গুজবের হাট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গুজব

বর্তমান সময়টাকে বলা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর হাতে হাতে স্মার্টফোন মানুষকে করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমমুখী। বিশ্বায়ন আর শিল্পায়নের এ যুগে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো।

এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ফেসবুকের নীল জগতে বুঁদ হয়ে থাকেন। মানুষের আবেগ-অনুভূতি, মতামত, বন্ধুত্ব সবকিছু এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। নানা সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্যেও এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ শক্তিকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা ধরনের গুজব। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফেসবুকে ছড়ানো গুজবে কান দিয়ে বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুকের ব্যবহার নিয়ে সচেতন হতে হবে এখনি।

পণ্ডশ্রম কবিতায় কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,/ চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।/ কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে, আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।/ ..... নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।... বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম। অর্থাৎ কান চিলে নিয়েছে এমন খবরে কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে ছুটেছিল একদল লোক। সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেই কান চিল নেয়ার ঘটনার মতো মানুষ কোনো কিছু বিবেচনা না করেই গুজবে কান দিয়েছে, গুজব নিউজ শেয়ার করেছে কখনওবা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সহিংস হয়েছে। গত এক বছরে গুজবের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। গুজব ছড়াচ্ছে কেন এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ফিল্টারিং ছাড়া তথ্য বা মতামত দেয়া হয়, যেটা অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গুজবের ছড়াছড়ি

ফেসবুকের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এখন জনপ্রিয় এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমথেকে ছড়ানো হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ আর বিভিন্ন গুজব। এখন পর্যন্ত দেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে যতগুলো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সব কিছুর মূলে এ ফেসবুককেন্দ্রিক গুজব সংবাদ। সর্বশেষ ভোলার বোরহানুদ্দিনে ফেসবুক মেসেজকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। গুজবের আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে চিত্রনায়িকা মৌসুমীর জয়লাভের গুজব। ২৫ অক্টোবর দিবাগত মধ্য রাতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে সভাপতি পদে জয় লাভ করেন ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় খলনায়ক মিশা সওদাগর। কিন্তু সেদিন নির্বাচনের পর ফলাফল ঘোষণার আগেই ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয় নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন মৌসুমী। কিন্তু এটা মূলত গুজব।

গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের আবাসিক হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারধরে বিশ্ববিদ্যালয়টির মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার নিহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পরই আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চলছে। ইতোমধ্যে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে ফেসবুকে যে ছবিটি প্রচার করা হয়েছে সেটি আবরারের নয়।

চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে বা ছেলেধরা বেরিয়েছে এমন গুজব সারা দেশেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়। একদল লোক প্রকৃত ঘটনা যাচাই-বাছাই না করেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সন্দেহভাজনদের পিটুনি দিয়েছেন। ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ গুজবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। ছেলেধরা গুজবে মানুষের গণপিটুনিতে প্রাণ হারান অন্তত ২০ জন।

এর আগে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপের সময় গুজব ছড়ানো হয়েছিল, একযোগে বেসিনে ৫০০ এমএল হারপিক ফেললে মশা দমন করা যাবে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটি শক্ত হাতে দমন করে। ২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে টানা সাত দিনব্যাপী সড়কে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে আন্দোলন ঘিরে নানা ধরনের গুজবও ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন পোস্টে গুজব ছড়ানো হয়, শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও ছাত্রী ধর্ষণের। পরে পুলিশ অভিযুক্ত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ফেসবুকের গুজবের সূত্র ধরে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। এর আগে ২০১২ সালের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করায় রামু উপজেলার বৌদ্ধ বসতি এলাকায় চালানো হয় তাণ্ডব। এ সময় ১২টি বৌদ্ধমন্দির এবং বৌদ্ধদের ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল। শতাধিক ঘরবাড়ি এবং দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট চালায় সুযোগ সন্ধানীরা। এ ছাড়া কুমিল্লার হোমনা, পাবনার সাঁথিয়া, সাতক্ষীরার ফতেহপুরে এমন গুজব থেকেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে।

ফেসবুক ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় মেডিকেলসহ বিভিন্ন পাবলিক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, এসএসসি, এইচএসসি এমনকি জেডিসি বা জেএসসি পরীক্ষারও প্রশ্নফাঁস কিংবা গুজব ছড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র।

দুর্বল সিকিউরিটি সিস্টেম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইট হল ফেসবুক; কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীরাই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা সঙ্কটে আছেন। সামান্য কারণে যখন-তখন আইডি ডিজেবল, হ্যাকড, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া এখন স্বাভাবিক বিষয়। সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হল, এর জন্য দায়ী মূলত ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। ব্যবহারকারীরা কোনো সমস্যায় পড়লে সমাধানের জন্য সরাসরি যোগাযোগ করার মতো কোনো কাস্টমার কেয়ার সুবিধা নেই। বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোবটের মাধ্যমে রিপ্লাই দেয়া হয়। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক সমাধান পাওয়া যায় না; কারণ রোবটের সীমাবদ্ধতা আছে, প্রোগ্রামে যা আছে তার বাইরে কিছু করার ক্ষমতা নেই। এতে অনেকে আইডি ফেরতের জন্য বারবার আপিল করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ইদানীং ফেসবুকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, আইডি ডিজেবল হয়ে যাওয়া। ফেক আইডি, ফেক নাম, ভুল তথ্যের কারণে তো ডিজেবল হয়ই; কিন্তু এখন যে কেউ গ্রুপিং করে রিপোর্ট করে যে কারও আইডি ডিজেবল করে দিতে পারে। কয়েকজন মিলে যদি কোনো আইডিতে প্রিটেন্ডিং রিপোর্ট করে, ফেসবুক সেটা যাচাই না করেই ডিজেবল করে দেয়; এমনকি সেটি ১০ বছর ধরে চালানো রিয়েল আইডি হলেও।

আরেকটি ভয়ংকর সমস্যা হল হ্যাকিং। গ্রুপ, পেজ, আইডি সবই হ্যাক হচ্ছে। ইদানীং অনেকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক বেশি হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ আইডি হ্যাক করে অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুকীয় বিভিন্ন সমস্যার মূলে আছে সিকিউরিটি সমস্যা এবং পর্যাপ্ত হিউম্যান হেল্প না থাকা। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে ফেসবুকের অফিস নেই। যেখানে আছে, সেখানেও সবার প্রবেশাধিকার নেই; কারণ তারা বলে, এসব সমস্যা তারা অফলাইনে নয়, অনলাইনেই সমাধান করে। অথচ সারা বিশ্বেই বহু মানুষ ফেসবুকের এমন বাজে পদ্ধতির কারণে ভুক্তভোগী।

যাচাই-বাছাই না করে শেয়ার নয়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আলীমুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুযোগ সন্ধানীরা ওঁৎ পেতে আছে। আমাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এসব অপরাধীর ব্যাপারে সচেষ্ট আছে। তারপরও আমরা যারা ফেসবুক ব্যবহার করি আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। চোখের সামনে কোনোকিছু একটা পড়ল আর অমনি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করে দিলাম এমনটা করা যাবে না। বিভ্রান্তি বা দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো পোস্ট নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করার আগে অবশ্যই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নিতে হবে। সর্বশেষ ভোলায় ফেসবুক মেসেজকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে এমন গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইদানীং ফেসবুক প্রোফাইল হ্যাকের ঘটনাও ঘটছে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে কিন্তু ওই ব্যক্তি ভয়াবহ রকমের বিপদে পড়তে পারেন। তাই ফেসবুক ব্যবহারের পাশাপাশি নিজের অ্যাকাউন্টেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ইদানীং ফেসবুক প্রোফাইল হ্যাক করে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও আপলোড, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো এমনকি নিকটস্থ বন্ধু বা আত্মীয়ের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। তাই আমরা সবসময় বলে থাকি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে অতিদ্রুত নিকটস্থ থানায় গিয়ে অন্তত একটা সাধারণ ডায়েরি করুন। এরপর পুলিশের সহায়তা নিয়ে বা নিজ উদ্যোগে আপনার অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করুন। মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়ালে কেমন শাস্তির বিধান রয়েছে এমন প্রশ্নে আলীমুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়ানোর বিষয়টি প্রমাণ হলে তিন বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা অনেকেই ফেসবুককে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমরা বলি, ফেসবুকের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্ক, বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্মল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেকের মেইল, ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমের আইডি গুরুত্বপূর্ণ। মেইলের পাসওয়ার্ড বা অন্য জিনিসগুলো কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না, টু-ফ্যাক্টর সিকিউরিটি চালু করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×