ঐতিহ্যের খাবারেও দূষণের প্রসার

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এম এস আই খান

ইফতারের আগে চলছে তুমুল বেচা-কেনা

পুরান ঢাকার চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনের ইফতার বাজার এক ঐতিহ্যের নাম, রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার গৌরবও। ব্রিটিশ, পাকিস্তান শাসন-শোষণ পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ।

আজও প্রতি বছর রমজানে ভোজন রসিক মুসল্লিদের জন্য নবাবী আমলের ইফতার সামগ্রীতে একটুও ভাটা পড়েনি। প্রায় ৩০০ বছর পেরিয়ে আজও সগৌরবে ক্রেতা-বিক্রেতার কলবের জমজমাট চকবাজারের ইফতার বাজার।

তবে ঐতিহ্যবাহী এ ইফতার বাজারের ইতিহাস যতটা পুরনো, দিনে এখানকার খাবারের মান যেন ততটাই মানহীন অস্বাস্থ্যকর হয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত ভোর রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় পুরান ঢাকার বিখ্যাত এ খাবার আইটেমগুলো তৈরির কাজ। বেলা ১১টার দিকে সাজানো শুরু হয় দোকান। আর একটা নাগাদ জমজমাট হতে শুরু করে চকবাজারের ইফতার বাজার।

রমজান মাসে প্রতিদিন দুপুর থেকে ইফতারের আগ সময় পর্যন্ত বিক্রি চলে এখানে। এখানে বিক্রি হয়- বড় বাপের পোলায় খায়, ছোট কোয়েলের কাবাব থেকে আস্ত খাসি, গরু কিংবা খাসির মাংসের সুতি কাবাব, আধা কেজি থেকে পাঁচ কেজি ওজনের শাহি জিলাপি, খেজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফল। এ ছাড়া চিকেন টোস্ট, কিমা পরোটা, হালিম, চপ, দহিবড়া, পেঁয়াজু, বিভিন্ন রকমের আচার, মাঠাসহ নানা ধরনের মুখরোচক পানীয়।

বড় বাপের পোলায় খায় : চকবাজারে ঢুকলে প্রথমেই যে শব্দটি কানে আসে তা হল- বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়! পুরান ঢাকায় কিংবদন্তি আছে, বাপের পোলায় খায় খাবারটি অন্তত ৭৫ বছরের পুরনো।

৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খাবারটি বিক্রি করে আসা হাজী শহীদ বাবুর্চি জানান, ১৬ থেকে ৩২ ধরনের পদ দিয়ে তৈরি হয় বড় বাপের পোলায় খায়। খাবারটি ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এই খাবারটির দাম ছিল ৪০০ টাকা।

এবার বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার কারণে এটিরও দাম বাড়িয়েছেন বিক্রেতারা। রোববার বিকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, খাবারটি যারা বিক্রি করছেন তাদের অধিকাংশের হাতে গ্লাভস নেই। সূর্যতাপে আর গরমে হাতের ঘাম গড়িয়ে মিশছে খাবারে।

মো. সালেকিন নামে একজনকে দেখা গেল খালি হাতে তেল আর মসলা মিশিয়ে করে তৈরি করছেন বড় বাপের পোলায় খায়। ইফতার সময়ের ৬-৭ ঘণ্টা আগে খাবারটির বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করার পর খোলা অবস্থায় রেখে বিক্রে করায় ধুলোবালি গড়ায় এর গায়ে।

সুতি কাবাব : চকে গরুর মাংসের এবং খাসির মাংসের সুতি কাবাব বেশ জনপ্রিয়। লোহার শিকে ঝোলানো সুতি কাবাব বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। সচেতনতা না থাকায় বিক্রেতারা হাতে গ্লাভস পরেন না।

খোলা অবস্থায় বিক্রি করতে যেয়ে রোদে বা ধুলায় কাবারের রং পরিবর্তন হয়ে এলে তেলে ফোম বা কাপড় ভিজিয়ে কাবাবের ওপর চেপে দেন। তেলে ভেজা কাবাব মুহূর্তেই রং ফিরে পায়। ক্রেতারা তাজা মনে করে মনের আনন্দে কেনেন। প্রতিদিনের অবিক্রীত কাবাব পরের দিনও বাজারে চলে আসে টাটকা হিসেবেই!

পোড়া কালো তেলে ‘শাহি জিলাপি : একটি জিলাপি এক কেজি থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত ওজন, নাম শাহি জিলাপি। ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে এটি। এছাড়াও রয়েছে শাহি জিলাপি, রেশমি জিলাপি ও নরমাল জিলাপি।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুরনো পোড়া কালো তেলে জিলাপি ভাজা হচ্ছে বাজারে বসেই। কড়াইতেও পড়েছে কালো কালির আস্তরণ। আগুনের তাপে প্রস্তুতকারির শরীর ঘেমে গেছে। ঘামের পানি গোলায় মিশছে। আর সেই জিলাপি দেখেই জিভে জল আসে ক্রেতাদের।

বেশ কয়েকজন ক্রেতা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ও বিক্রি হতে দেখেও তারা খাবারটি কিনছেন শুধু ঐতিহ্য ও নামের কারণে। বিক্রেতা ও প্রস্তুতকারকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতন করতে সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন উদ্যোগ নেয় সে আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মাদ যায়েদ হোসেন বলেন, সারাদিন রোজা রাখার পরে তেলে ভাজা খাবারের চাইতে সিদ্ধ করা খাবার খেলে বেশি ভালো হয়।

বাজারের অস্বাস্থ্যকর ইফতার খেলে গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ফুড পয়জনিংসহ বিভিন্ন জটিল রোগ হতে পারে। ইফতারে ফলমূল, শাকসবজি, বাসায় তৈরি পায়েস, ফিরনি ও খিচুড়ি খাওয়া উচিত। সম্প্রতি র‌্যাব অভিযান চালিয়ে একটি রেস্তোরাঁ থেকে পঁচা মাংস উদ্ধার করেছে। অভিযান না চালালে হয়ত ওই পঁচা মাংস দিয়েই কাবাব বানিয়ে বিক্রি করে দিত। এ কারণে বলি, বাজারে বিক্রি হওয়া প্রচলিত খাবারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক এবং সাবেক পরিচালক পুষ্টিবিদ খুরশিদ জাহান বলেন, পুরনো তেলে ভাজা বাইরে বিক্রি হওয়া খাবার স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ নয়।

ধুলাবালি পরা এসব খাদ্য গ্রহণ করলে পেট ফাঁফা, অজীর্ণ, আমাশয় হতে পারে। আর ফলমূলে গ্রহণযোগ্য মাত্রার ফরমালিনে বিশেষ অসুবিধা নেই। তবে অতিরিক্ত ফরমালিন ক্ষতিকারক।