প্রকৃতির কন্যা কমলগঞ্জে যেতে দুর্ভোগ নেই কোনো সুযোগ-সুবিধা

  আবদুর রাজ্জাক রাজা, কমলগঞ্জ থেকে ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলো। এ উপজেলায় টিলাঘেরা সবুজ চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, ছায়া নিবিড় পরিবেশে অবস্থিত নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, ঝরনাধারা হামহাম জলপ্রপাত, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, শিল্পকলা সমৃদ্ধ মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ জনপদ পর্যটকদের মন ও দৃষ্টি কেড়ে নেয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝে সবচেয়ে দর্শনীয়, নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। পশুপাখি, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস স্থল। এ উদ্যানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সবুজ বৃক্ষরাজি। বিশ্বের বিলুপ্ত প্রায় জীব উল্লুকসহ কয়েকটি জন্তু ও বিলুপ্ত প্রায় কয়েকটি মূল্যবান গাছগাছালির শেষ নিরাপদ আবাসস্থল হল লাউয়াছড়া। ১৯৯৬ সালে ১২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে লাউয়াছড়াকে ঘোষণা করা হয় জাতীয় উদ্যান হিসেবে। ঢাকা থেকে প্রায় সোয়া ২শ’ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লাউয়াছড়ার অবস্থান। ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেন অথবা বাসযোগে শ্রীমঙ্গল নেমে খুব সহজেই আসতে পারেন। সময় লাগবে আনুমানিক ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। এছাড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির প্রাণিবৈচিত্র্যের ভেতর ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভয়চর প্রাণী, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির অর্কিড, ২০ প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে। আগর বাগান, বিরল প্রজাতির গাছ, নানা প্রজাতির পাখির ডাক, ছড়া, বনফুল, অর্কিড, চশমা বানর, বিশ্বের বিলুপ্ত প্রায় দুর্লভ উল্লুক এগুলো এ বনের বিশেষ আকর্ষণ। এ বনের বিচিত্র পশুপাখি ও পোকামাকড়ের অদ্ভুত ঝিঁঝিঁ শব্দ, বানরের ভেংচি, ভাল্লুকের গাছে গাছে ছোটাছুটির দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে।

মাধবপুর লেক

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুরে নয়নাভিরাম মনোরম দৃশ্য মাধবপুর লেক ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য আরও একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার পাহাড়ি উঁচু-নিচু টিলার মাঝে দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার পানির হৃদ ও তার শাখা-প্রশাখা, চারপাশে পাহাড়ি টিলার ওপর সবুজ চা বাগানের সমারোহ। লেকের চারপাশে বিশাল টিলার সারিবদ্ধ ছোট-বড় গাছ। চা বাগানের টিলার মাঝখানে জলরাশি। টলমলে রূপালী জলের সঙ্গে দিবা-নিশির মিতালি করছে নীল পদ্মফুল। জলের আলো ছায়ার নীল পদ্মের লুকোচুরি খেলা মনোমুগ্ধ করবে আগত পর্যটকদের। জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনি শাপলার আধিপত্য, ঝলমল স্বচ্ছ পানি, ছায়া নিবিড় পরিবেশ, শাপলা-শালুকের উপস্থিতি আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান আত্মোৎসর্গের কারণে সরকার তাকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করেছে। হামিদুর রহমানের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে তৎকালীন শ্রীমঙ্গলের ১৭ রাইফেল ব্যাটালিয়ন ধলই সীমান্ত ফাঁড়িসংলগ্ন স্থানে শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান ‘বীরশ্রেষ্ঠ সরণি’ নির্মাণ করে। ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণপূর্ত বিভাগ ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই চা বাগানে বিজিবির সীমান্ত ফাঁড়িসংলগ্ন এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

হামহাম জলপ্রপাত

প্রায় ১৬০ ফুট পাহাড়ের ওপর থেকে স্পটির স্বচ্ছ পানি আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে। রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের প্রায় ৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন এ হামহাম জলপ্রপাত। স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীরা এ জলপ্রপাত ধ্বনিকে হামহাম বলে। তাই এটি হামহাম নামে পরিচিত। সেখানে সরাসরি যানবাহন নিয়ে পৌঁছার ব্যবস্থা নেই। প্রায় ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে পৌঁছাতে হয় এ ‘ঝরনা সুন্দরী’র আঙ্গিনায়। রোমাঞ্চকর দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাত গহিন বনের ওই ঝরনাধারা। কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে হামহাম জলপ্রপাতটি অবস্থিত। এর মধ্যে ২৭ কিলোমিটার রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতে পারলেও বাকি ৫ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা মানুষের চলাচলের জন্য মারাÍক ঝুঁকিপূর্ণ। হামহাম জলপ্রপাত ভ্রমণ করতে একদিনের প্রয়োজন।

ডবলছড়া পুঞ্জি

ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ডবলছড়া। ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি পাহাড়ি ছড়ার নামে স্থানটির নাম হয়েছে বলে জানা যায়। ডবলছড়া খাসিয়া পল্লী যেতে পাহাড়ি উঁচু-নিচু কাঁচা ১২ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। পথিমধ্যে শমশেরনগর চা বাগানের দুটো প্রাকৃতিক হ্রদ, একটি গলফ মাঠ ও ক্যামেলিয়া ডানকান হাসপাতাল যে কোনো পর্যটকের নজর কাড়বে।

ব্যবস্থাপনার অভাব

সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় পর্যটকদের আসতে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পর্যটন এলাকায় বসার জায়গা না থাকা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিনোদনের সামগ্রী অভাব সর্বোপরি পর্যটন এলাকাগুলো ভালো থাকার স্থান খাবারের হোটেল না থাকায় পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি হিসেবে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ভ্রমণপিপাসুদের কাছে গুরুত্ব পেলেও কেবল ভাঙাচোরা রাস্তা আর পর্যটনগুলোতে বসার, জল খাবার কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় উঠার রাস্তা জরাজীর্ণসহ ছোট শিশুদের আনন্দ দেয়ার সুযোগ না থাকার কারণে অনেক পর্যটক এসব স্থানে যেতে বিমুখ হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, প্রাকৃতিক অবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য কোথাও সিঁড়ি, কোথাও ঝুলন্ত সিঁড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রস্তাব ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আরও কথা বলা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter