গ্যাস্ট্রিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে গ্যাসের সমস্যায় ভোগেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। ফাস্টফুড কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়া, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপানসহ নানা কারণে গ্যাস-গ্যাস্ট্রিক প্রায় ঘরোয়া রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো বাড়িতে গেলেই অন্তত গ্যাসের এক পাতা ওষুধ অবশ্যই পাওয়া যাবে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবেও দেশে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। যার অধিকাংশই বিক্রি হয় কোনো ধরনের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন ডেকে আনছে মারাত্মক ক্ষতি।

গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি

গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি হল পাকস্থলীতে এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং অবশেষে ক্ষতের সৃষ্টি করা। সাধারণত অতিরিক্ত ঝাল, মসলাযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া জাতীয় খাবারে এটি বেশি হতে পারে। কারণ এসব খাবারকে হজম করতে অতিরিক্ত এসিডের দরকার হয়; ফলে অনেক হাইড্রোজেন ক্ষরিত হয়ে ক্লোরিনের সঙ্গে মিলে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। এ এসিডের পরিমাণ বেশি হলে আমাদের পাকস্থলীর চামড়া ভেদ করে এবং আলসার (ঘা) তৈরি হয়, তখন আমরা ব্যথা অনুভব করি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, গ্যাস্ট্রিক হলে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেমন- খিদে কম পায়, পেটে গ্যাস হয়, বুক জ্বালা করে, পেটের মাঝখানে চিনচিনে ব্যথা হতে পারে। বুক ও পেটে চাপ অনুভূত হয়, হজমে অসুবিধা হয় এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির বারবার বমিও হতে পারে।

বাড়ছে রোগীর সংখ্যা

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ আর ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তির কারণেই দিন দিন বাড়ছে গ্যাস্ট্রিক রোগীর সংখ্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭ সালে জানুয়ারি মাসে ৪ হাজার ৪৮, ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ হাজার ৫৪৯, মার্চে ৪ হাজার ২৩৩, এপ্রিলে ৩ হাজার ৮৭২, মে মাসে ৪ হাজার ৫২৮, জুন মাসে ২ হাজার ৫১৭, জুলাই মাসে ৩ হাজার ৯৬৬, আগস্ট মাসে ৩ হাজার ৭৭০, সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার ৪৫৪, অক্টোবরে ৩ হাজার ৬২৮, নভেম্বরে ৪ হাজার ৭৩৩ এবং ডিসেম্বরে ৩ হাজার ২৪১ জন গ্যাস্ট্রিকজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। অর্থাৎ বিগত এক বছরে রাজধানীর শুধু একটি হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছেন অর্ধলক্ষ মানুষ। একই হাসপাতালে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯ হাজারেরও বেশি রোগী। রাজধানীর সব হাসপাতালের দৃশ্যটা এমনই। ফলে এ মুহূর্তে গ্যাসজনিত নানা রোগে রাজধানীর কয়েক লক্ষাধিক মানুষ যে আক্রান্ত এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, আমাদের খাদ্যভ্যাসের অনিয়মের কারণে প্রতি দশজনে অন্তত পাঁচজন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন।

ফাস্টফুড নির্ভরতা বাড়ছে

বাইরের মুখরোচক খাবার বিশেষ করে বিভিন্ন অলিগলিতে গড়ে ওঠা ফাস্টফুডের দোকানের খাবার খেয়ে বাড়ছে রোগবালাই। শুধু শিশুরাই নয়, অনেক অভিভাবকেরও প্রিয় ফাস্টফুড। এসব খাবারে মেশানো হয় নানা ধরনের কেমিক্যাল। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, ফাস্টফুডে একদিকে যেমন অর্থের অপচয়, অন্যদিকে রয়েছে জটিল রোগের ঝুঁকি। এ অবস্থায় অস্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়ার পরামর্শ তাদের। মাঝে মধ্যেই এসব দোকানে ভেজালবিরোধী অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব অভিযানে ক্ষতিকর কেমিক্যাল, পোড়া তেল পাওয়া গেছে একাধিকবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবম ফারুকও মসলাতে ভেজাল, তেলে ভেজাল সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ বলেন, বাইরের খাবারের প্রতি আজকাল মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। শহরেও গড়ে উঠেছে বড় বড় রেস্তোরাঁ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে যে ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে তাতে খাবার গ্রহণে আমাদের অবশ্যই আরও সচেতন হতে হবে। এদিকে অতিমাত্রায় ফাস্টফুডে আসক্তির কারণে যে গ্যাস্টিক সমস্যা বাড়ছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অনিয়ন্ত্রিত জীবন

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে গ্যাস্ট্রিক সমস্যার অন্যতম কারণ হল অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যারা নিয়মিত খাবার খান না, দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকেন, রাতের খাবার অনেক দেরিতে খান। অর্থাৎ সময়ের খাবার সময়ে না খাওয়া দীর্ঘদিনের অভ্যাস যাদের তাদের গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আনওয়ারুল কবীর বলেন, ধূমপান এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণেই গ্যাস্ট্রিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশের মানুষ খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সচেতন নন। খাওয়ার কিছু নিয়ম আছে সেগুলো মানছেন কয়জন? নিয়ম হচ্ছে খাওয়া শেষে একেবারে পানি না খেয়ে কিছুক্ষণ পর অল্প অল্প করে পানি খাওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ খাওয়া শেষেই প্রয়োজনীয় সবটুকু পানি খেয়ে ফেলেন। আর আমরা আসলে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নিজেরাই ওষুধ খাই। এসবও বিপদ ডেকে আনে।

নগর সভ্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন যাত্রার মানেরও পরিবর্তন হচ্ছে। দিনে দিনে মানুষ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। ঘুম ও খাওয়া থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে আসছে পরিবর্তন। অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের কারণে গ্যাস্টিকের বিভিন্ন ওষুধের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, সময়মতো খাবার না খাওয়া, ভেজাল খাবার, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া, ধূমপান ও মদ্যপানের কারণে মানুষের মধ্যে অ্যাসিডিটি সমস্যা বাড়ছে। অন্যদিকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এ ওষুধ সেবনের সুযোগ থাকায় মানুষের মধ্যে তা গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা গেলে গ্যাস্ট্রিককে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সরেজমিন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ

রোববার সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস্ট্রিক বা পেটের ব্যথা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। হাসপাতালের স্টাফরা বলছেন, গ্যাস্ট্রোএন্টারলজি বিভাগের সামনে এমন ভিড় নাকি নিত্যদিনের চিত্র। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি বেসরকারি ফার্মে কর্মরত হাসান মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে পেটে হালকা ব্যথা অনুভব করতাম। কিন্তু ফার্মেসি থেকে গ্যাসের ওষুধ খেলে আরাম পেতাম। চাকরিতে যোগ দেয়ার পর সমস্যাটা একটু বেড়েছে। তাই ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছি। লাইনে দাঁড়ানো অধিকাংশ রোগীই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন গ্যাসের ওষুধ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা না হওয়ায় ডাক্তারের কাছে এসেছেন।

পুরান ঢাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যবসায়ী আনোয়ার বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে পেটে ব্যথা। মহল্লার দোকান থেকে ওষুধ খেয়েছিলাম। ভালো হয়নি বিধায় হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে এসেছি। গ্যাস্ট্রিক বা পেটের পীড়াজনিত কারণে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কম-বেশি সবাই খাওয়ায় অনিয়ম কিংবা নিজে থেকেই দীর্ঘদিন থেকে ওষুধ খাচ্ছেন।

গ্যাস্ট্রিক থেকে বাঁচার উপায়

* প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে দুপুর ও রাতের খাবার খাবেন।

* একবারে বেশি পরিমাণে না খেয়ে অল্প করে বারবার খান।

* ধূমপান ও মদ্যপানকে এড়িয়ে চলুন।

* ঘুমানোর কমপক্ষে ২ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নিন

* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পেট খারাপ বা বমির ওষুধ কিনে খাবেন না।

* অতিরিক্ত তেল ও মসলা দেয়া খাবার খাবেন না। বাইরের খাবার না খেয়ে বাড়ির তৈরি খাবার খান। তাজা খাবার খান, স্টোর করা বা ফ্রোজেন ফুড কম খাবেন।

* শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমান। নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

* মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা অনেক সময় এসব সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। তাই মানসিক চাপ নেবেন না।

* তৈলাক্ত খাবার বাদ দিতে চেষ্টা করুন। মাংস, ডিম, বিরিয়ানি, মোগলাই, চায়নিজ খাবার যা-ই খান না কেন, তা দুপুরের মেন্যুতে অন্তর্ভুক্ত করুন। রাতের খাবারটি যেন হালকা হয়। শাকসবজি, ছোট মাছ এসব দিয়ে রাতের মেন্যু সাজান।

* খাওয়ার পরপরই অনেক বেশি পানি পান করার প্রবণতা বাদ দিন। ভাত খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট পর পানি পান করুন।

* দিনে কিংবা রাতে খাওয়ার পরপরই অনেকে শুয়ে পড়তে পছন্দ করেন। এটা না করে কিছুক্ষণ আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করতে পারেন অথবা বসে থাকতে পারেন সোজা হয়ে। অন্তত ৩০ মিনিট পর ঘুমাতে যান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter