চেহারা, মূল্যবোধ-মনুষ্যত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে মাদকের কারণে।

মাদকের ভয়াবহতা আমি চিকিৎসা নিতে আসা মায়েদের ভাষায় বলছি, ‘স্যার আমি আমার ছেলের চোখের দিকে তাকাতে পারি না। ওর চোখের চাহনি, চেহারার ভাবভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় ও আমার ছেলে নয়। মনে হয় আমার ছেলের দেহের মধ্যে কোনো দানব এসে ভর করেছে। এই দানব যে কোনো সময় আমাদের খুন করতে পারে। আপনি এ দানবের হাত থেকে আমার ছেলেকে মুক্ত করে দিন।’ কাজেই মাদক নামের দানবকে আগে রুখতে হবে আগে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×