চাই প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রবীণ দিবস নিয়ে কথা হচ্ছিল জিয়াউল হকের সঙ্গে পেশায় তিনি মুহুরি। ঢাকা জজ কোর্টে তার জীবনের ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। এ বছর জুনে তার বয়স পার হয়ে গেছে ৭০ কোটা। ঢাকার সদরঘাটের ভাসমান হোটেলে মাসিক ২৪শ’ টাকায় ভাড়ায় থাকেন। এক রুমের দুনিয়া। বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার বাড়ি। দুই ছেলে পড়াশোনা করে। পরিবারের বিশাল দায়িত্ব তার কাঁধে। চাইলেও বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ নেই। চোখ, শরীর যতই ক্লান্ত হোক না কেন তাকে আগামী দিনের কাজ সমাপ্ত করেই ঘুমাতে যেতে হবে। তারপরও জীবন নিয়ে তার ক্ষোভ নেই। এ বয়সে তিনি কর্মক্ষম পরিবারের জন্য শ্রম দিতে পারছেন তাতেই তৃপ্তির হাসি।

প্রবীণ আর নবীনের দ্বন্দ্ব নয়, চাই সহঅবস্থান। এ বাক্যে আমরা যতটাই বলি ঠিক ততটাই বিরোধী অবস্থানে আছি। আমাদের অবকাঠামো পরিকল্পনায় প্রবীণদের জন্য কোনো স্থান নেই। বরং বেশির ভাগক্ষেত্রেই আমাদের পরিকল্পনা হয়ে যায় প্রবীণদের বিরুদ্ধে। গ্রামের যৌথ পরিবারগুলোতে দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন থাকায় প্রবীণরা কিছুটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করেন। শহরের চিত্র ভিন্ন এখানে অবকাঠামো, সামাজিক রীতিনীতি, আইন সবই যেন প্রবীণদের নিঃসঙ্গ করে দেয়ার প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় প্রবীণরা ক্রমেই বন্দি করে তুলে।

আজিজ সাহেব মুন্সীগঞ্জে থাকেন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পেনশন সুবিধা পান বলে তিনি আর্থিকভাবে অনেকটাই সচ্ছল। ৩০ বছর যাবৎ বারডেমে নিয়মিত আসেন। এখন তার বয়স ৯০-এ কোঠায়। কিন্তু তার মানসিক মনোবল আর নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে তিনি এখনও একাই মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে আসেন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার পর তার প্রথম প্রতিবন্ধকতা শাহবাগের ফুটওভার ব্রিজ। এ ব্রিজের কাছে এসেই তিনি অসহায়। কারও সাহায্য ছাড়া তিনি পার হতে পারেন না এ ব্রিজ। তাই অপেক্ষায় থাকেন কেউ একজনের সহযোগিতার। শাহবাগ, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো এমন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে এই অবকাঠামো যে কতটা দুর্ভোগ বাড়ায় তার প্রমাণ মিলবে একদিন সকালে শাহবাগের মোড়ে দাঁড়ালে।

একজন মানুষ যত প্রবীণ হতে থাকেন, তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, আত্মশক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা আরও প্রগাঢ় হতে থাকে। দেশ ও সমাজের উন্নয়নে তাদের অর্জিত জ্ঞান নানাভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু আজ এ জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা প্রতিটি ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আমাদের শহরে পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনা দেখলে মনে হয় তারা জানেনই না শহরে প্রবীণরাও থাকেন। আরবান কালচার নামে জীবন শুধুই আমি তে বন্দি হচ্ছে। আর পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনাগুলোও মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

শহরে বাড়িগুলোর নকশায় বেডরুম, ড্রইংরুম, সারভেন্ট রুম, গেস্টরুম থাকে। কিন্তু পিতা-মাতার জন্য কোনো কক্ষ থাকে না। বাড়ি বানানোর নকশায় তাদের বাতিল করে দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা পরিবারে থেকেও পরিবারের বাইরের কেউ হয়ে পড়ছেন।

প্রবীণদের সমস্যা আসলে বয়সের সমস্যা নয়, সমস্যাটি প্রবীণের সঙ্গে নবীনের মনোগত অবস্থার সমস্যা। এক সমস্যা সমাধানে অনেকেই বৃদ্ধানিবাসের কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু বৃদ্ধানিবাস সমাধান নয়। অতীতে আমাদের প্রবীণরা আমাদের শ্রদ্ধা, শক্তি, ভালোবাসা, আস্থার প্রতীক ছিল। আমাদের ত্র“টিপূর্ণ অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনধারাই মহামূল্যবান প্রবীণ বিমুখ করে তুলছে। ভারসাম্যপূর্ণ, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রবীণদের প্রতি দয়া নয়। চাই প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো।

লেখা : সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন, পরিবেশকর্মী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter