জ্যাকব টাওয়ার, চর কুকরি-মুকরি, তাড়ুয়া সৈকত

যোগাযোগ সংকটে উপেক্ষিত সৌন্দর্যের হাতছানি

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আকতার ফারুক শাহিন ও শিপু ফরাজী, চরফ্যাশন থেকে

জ্যাকব টাওয়ার। ফাইল ছবি

চোখের ঠিক সামনেই রিজার্ভ ফরেস্ট চর কুকরি-মুকরির নয়নাভিরাম সবুজের সারি। মনে হয় যেন হাত বাড়ালেই ছোয়া যাবে ঘন জঙ্গলের এলোমেলো ডালপালা।

এর একটু ডানে আর বামে চোখ ফেরালে দৃষ্টিসীমায় ভেসে আসে সমুদ্র, তাড়–য়া সৈকত, স্বপ্নদ্বীপ মনপুরার চর পিয়াল, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ আর গভীর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি। চোখ বন্ধ করে কান পাতলেই শোনা যায় সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন।

এখানেই শেষ নয়, চারদিকের প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা এভাবে একেবারে চোখের সামনে ভেসে ওঠার পাশাপাশি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২০০ ফুট উপরে বসে মনে হবে যেন মাথা ফুঁড়ে উঠেছি আকাশে। ভেসে আছি পেঁজা তুলার মতো মেঘের রাজ্যে। চারপাশ দিয়ে শিশিরভেজা মেঘ ভিজিয়ে দিচ্ছে সবকিছু।

বলছিলাম দ্বীপ জেলা ভোলার সবচেয়ে দক্ষিণে সাগরের কোল ঘেঁষে থাকা চরফ্যাশন উপজেলার জ্যাকব টাওয়ারের কথা। প্রায় ১৯ তলা উঁচু এই টাওয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে চোখ রাখলে এভাবে চোখের সামনে আর হাতের নাগালে চলে আসে চারপাশের প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

এর মধ্যেই ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্যস্থলে পরিণত হয়েছে এই টাওয়ার। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই টাওয়ারে উঠে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন চারপাশের এমন অভূতপূর্ব সৌন্দর্য দেখে। কেবল এই টাওয়ারই নয়, নানা কারণে একটু একটু করে পর্যটকদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে চরফ্যাশন উপজেলা।

এখানে যেমন রয়েছে রিজার্ভ ফরেস্ট চর কুকরি-মুকরির অসম্ভব সৌন্দর্য, ঠিক তেমনি রয়েছে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়া তাড়–য়া সমুদ্র সৈকত। কুকরি-মুকরির নামই তো বদলে হয়ে গেছে কুইন আইল্যান্ড।

এগুলোর সঙ্গে রয়েছে চরফ্যাশন উপজেলার কেন্দ্রে নির্মিত অত্যাধুনিক শেখ রাসেল শিশু পার্ক, নয়নাভিরাম ফ্যাশন স্কয়ার ও পানির ফোয়ারা, ঢালচর কোস্টাল রেডিও স্টেশন ও লাইট হাউস এবং কুকরি-মুকরি আধুনিক অবকাশ কেন্দ্রসহ আরও অনেক কিছু।

বর্তমান সরকারের মাত্র পৌনে ১০ বছরে নির্মিত এসব আধুনিক স্থাপনা চরফ্যাশনকে নিয়ে গেছে পুরোপুরি এক ভিন্ন মাত্রায়। এত আয়োজনের সবকিছুই ম্লান হতে বসেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা আর পর্যটকদের আবাস সংকটের কারণে।

রাজধানী ঢাকা থেকে যেমন নৌ-পথে সরাসরি পৌঁছানো যায় না এসব পর্যটন স্পটে, তেমনি এই উপজেলার সঙ্গে নেই বিভাগীয় শহর বরিশাল কিংবা সারা দেশের সঙ্গে কোনো সরাসরি সড়ক যোগাযোগ।

ফলে দুর্গম যাতায়াতের কষ্ট সহ্য করে অনেকেই যেতে চাননা অসম্ভব সুন্দরের এই উপজেলায়। তাছাড়া রাতে থাকার মতো যথেষ্ট স্থাপনা গড়ে না ওঠায় এই নিয়েও জটিলতায় পড়তে হচ্ছে পর্যটকদের।

যোগাযোগ ও আবাসন সমস্যা

রাজধানী ঢাকা-কিংবা বিভাগীয় শহর বরিশাল থেকে নৌ বা সড়কপথে কোনোভাবেই সরাসরি যাওয়ার উপায় নেই কুকরি-মুকরি, তাড়ুয়ার সৈকত, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কিংবা সুন্দরের রাজ্য ঢালচরে। এমনকি চরফ্যাশন উপজেলা শহরেও ঢাকা থেকে সরাসরি পৌঁছানো যায় না লঞ্চে।

ঢাকা থেকে প্রতিদিন দুটি করে লঞ্চ যাত্রী নিয়ে চরফ্যাশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে এলেও এগুলো ভেড়ে তেঁতুলিয়ার ঘোষেরহাট এবং মেঘনার বেতুয়ায়। এই দুটি জায়গা থেকে যথাক্রমে ৩ এবং দেড় কিলোমিটা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয় চরফ্যাশন উপজেলা শহরে।

সেখান থেকে বাসে করে যেতে হবে ২৫ কিলোমিটার দূরে চর কচ্ছপিয়া এলাকায়। এখান থেকে কুকরি-মুকরি যেতে আশ্রয় নিতে হবে ট্রলার বা স্পিড বোটের। কচ্ছপিয়া থেকে নৌ-পথে কুকরি-মুকরির দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। ঢালচর-তাড়ুয়াসহ সংলগ্ন এলাকায় যেতে নেই ট্রলার ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা।

নৌ-পথে দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। এসব স্থানে যেতে জনপ্রতি খরচ হয় নিম্নে ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। আবাসন ব্যবস্থা বলতেও তেমন কিছু নেই এসব এলাকায়। কুকরি-মুকরিতে সুইমিং পুল এবং শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত ১৮ কক্ষের একটি অত্যাধুনিক গেস্ট হাউস থাকলেও এটি যেমন একদিকে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নয় তেমনি ভাড়া বেশি হওয়ার কারণে অনেকে এখানে থাকতেও পারেন না।

এছাড়া রিসোর্টের বাইরে খাবারের ভালো ব্যবস্থাও খুব একটা নেই। তাড়ুয়া সৈকতে থাকার ব্যবস্থা বলতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালামের উদ্যোগে বাঁশ আর টিন দিয়ে গড়া একটি রেস্ট হাউসই সম্বল। কোনোমতে থাকার ব্যবস্থার এই রেস্ট হাউসে একসঙ্গে থাকতে পারবে ২০ জন।

এর জন্য অবশ্য তিনি কোনো ভাড়া নেন না। পর্যটক আকর্ষণই মূল উদ্দেশ্য। ঢালচর আর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র আর ইউনিয়ন পরিষদের গেস্ট হাউসই পর্যটকদের রাত কাটানোর একমাত্র ভরসা।

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব বলেন, ভোলার সঙ্গে বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। আশাকরি খুব শিগগিরই এটা দৃশ্যমান হবে। এটি হয়ে গেলে ভোলা তথা চরফ্যাশনের সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হবে।