দুর্নীতি রাজনৈতিক টানাপোড়েন দ্রব্যমূল্য সহিংসতা ও পারিবারিক অশান্তি

  এম এস আই খান ০৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি রাজনৈতিক টানাপোড়েন দ্রব্যমূল্য সহিংসতা ও পারিবারিক অশান্তি

অর্থনীতিসহ নানা দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এখন মুহূর্তের মধ্যেই কাছে কিংবা দূরের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। চাওয়ামাত্রই চাহিদা দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু এত কিছুর পরও মানুষের সুখ ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দ্রব্যমূল্য, সহিংসতা ও পারিবারিক অশান্তির কারণে সুখ হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন থেকে। এ নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিন্তার কারণ জঙ্গিবাদ দুর্নীতি ও রোহিঙ্গা

অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, স্বাস্থ্য এগুলোতে বাংলাদেশ বিগত বছরের তুলনায় সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে আমার মনে হয় কিছু বিষয় বিশ্বদরবারে প্রভাব ফেলতে পারে। তা হল জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও রোহিঙ্গা ইস্যু। বিগত সময়ে জঙ্গিবাদের উত্থান বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি তৈরি করেছে।

আর দেশের বড় বড় কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের অনিয়ম দেশকে কতটা পিছিয়ে দিচ্ছে সেটি নিয়েও ভাবার দরকার আছে। দেশের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এবং বহির্বিশ্বের কাছে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে।

এছাড়া সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা ইস্যু বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। অন্য দেশের ১০ লাখ মানুষকে খাওয়ানো-পড়ানোর যে বাড়তি বোঝা বাংলাদেশকে বহন করতে হয়েছে সেটিও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়।

এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে চলে আসে। এ ইস্যুটি নিয়ে বাংলাদেশ একটু অস্থির অবস্থানের মধ্যেই রয়েছে। সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, বিগত বছরের কিছু কিছু বিষয়ের কারণে হয়তো সূচকে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী দেশ হয়েও তাদের অবস্থানও এ বছর পিছিয়ে গেছে। এর কারণ হয়তো গত বছরের বর্ণবাদ বা বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাজে অবস্থার মতো আরও কিছু হতে পারে। তাই বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ আগামীতে এগিয়ে যাবে এটাই প্রত্যাশা।

অশান্তির মূলে দুর্নীতি

সমাজবিজ্ঞানী এএসএম আমানুল্লাহ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেন, সামাজিক অস্থিরতা ও সামাজিক দুশ্চিন্তা গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশে যেমন ছিল বর্তমানে তার থেকে আরও বেড়েছে।

সামাজিক অস্থিরতা ও সামাজিক ঝুঁকি জনগণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্র কিংবা বাইরে কোথাও মানুষ নিজেকে এখনও নিরাপদ মনে করে না। গড় আয়ু বেড়েছে, উপার্জন কিছুটা বেড়েছে, শিশু মৃত্যুহার কমছে, প্রসবকালীন মায়ের মৃত্যুহার কমছে।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নতি করছে, অর্থনীতির সূচকও অনেক ক্ষেত্রেই ভালো; কিন্তু সামাজিক যে সূচক রয়েছে তা অনেকটাই নিচের দিকে। সামাজিক সংহতির পরিমাণে হয়তো ১০-এর মধ্যে তিন পাবে, সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভারসাম্যে হয়তো ৪ পাবে আর সামাজিক ও পারিবারিক কলহ বা দাম্পত্য কলহ সামাজিক সূচক কমে যাওয়ার বড় কারণ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিবারের সবার উপস্থিতি দাম্পত্য কলহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন অনলাইনে যোগাযোগ বাড়ছে; কিন্তু পারস্পরিক সরাসরি যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। যা মানুষকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলছে।

আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাড়ির কর্তাব্যক্তিদের বেশ চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অনেকেই দুর্নীতি ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের চেষ্টায় নামছেন; যা কখনও মানুষকে সুখী করতে পারে না।

এ অশান্তির প্রতীক দুর্নীতি। এত ভয়াবহ, এমন কোনো অফিস পাওয়া কষ্টকর যেখানে দুর্নীতি হচ্ছে না। এখন মসজিদ এবং মন্দির বানাতেও দুর্নীতি হচ্ছে। দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য বানাতেও দুর্নীতি হচ্ছে। দুর্নীতি এ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ফলে লুটেরা অর্থনীতি চালু হতে যাচ্ছে।

এছাড়া দেশে শিক্ষিত বেকার শ্রেণীর মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। যুবকদের সামনে এখন কোনো রোল মডেল নেই। ১০০ জনের মধ্যে ৬০ জনেরই চাকরি নেই, অথবা যে যেই চাকরিটা চাচ্ছে সে সেই চাকরিটা পাচ্ছে না।

আর সরকারি চাকরিতে অস্বাভাবিক কোটা ব্যবস্থা বৃহৎ শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে নতুন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশার অশান্তি ক্রমেই বাড়ছে।

সুখ আসে কী করে?

মনোবিজ্ঞানী ড. আজিজুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমার মনে হয় সুখী দেশের কাতারে বাংলাদেশকে টেনে কোনো লাভ নেই। এর থেকে আমরা বহুগুণ দূরে। সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ডের চেয়ে আমরা বহু দূরে।

এখনও একজন নাগরিক আরেকজন নাগরিককে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না। একজন নাগরিকের সামনে অন্য একজন নাগরিককে মার্ডার করে ফেলা হয়, একজন নারীকে ধর্ষণ করা হলেও সে কিছু বলে না।

যেখানে অন্যায়-অবিচার নিত্যদিনের ঘটনা সেখানে সুখ আসে কী করে? তাই এখানে সুখী-অসুখী বিবেচনা করাই বোকামি। সমাজের মানুষের মধ্যে ব্যক্তি সম্পর্ক, মানসিক অবস্থা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিবার এসব বিষয় একজন মানুষের সুখী হওয়া না হওয়ার ওপর নির্ভর করে।

আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও যে ধরনের বিভাজন তাতে সাধারণ মানুষ শান্তি পাবে কী করে? স্বাধীন দেশে এখনও স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি থাকলে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

কারণ ডাক্তার ভুল করলে একজন রোগী মারা যায়। আর রাজনৈতিক নেতা ভুল করলে গোটা জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্য রাজতৈকিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি।

মানবিক ও সামাজিক প্রবৃদ্ধি থমকে আছে

সমাজ গবেষক তৌহিদুল হক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও সমাজ গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, এ ধরনের সূচকে দেশের জনগণ কতটা নিরাপদ এবং নিশ্চিন্তবোধ করে এটা বেশ গুরুত্বপূণ।

বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা এবং তা থেকে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় তখন সমাজের মানুষ দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সমাজের মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলেও সরকার সবসময় তার জনগণকে সব ধরনের নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

আমাদের দেশে সামাজিক এবং মানবিক প্রবৃদ্ধির দিকে কম গুরুত্ব দেয়া হয় এ চিন্তা করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে মানবিক এবং সামাজিক প্রবৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে যাবে; কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা।

আমরা দেখেছি, অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও তাদের সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক আন্দোলন, মানবিক পরিচয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বৃদ্ধি পায়নি।

আমরা দেখেছি, সরকার জনগণের প্রতি অনেক বেশি মানবিক। কিন্তু সেই মানবিকতা ক্ষেত্র বিশেষে দলীয় পরিচয়ে বেশি দেখানো হয়েছে। এটাকে এড়িয়ে যদি সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।

আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য বাড়ালে মানুষ আরও বেশি নিরাপদ এবং সুখীবোধ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.