চাকরির বাজারে কোটা পদ্ধতির বেড়াজাল

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ০৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরির বাজারে কোটা পদ্ধতির বেড়াজাল

দিন দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন যুবকের লেখাপড়া শেষ করতে লেগে যায় ২৬ থেকে ২৭ বছর। এরপর প্রস্তুতি নিয়ে চাকরিতে প্রবেশের জন্য সময় থাকে তিন থেকে চার বছর। মেধাবীদের সামনে যেমন বয়সের দেয়াল ঠিক তেমনি আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হল চাকরিতে কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন।

হিসাব করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকে কোটা সুবিধাভোগীদের জন্য আর বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য লড়াই করে লাখ লাখ মেধাবী। অনেক সময় যোগ্য লোকের অভাবে কোটার সেই ৫৬ শতাংশ আসনের বেশি কিছু খালি থেকে যায়। তারপরও সাধারণদের সুযোগ হয় না সেই পদে নিয়োগ পাওয়ার। সম্প্রতি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছেন।

পাল্টাপাল্টি আন্দোলন

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও সমাবেশ করেছে দুই পক্ষ। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন সমাবেশ করছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে চলমান এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কারণে বিষয়টি সবার নজরে এসেছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে দাবি করে পাল্টা কর্মসূচি পালন করছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটি।

বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতি চালুর মূল উদ্দেশ্য, দেশের অনগ্রসর ও স্বল্প সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীকে তুলনামূলক একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অগ্রসর গোষ্ঠীতে পরিণত করা। যাতে করে দেশে কোনো রকম বৈষম্যের সৃষ্টি না হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, যে পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতি চালু হয়েছিল বর্তমানে আর সেই পরিস্থিতি নেই। আগের মতো এখন পর্যন্ত যে কোটা পদ্ধতি চালু আছে তা নিতান্তই অমূলক। বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সবার আগে মেধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর মেধাকে অগ্রাধিকার দিতে হলে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

কোটা বাতিল নয়, চাই সংস্কার

কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবি কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান আল মামুন বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে মেধার চেয়ে কোটার সংখ্যা বেশি নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ৫৬ শতাংশ কোটা আর ৪৪ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ হয়। শুধু তাই নয়, কোটা পদ্ধতির অনেকে আবার মেধা কোটাতেও ঢুকে পড়ছেন। আমাদের দাবি কোটা বাতিল নয় বরং সংস্কারের। আমরা চাই কোটা পদ্ধতি একটা কাঠামোগত রূপ নিক। একজন শিক্ষার্থী লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার পরও চাকরিতে যোগ দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে কোটা পদ্ধতির কারণে নির্দিষ্ট কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় পদগুলো শূন্যই থেকে যাচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের সম্পদ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি মেধাও নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই,পদগুলো খালি না রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া হোক। আমরা কোটার বিরোধিতা করছি না, যৌক্তিক সংস্কার চাইছি।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সমন্বয়কারী মো. রাশেদ খান বলেন, কোটার কারণে আজ প্রকৃত মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছেন না, মেধাবীরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে সঠিক কর্মস্থল পাচ্ছে না। অন্যদিকে, কোটাধারীদের কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। মেধাবী নয় অথচ কোটা থাকার কারণে বাড়তি সুযোগ পাচ্ছেন এই কোটাধারীরা। এটা রীতিমত অন্যায়।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারুক হাসান বলেন, আমাদের এই আন্দোলন কোটার বিরুদ্ধে নয়, এটা কোটা সংস্কারের আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার অন্তরায়। আমরা চাই কোটা সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া হোক।

মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ শতাংশ কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, কোটার বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীর ব্যানারে একটি অসাধু চক্র অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার নিয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে। কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা ‘কোটা বাতিল না করলে নৌকায় ভোট দেব না, যার যা আছে তা নিয়ে কোটার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুনসহ উসকানিমূলক মন্তব্য ও কোটার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার করছে। তবে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে পুরোপুরি বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ। মোট জনসংখ্যার হিসাবে শতাংশের দিক থেকে এ হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। মোট বেকারের মধ্যে মহিলা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পুরুষ মাত্র ৩ শতাংশ বেকার।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী দেশে ১৫ বছরের ওপরে কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে ১০ কোটি ৬১ লাখ। এর মধ্যে শ্রমশক্তি রয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ। কর্মে যুক্ত আছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ। আর শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ। বেকারের মধ্যে শিক্ষিত আর ও নারী বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে কমছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মে যুক্ত হওয়ার হার। এছাড়া টাকা ছাড়াই পরিবারে নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি শ্রম দিচ্ছেন।

বিবিএসের হিসাবে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ৯ শতাংশ। এর মানে হল স্নাতক কিংবা এর বেশি ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনের ৯ জন বেকার। এ দেশে পড়াশোনা না করলেই কাজ পাওয়ার সুযোগ বেশি। কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাননি, এমন মানুষের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ বেকার। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি বেকার। ২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের হিসাবে, দেশে তখন বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই হিসাবের সঙ্গে একমত নন দেশের অধিকাংশ মানুষ। ২০১৭ সালে হিসাবটি প্রকাশের পর সেই বছরের ২৮ জুন অর্থবিল পাসের আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, দেশে ২৬ লাখ বেকার আছে বলে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে এটা সঠিক নয়। এটা ভুয়া। শুধু ঢাকা শহরেই বেকারের সংখ্যা হবে ২৬ লাখ।

বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ বলেন, প্রতিবছর লেখাপড়া শেষ করে ২৪-২৫ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এরা সবাই চাকরি পায় না। তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। এর মধ্যে ১০ কোটি মানুষ রয়েছে কর্মক্ষম। তার ভেতর পাঁচ কোটি মানুষ কাজ পেয়েছে। বাকি পাঁচ কোটি মানুষ কর্মহীন।

কোটা পদ্ধতি ‘উদ্ভট’

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বেলায় কোটা পদ্ধতিকে ‘উদ্ভট’ আখ্যায়িত করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান। একই সঙ্গে তিনি কোটা পদ্ধতি তুলে দেয়ার আহ্বান করেছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে এক সেমিনারে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্যাডার নিয়োগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কোটা সিস্টেম। এর কারণে মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছেন না। কোটাকে অনেকে খারাপ, ভালো নয়, বাদ দেয়া উচিত- এরকম বললেও তার চাইতে বেশি কিছু বলেন না।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ২৫৭টি কোটা রয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন উদ্ভট সিস্টেম নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে কোটা চালু হয়েছে দরিদ্রদের ওপরে তুলে নিয়ে আসার জন্য, কাউকে পুরস্কৃত করার জন্য নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা সিস্টেম চালু হয়েছিল কারণ তাদের অবস্থা তখন খারাপ ছিল। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধার নামে যে কোটা দেয়া হয় তা নিতান্তই অমূলক।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের বিষয়ে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক যুগান্তরকে বলেন, সরকারের উচিত হবে স্থির ও মুক্তমন নিয়ে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শোনা। কোটা সংস্কারের অবকাশ আছে কিনা সেটি দেখার পাশাপাশি চাকরিতে কোটার অপব্যবহার হচ্ছে কিনা সেটি দেখতে হবে। তিনি জেলা কোটা উঠিয়ে দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, মেধার চেয়ে কোটার হার কখনও বেশি হতে পারে না। কোটা পদ্ধতির সংস্কার করে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মেধাকে কমপক্ষে পঞ্চাশ ভাগের ওপরে রাখতে হবে। তা হলেই হয়তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

হাইকোর্টে রিট খারিজ

সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা সংরক্ষণ বাতিল চেয়ে গত ৩১ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান মীর, বাসসের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক দিদারুল আলম ও দৈনিক আমাদের অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক আবদুল ওদুদের পক্ষে রিটটি দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এখলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর এক নির্বাহী আদেশে সরকারি-বেসরকারি, প্রতিরক্ষা, আধা-সরকারি এবং জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যা ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত মহিলাদের জন্য কোটা প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে এ কোটা পদ্ধতি সংস্কার ও পরিবর্তন করে বিভিন্ন পর্যায়ে কোটা পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর কোটা পদ্ধতি চালুর সেই নির্বাহী আদেশ কেন আইনবিরুদ্ধে ঘোষণা করা হবে না, কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না এবং কোটা পদ্ধতি বাতিল ও পুনর্মূল্যায়নে কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না-এ মর্মে রুল চাওয়া হয়েছে রিটে।

আইনজীবী এখলাছ উদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় পিএসসির উদ্যোগে ২০০৮ সালে কোটা পদ্ধতি নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। সে সমীক্ষা কমিটির দুই সদস্য ড. আকবর আলী খান ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দিন আহাম্মেদের প্রতিবেদন আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে কোটা পদ্ধতিকে অসাংবিধানিক ও ন্যায় পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে ৫ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু যখন কোটা পদ্ধতি চালু করেছিলেন তখন দেশে ১৭টি জেলা ছিল, এখন জেলা ৬৪টি। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, জনসংখ্যা ও শিক্ষিতের হার বিবেচনায় কোটা পদ্ধতি বৈষম্যমূলক এবং একই সঙ্গে অসাংবিধানিক। তবে সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী গতকাল সোমবার হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দিয়েছেন। বিচারপতি সৈয়দ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

কোটার যত জটিলতা

কোটার কারণে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন মেধাবীরা। প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে মোট ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী। ৩৮তম বিসিএসে পরীক্ষার্থী ছিল সাড়ে তিন লাখ।

নিয়োগ পরীক্ষায় কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তা হলে তিনি চাকরি নাও পেতে পারেন। কেননা প্রচলিত ব্যবস্থায় ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ ৭০০০তম হয়েও পেয়ে যেতে পারেন চাকরি নামের সোনার হরিণটি।

কলামিস্ট শরিফুল ইসলাম তার এক লেখায় বলেছেন- বিসিএস ছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষায় এমন বৈষম্য দেখা যাচ্ছে, গত বছর ৯ হাজার ৬০৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ করা হয়। এসব পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮২টি পদ মুক্তিযোদ্ধার কোটাভুক্ত ছিল। কিন্তু এর জন্য প্রার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১০১ জন। শুধু পিএসসি বা সরকারি চাকরি নয়, কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার পদ শূন্য থাকছে। অথচ লাখ লাখ ছেলেমেয়ে চাকরি পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ১৬ কোটি জনগণের দেশে মাত্র ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা কতটা যৌক্তিক। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন উদাহরণ আছে কি, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা এই ধরনের সুযোগ সুবিধা নিয়ে থাকেন? সবচেয়ে বড় সংকট কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে ওই পদগুলো শূন্য রাখা হয়। ফলে একদিকে যেমন মেধাবীরা নিয়োগ পান না অন্যদিকে হাজার হাজার পদ শূন্য থাকে। বিগত কয়েকটি বিসিএসের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া যাওয়ায় ২৮ থেকে ৩৫তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে পাঁচ হাজার পদ খালি থেকে গেছে।

চাকরির বেলায় বয়সের দেয়াল

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩৫ করার দাবিতেও রাজধানীসহ সারাদেশে আন্দোলন করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদের সভাপতি মো. ইমতিয়াজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বয়সের সীমানা প্রাচীর অবরুদ্ধ করে রেখেছে বাংলাদেশের লাখ-কোটি তরুণকে। গড় আয়ু যখন ৪৫ ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়সছিল ২৭ বছর। যখন ৫০ ছাড়াল তখন প্রবেশের বয়স ৩০ করা হল। বর্তমানে গড় আয়ু ৭১ হলে চাকরিতে প্রবেশের বয়স এখন কত হওয়া উচিত? ২২ লাখ চাকরিজীবীদের বেতন তুলনামূলক হারে বাড়িয়ে পাশাপাশি ২২ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে এবং অবসরের বয়স ২ বছর না বাড়িয়ে সুযোগ করে দিলে কি এমন ক্ষতি হতো? তা’ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট মুক্ত নয়।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কুমার দাস বলেন, শিক্ষার কোনো বয়স নেই বলা হচ্ছে, অথচ একজন শিক্ষার্থীর বয়স ত্রিশ বছর পার হলেই তাকে আর সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশ ব্যতীত পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কিনা আমাদের জানা নেই। ৫৭ বছরের কর্মজীবী প্রৌঢ়কে যেখানে অবসরের বয়স বাড়িয়ে কাজ করার আরও সুযোগ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে সেখানে একজন যৌবনদীপ্ত তরুণের পায়ে ৩০ বছরেই প্রৌঢ়ত্বের শিকল পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কাজেই চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩৫ করা হোক। শিক্ষিত জন-সম্পদকে কাজে লাগানো হোক।

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter