নৌপথেও জীবনের ঝুঁকি

  ফাহাদুল ইসলাম সানি ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পূব আকাশে সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঈদ শেষে ঢাকামুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার ৪২টি নৌরুটের লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তির স্থান হিসেবে পরিচিত সদরঘাট। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই শেকড়ের টানে বাড়িতে পাড়ি দেয়া এবং উৎসব শেষে কর্মস্থলে ফেরার যাত্রা। কিন্তু এ আনন্দ বা উৎসবের মাত্রাকে হ্রাস করে দেয় যাত্রাপথের নানামুখী ভোগান্তি। ঈদের উৎসব শেষ হওয়াতে ব্যস্ত নগরীতে ফিরছে মানুষ নানা ধরনের যাত্রাপথের প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই। সদরঘাটে প্রতিটি লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়েই আসতে শুরু করেছে ঢাকায়।

অতিরিক্ত যাত্রী ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ : সড়ক পথের তীব্র যানজট, ট্রেনের লাগামহীন সিডিউল বিপর্যয়ে নৌপথে শান্তির যাত্রা প্রত্যাশা করে থাকে অনেক যাত্রী। কিন্তু যাত্রীর চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শান্তির যাত্রা অনেকটা আতঙ্কের যাত্রায় পরিণত হয়। ঈদের আগে এবং পরে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছাড়ছে অধিকাংশ লঞ্চ। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে লঞ্চগুলোকে যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যস্থলে যেতে হচ্ছে অসংখ্য যাত্রীর।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, তারা ২০২টি লঞ্চের রুট পারমিট দিয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৪২টি নৌ-পথে চলাচলের জন্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে একাধিক ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করছে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী যাত্রী। পটুয়াখালীর যাত্রী মো. জুনাঈদ তানভীর বলেন, সারা বছর এমন ভোগান্তির চিত্র না থাকলেও ঈদ এলেই ভোগান্তির সঙ্গে বেড়ে যায় আতঙ্ক। আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে ফিটনেস পরীক্ষা বা অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া বন্ধ করা সম্ভব না। তাই দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের শক্ত হস্তক্ষেপ আমাদের কাম্য। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঈদ আনন্দ শেষ করে দেয়ার আগে সচেতন হয়ে কাজ করা উচিত।

লঞ্চের অনিয়ন্ত্রিত সময় ব্যবস্থাপনা : ঈদের পর অধিকাংশ লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রীর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সিডিউল হীনভাবে ছাড়ছে বলে জানা যায়। ঈদের সরকারি ছুটি শেষ হয়েছে রোববার, ফলে চলতি কর্মদিবসগুলোতে পরিবার নিয়ে ঢাকায় ফিরছে অনেকেই। কিছু লঞ্চ ফিরতি যাত্রাপথে নির্দিষ্ট সময়ের পরও অতিরিক্ত অপেক্ষা করায় ঢাকায় আসতে দুই-তিন ঘণ্টা দেরি হচ্ছে। আমতলী থেকে রোববার ঢাকার যাত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগে ঢাকায় আসতে, এবার লেগেছে প্রায় এগারো ঘণ্টা। রাত ৮.৩০ এ ছাড়ার কথা থাকলেও লঞ্চটি ছেড়েছে রাত ১০ টা ২০ মিনিটের দিকে। ছোট ভাই ও মাকে নিয়ে সদরঘাট নেমেছি সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। এভাবেই অতিরিক্ত সময় লেগেছে ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময়ও। এছাড়া বরিশালের বিভিন্ন ঘাট, খুলনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুরসহ প্রায় সব স্থান থেকেই কিছু লঞ্চ সঠিক সময় এসে পৌঁছাতে পারেনি বলে যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে একাধিক যাত্রীরা।

উৎসবকেন্দ্রিক ডেক ও কেবিন বাণিজ্য : ঈদ এলেই লঞ্চে সক্রিয় হয়ে ওঠে এক ধরনের অদৃশ্য সিন্ডিকেট। লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষ, সাধারণ যাত্রী কিংবা বিআইডব্লিউটিএ সবার সামনেই ঈদের সময় চলে উৎসবকেন্দ্রিক ডেক ও কেবিনের বাণিজ্য। ভুক্তভোগী যাত্রীরা দিনের পর দিন অভিযোগ করলেও মিলছে না সমাধান। সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যরা ডেকের বিভিন্ন স্থান আগে থেকে দখল করে রাখে। স্থান ও আকারের ওপর ভিত্তি করে ৩০০-৫০০ টাকায় বিক্রি করে ডেকের দখলকৃত স্থান। এছাড়া এ বছর কেবিনের টিকিট পরিণত হয়েছে সোনার হরিণে। ঈদের আগে এক হাজার টাকার কেবিনের টিকিট স্থান ভেদে বিক্রি হয়েছে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায়। বরিশালের যাত্রী কায়সার এইচ সুমন প্রতিমঞ্চকে বলেন, সিন্ডিকেটের এমন বাণিজ্য অনেকটা ওপেন সিক্রেট। শত ভোগান্তি নিয়ে ঈদ শেষে ঢাকায় ফিরতে হয়, ভোগান্তির কথা মনে হলে ঈদের আনন্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। একটা সিঙ্গেল কেবিন সারা বছর যেখানে হাজার টাকার টিকিট , ঈদ এলে তা তিন হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আসতে হল আট ঘণ্টার পথ। ঈদের আগে সদরঘাটের মতো স্থানে টিকিট কাউন্টারগুলোতে লোক থাকে না, লোক থাকলেও টিকিট থাকে না। বাধ্য হয়ে লঞ্চের সামনে থেকে যখন টিকিট কিনতে হয় তখন টিকিট বাণিজ্য তো স্বাভাবিক।

যাত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় উদাসীনতা : লাখ লাখ যাত্রীর চাপ থাকে সদরঘাটে। লঞ্চগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ঈদের আগে ও পরের যাত্রা পথে। কিন্তু অধিকাংশ লঞ্চ যাত্রীর তুলনায় ১০% নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখে না বলে অভিযোগ রয়েছে। লাইফ জ্যাকেট, টায়ার, অক্সিজেন কিংবা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদাসীন মালিক কর্তৃপক্ষ। অনেক লঞ্চের কর্মকর্তা এ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো সম্পর্কে জানেই না। সুন্দরবন-২ লঞ্চের কর্মচারী হারুন আহমেদ বলেন, লঞ্চের নিরাপত্তা সব ভালো মতোই নেয়া থাকে। সাঁতার জানলে এতো কিছুর খুব দরকার নেই, তাছাড়া মুখের কথায়তো আর এতো বড় লঞ্চ ডুবে না। ঈদের সময় যাত্রী বেশি থাকলেও লঞ্চের কোনো সমস্যা নেই। মালিকরা সব সময় যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে বলেই এখন এতো সুবিধা আছে প্রায় সব লঞ্চের মধ্যে। যদিও সদরঘাটে কুলিদের আধিপত্য অনেক কমে গেছে, ফলে সাধারণ যাত্রীরা বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছে। কুলিদের আধিপত্য হ্রাস পেলেও রয়েছে প্রতিটি লঞ্চে দালাল চক্র, যারা জোরপূর্বক ১৫-২০ কেজির ব্যাগ বা বস্তা এগিয়ে দেয়ার নাম করে হাতিয়ে নিয়ে থাকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে এদের আধিপত্য এখনও ব্যাপক আকার ধারণ করেনি বলে জানা যায়। নৌ-পুলিশের পরিদর্শক মো. আবু তাহের বলেন, নৌপথে যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে লঞ্চঘাট এলাকায় নৌ-পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী চাপের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা ও ভোগান্তি লাঘবে কাজ করছি।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter