চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণহীন ভোগ্যপণ্যের বাজার

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম ব্যুরো

সরগরম মাছের বাজার

পাইকারি বাজারে তেমন না বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না রমজাননির্ভর ভোগ্যপণ্যের দাম।

রমজানের শুরুতেই পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, চিনি, ভোজ্য তেল ও মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুচরা বাজারে প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কম থাকায় এবার রমজানকে সামনে রেখে যথেষ্ট পরিমাণ আমদানি হয়েছে। বাজারে কোনো পণ্যেরই সংকট নেই।

অনেক পণ্য গত বছরের চেয়ে কম দামে আমদানি করতে পেরেছেন তারা। তাই দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, আড়ৎ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে। দাম বাড়ার পেছনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কোনো হাত নেই বলে দাবি করেন তারা।

এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে কেজিপ্রতি রসুনের দাম ছিল ৬৮ টাকা থেকে ৭০ টাকা। একই রসুন এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। এই অবস্থা পেঁয়াজের দামেও।

দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ছিল ২০ টাকা থেকে ২২ টাকায়। একই পেঁয়াজ এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা থেকে ৪৫ টাকায়। পেঁয়াজের এ দাম বৃদ্ধির মূলে রয়েছে চট্টগ্রামের একাধিক ব্যবসায়ীক সিন্ডিকেট।

মূলত তারাই দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেট রমজানকে সামনে রেখে নানা অজুহাতে পেঁয়াজের পাশাপাশি আদা-রসুনসহ মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ানো হচ্ছে এসব পণ্যের দাম।

চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও খুচরা বাজারে দাম প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। খুচরা বাজারের পুরোটাই এখন সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। পুরো বাজার কয়েকটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে মসলা জাতীয় পণ্য বেশি আমদানি করা হয়। রমজান উপলক্ষে মসলা জাতীয় পণ্যের বাড়তি চাহিদা থাকে। প্রতিবছর রমজানের আগে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা মসলার বাজার নিয়ে কারসাজিতে মেতে ওঠে।

খাতুনগঞ্জে ১০-১৫ জন ব্যবসায়ী এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তারাই মসলা জাতীয় পণ্যের খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ছে অসন্তোষ।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, রমজানকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র অবৈধভাবে বেশি মুনাফার আশায় পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।

প্রশাসন যদি এই সিন্ডিকেট ভেঙে না দেয় তাহলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে পাইকারি বাজারে কয়েকটি সিন্ডিকেট পেঁয়াজের দাম আকাশ চুম্বী করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটে নিয়েছে।

এখন তারা মসলার দাম বাড়াচ্ছে। তাই এখন থেকে পেঁয়াজসহ মসলার বাজারে নজরদারির জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা ভোক্তাদের দেখাশোনা ও একসঙ্গে কম করে নিত্যপণ্য ক্রয় করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এক সপ্তাহ আগে আদা ৫৫-৬৫ টাকা, অস্ট্রেলিয়ান সাদা ছোলা ৬৫ টাকা, মিয়ানমারের হলদে ছোলা ৭০ টাকা, চনার ডাল ৩৫ টাকা, মসুর ডাল (চিকন) ৯৫ টাকা, মসুর ডাল (মোটা) ৬৫ টাকা, খেসারি ৬৮ টাকা, কোম্পানি ভেদে প্যাকেট ও বোতল জাত ভোজ্য তেল লিটার প্রতি ১০০-১০৫ টাকা, খোলা ভোজ্যতেল ৭০-৮০ টাকা এবং পাম অয়েল প্রতি লিটার ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

এখন একই রসুন কেজি প্রতি ১২০-১৪০ টাকা, আদা ৮৫-৯০ টাকা, অস্ট্রেলিয়ান সাদা ছোলা ৭০ টাকা, মিয়ানমারের হলদে ছোলা ৭৫ টাকা, চনার ডাল ৪০ টাকা, মসুর ডাল (চিকন) ১০০ টাকা, মসুর ডাল (মোটা) ৭০ টাকা, খেসারি ৭০ টাকা, চিনি টাকা, কোম্পানি ভেদে প্যাকেট ও বোতল জাত ভোজ্য তেল লিটার প্রতি ১০৩-১১০ টাকা, খোলা ভোজ্য তেল ৭৫-৮৫ টাকা এবং পাম অয়েল প্রতি লিটার ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে জিরা বিক্রি হয়েছে কেজি ৩৬০-৩৮৫ টাকা, এলাচ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, দারুচিনি ২৫০ টাকা, গোলমরিচ ৬৫০ টাকা ও লবঙ্গ ১ হাজার টাকা। প্রতিটি আইটেমে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫০ টাকা দাম বেড়েছে।

খাতুনগঞ্জের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএমএম গ্রুপের কর্ণধার মো. আবুল বশর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘এ বছর রমজানকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলা, ডালসহ বেশ কয়েক ধরনের পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। একারণে এসব পণ্য গত বছরের চেয়ে কম দামে বিক্রি হওয়ার কথা।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, রমজানকে সামনে রেখে পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। তাদের কাছেও এমন তথ্য রয়েছে। যারাই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ কারণে প্রতিদিনই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট এসব পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। তারা (ব্যবসায়ীরা) এখন একজোট।

প্রশাসনকে আরও শক্তহাতে এদের দমন করতে হবে। আমদানিকারক ও খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করা, সংকটকালে টিসিবিকে দ্রুত কার্যকর করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার তদারকিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও বাজার মনিটরিং করা উচিত।

এ ব্যাপারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। তাহলেই এসব সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে ভোক্তাদেরও সজাগ হতে হবে। রমজানের শুরু দিকে একসঙ্গে বেশি মসলাপাতি ক্রয় না করে অল্প অল্প করে ক্রয় করলে সিন্ডিকেট বেশি সুবিধা করতে পারবে না।

চট্টগ্রামের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাঈমা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন বাজার থেকে আমরা বিভিন্ন পণ্যের দাম সংগ্রহ করছি।

জেলা প্রশাসন সবকিছু মনিটরিং করছে। যেসব বাজারে সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ানো হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সিন্ডিকেট করে কেউ দাম বাড়ালে কাউকে রেহাই দেয়া হবে না।