চামড়া নিয়ে হিসাব ছাড়া বাণিজ্য

  সাজেদুল ইসলাম বিজয় ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গরু জবাই নিষিদ্ধের ফলে কাঁচা চামড়ার অভাবে ধ্বংস হতে বসেছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ট্যানারি শিল্প। অন্যদিকে সারা বছরের জোগানের অর্ধেক চামড়া এ কোরবানির ঈদে পাওয়া গেলেও সেই চামড়া রীতিমতো ফেলনায় পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। চলতি বছর কোরবানিদাতাদের পানির দামে পশুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে। পাড়া-মহল্লা থেকে কেনা চামড়া আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে মৌসুমি বিক্রেতাদেরও মাথায় হাত পড়েছে।

বুধবার ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে আড়তে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমতে থাকায় অনেক মৌসুমি বিক্রেতা হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনেছেন বলে দাবি করেছেন। বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম কমের দোহাই দিয়ে দেশে চামড়ার দরপতনের এ দায়ও এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

রাজধানীর মগবাজারের মৌসুমি চামড়া বিক্রেতা হৃদয় মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ঈদের দিন তিনি একশ’ চামড়া কিনে বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছিলেন। তাই বৃহস্পতিবার আর চামড়া কিনতে পারেননি। ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে ২ লাখ টাকার চামড়া কিনেছিলাম। অথচ অধিকাংশ চামড়াই বিক্রি করতে হয়েছে ৪০০ টাকায়।

কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বুধবার রাত ৯টা নাগাদ কোনো আড়তদার আমার কাছে চামড়া কিনতে আসেনি। পরে রাত ১০টায় নবাবপুরের মানসী সিনেমা হল এলাকায় নিয়ে লোকসানে চামড়া বিক্রি করেছি। এ বছর সরকার ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

অন্য বছর রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের হেমায়েতপুরে সরে যাওয়ায় এবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি, লালবাগের পোস্তা, নবাবপুরের মানসী সিনেমা হল, পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকায় বসেছে চামড়ার অস্থায়ী পাইকারি বাজার।

লালবাগের পোস্তা এলাকার আড়ত প্রগতি লেদার কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন বলেন, মৌসুমি বিক্রেতারা পাড়া-মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কেনাতেই বিপত্তি হয়েছে।

তিনি বলেন, এ বছর চামড়ার মূল্য ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে লবণ খরচ যোগ হবে। আবার এ চামড়া নিয়ে যেতে হবে সাভারের হেমায়েতপুরে। আগে আমরা হাজারীবাগে পৌঁছে দিলেই চলত।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধের ফলে সেখানকার চামড়া কারখানাগুলোর উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দেশটির কাছে ট্যানারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল চামড়া এখন ‘সোনার চেয়েও দামি’। কেননা তাদের সরকারের চামড়া খাত থেকে ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজস্বের এ লক্ষ্যমাত্রা ২০২০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ করারও প্রত্যাশা রয়েছে দেশটির। তা ছাড়া জারা ও ক্লার্কসের মতো বিদেশি নামিদামি ক্রেতাদেরও হারাতে হচ্ছে দেশটিকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের চামড়াজাত পণ্যের প্রধান উৎস দেশ হতে পারে বাংলাদেশ। তা ছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীনের বাজার হারানোর আশঙ্কাকে বাংলাদেশ সম্ভাবনা হিসেবেও দেখতে পারে। আর এ সম্ভাবনার সময়ে দেশে নামমাত্র মূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ দেশবাসীকে হতাশ করেছে বলে মনে করছেন তারা।

এবার ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ায় দেশের খামারিরা পর্যাপ্ত গবাদি পশুর জোগান রাখতে পারলেও কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় অনেক বিক্রেতাই মন খারাপ করে বাড়ি ফিরেছেন। এ ক্ষেত্রে পশুর দামে যেমন খামারিকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেই, তেমনি কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণেও চামড়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থই গুরুত্ব পেয়েছে। এতিমদের উদ্দেশে দান করা কোরবানির চামড়ার দাম গত চার বছরে ৯০ টাকা প্রতি বর্গফুট থেকে কমিয়ে ৫০ টাকায় আনা হয়েছে।

একটি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল এত সস্তায় পাওয়া গেলেও দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। নামিদামি দেশি ব্র্যান্ডের এক জোড়া জুতার দাম ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে নেই, একটি বেল্ট ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। একটি মানিব্যাগ ৭০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকার বেশিও আছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি মাঝারি আকারের গরু থেকে ২২ থেকে ২৫ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। রাজধানীর বংশালে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার বড় বাজার। সেখানে বিভিন্ন আকারের চামড়ার ওপর দামের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তবে গড়ে প্রতি বর্গফুট ২০০ টাকা করে ধরলে একটি গরুর চামড়ার দাম পড়ে ৫ হাজার টাকা। তবে কাঁচা চামড়া থেকে এ চামড়া বের করার পরও আস্তরসহ দুই ধরনের পণ্য বের করা হয় ট্যানারিগুলোতে। সেই হিসেবে একটি কাঁচা চামড়া থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার বেশি পণ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন পুরান ঢাকার এক চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারক মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি জানান, এক জোড়া জুতা তৈরি করতে বড়জোর আড়াই থেকে তিন বর্গফুট চামড়ার প্রয়োজন হয়।

এবার কোরবানির সময় চামড়ার দরপতনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে কাঁচা চামড়ার প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়া যায়নি। কোরবানির সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যানারি মালিকসহ কিছু চামড়া ব্যবসায়ীকে নিয়ে আলোচনা করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে এ প্রক্রিয়া ঠিক নয়। এ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার। এ আলোচনায় অনেক বেশি স্বচ্ছতা আনতে হবে। দেশে কী পরিমাণ চামড়ার চাহিদা রয়েছে, গত বছরের চামড়ার মজুদ কেমন আছে, কোন কোন ট্যানারির চামড়ার দরকার আছে এবং কোন কোন ট্যানারি আগের বছরের ঋণ পরিশোধ করেনি এমন অনেক বিষয় সামনে নিয়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ করলে সেটা বাস্তবসম্মত হতো। তা ছাড়া চামড়ার উপযুক্ত একটি দাম থাকা দরকার। সারা বছর চামড়ার যে ধরনের দাম থাকে কোরবানির সময়ও সেই রকম দাম অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে যারা এ চামড়ার অর্থের দাবিদার সেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter