জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: বিরাজমান অস্থিরতায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে চলছে শিক্ষার্থী শিক্ষকদের আন্দোলন

  প্রতিমঞ্চ প্রতিবেদক ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভবিষ্যৎ

হলে প্রবেশের প্রধান গেটের তালায় সিলগালা। রাতে হলগুলোয় অদ্ভুত অন্ধকার। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে খাবারের দোকান তো দূরের কথা বন্ধ রয়েছে ভ্রাম্যমাণ মুড়ির দোকানও। সীমিত সংখ্যক রিকশা তাও আবার যাত্রীর জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় চালক।

হাহাকার একাডেমিক ভবনে। ভেতরে যানবাহন প্রবেশে কড়াকড়ি। বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। যেন ক্যাম্পাসে অলিখিভাবে পালিত হচ্ছে ১৪৪ ধারা। দীর্ঘ অর্ধশত বছরের পথচলায় এমন নীরব চাহনি আর কখনও দেখেনি জাহাঙ্গীরনগর। প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রত্যক্ষ করল ঐতিহাসিক স্থবরিতা। আর এমন পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত এখানকার ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন।

গত এক দশকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে চারবার। সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের আমলে দুবার। আর বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের আমলে দুবার। জন্মলগ্ন গত ৪৮ বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি হিসেবে বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ১৮ জন। এর মধ্যে পাঁচজন ছিলেন স্বল্পমেয়াদের ভারপ্রাপ্ত। ১৯৯৩-২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন ১২ জন ভিসি। এর মধ্যে পূর্ণ দায়িত্ব শেষ করতে পেরেছেন মাত্র দুজন। বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামকে নিয়েও শুরু হয়েছে আন্দোলন।

গত এক দশকে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চার মেয়াদে তিনজন। এর মধ্যে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির (২০০৯-১২) এবং অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন (২০১২-১৪) এই দুই উপাচার্যের পতনের সময় ক্যাম্পাসে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীল ও অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। সর্বশেষ ২০১৪ সালের দেশের প্রথম নারী ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম দক্ষতার সঙ্গে স্থিতিশীল পরিবেশে ২০১৮ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছেন। কিন্তু ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিয়ে টানাপড়নে কাটছে তার প্রশাসনিক কার্যক্রম। বিভাজিত হয় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’। এ সংগঠনিটি বামপন্থী, বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ভিসি অপসারণের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে।

গত এক দশকের মধ্যে সাবেক ভিসি অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের আমলে দুবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আবদুল মালেক নামের এক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে মারা যান। সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসায় ও মেডিকেলে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেন ভিসি। এমনকি আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরও তিনি জামায়াত-শিবির বলে আখ্যা দেন। এসব ঘটনায় উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষক সমিতি। দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী আন্দোলনে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, ক্লাস বর্জন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবন অবরোধ, সিনেট-সিন্ডিকেট ও অন্যান্য প্রশাসনিক সভা প্রতিরোধসহ নানা কর্মসূচিতে ভেঙে পড়ে শিক্ষা কার্যক্রম। এর আগে উপচার্য শরীফ এনামুল কবির (২০০৯-১২) নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরির জন্য গণহারে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও ছাত্ররাজনীতিতে হস্তক্ষেপসহ নানা অভিযোগে ক্যাম্পাসে আন্দোলন গড়ে ওঠে ভিসির বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে আরেক কর্মী জোবায়ের নিহত হন। এসব অভিযোগের দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ভিসি।

সর্বশেষ এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে মেগা প্রকল্পের মাস্টারপ্লান অপূর্ণাঙ্গ আখ্যা দিয়ে ‘প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনে অংশ নেয় আওয়ামীপন্থী, বিএনপি ও বামপন্থী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রায় দুই মাস ধরে এই আন্দোলন চলে। আগস্টের শুরুর দিকে ভিসি ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দিয়েছে এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর কদিন পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও শাখা ছাত্রলীগের ফোনালাপ ও শাখা ছাত্রলীগের তিন নেতার স্বীকারোক্তিতে ‘ঈদ সেলামি’ কাণ্ড বেরিয়ে আসে। এরপর আগস্টের শেষের দিকে এ ‘ঈদ সেলামি’ কাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি ওঠে। সর্বশেষ অক্টোবরে ‘উপাচার্যের অপসারণ’-এর আন্দোলন শুরু হয়। এ দাবিতে দীর্ঘ দুই মাস আন্দোলন চলে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে। সর্বশেষ দীর্ঘ ১১ দিন উপাচার্যের অফিস অবরুদ্ধ রাখে আন্দোলনকারীরা। ৫ নভেম্বর রাতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের অফিস ছেড়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। পরে দিন মঙ্গলবার শাখা ছাত্রলীগের একটি পক্ষ আন্দোলনরত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে শিক্ষক, ছাত্রী, চার সাংবাদিকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়।

এ ঘটনার পর দীর্ঘ ১১ দিন পর কার্যালয়ে এসে ভিসি অধ্যাপক ফারজানার নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের জরুরি এক সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা ও হল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরের দিন বুধবার বিকালের মধ্যে সবাইকে হল ছাড়ার কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়। একই দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু ছাত্রলীগের হামলা, হল বন্ধের প্রতিবাদ ও ভিসির অপসারণ দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ভিসি অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। এছাড়া ৮ নভেম্বর রাতে শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছে ভিসির দুর্নীতির নথি সংবলিত একটি অভিযোগপত্র জামা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের কোনো হলে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। যারা টিউশনি করে তারা পড়েছেন ব্যাপক চিন্তায়। বিশেষ করে গরিব শিক্ষার্থীদের মাথায় হাত অবস্থা। তা ছাড়া ক্যাম্পাস কবে খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে দীর্ঘ সেশনজটে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। কবে হল খুলবে সে সম্পর্কে প্রশাসনের কেউ কিছু বলতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. ফারজানা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বা দুই পার্সেন্ট শিক্ষক বা শিক্ষার্থী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এরা কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। হঠাৎ কতগুলো মানুষ জড়ো হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে নানাভাবে অস্থির করে তুলেছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×