বৃদ্ধাশ্রম এখন আমার ঠিকানা

  তারিক রহমান ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৃদ্ধাশ্রম এখন আমার ঠিকানা

সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করার নামেই পরিবার। সন্তাদের নিয়ে তিল তিল একটি সুন্দর পরিবার ঘুরে তুলেন মা-বাবা।

পরিবারের প্রতিটি সদস্য সুখে-শান্তিতেই থাকতে চায়; কিন্তু সে সুখ সবার কপালে সইলেও কেউ কেউ পরিবারের সেই বন্ধনটা পায় না। এজন্য নানা কারণে আপন নিবাস ছেড়ে যেতে হয় পরিবারের সবচেয়ে বয়সী লোকটির। আপন ঘরে থেকে তার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

প্রবীণরা পরিবারে সবার কাছ থেকে সেবা ও সহায়তা পেতে চায়। সমাজে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনসহ যত্ন নেয়ার একটি বিশেষ মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি চালু ছিল বাঙালি সমাজে।

কিন্তু বর্তমানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানা পরিবর্তনের ফলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। এজন্য পরিবারের প্রবীণরা হারাচ্ছে তাদের প্রতি ভালোবাসা, বাড়ছে অবহেলা আর বঞ্চনা।

যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, সময় কাটছে বৃদ্ধাশ্রমের আবদ্ধ গণ্ডির ভেতরে। পরম মমতা ও গভীর ভালোবাসায় সন্তানদের বড় করে একসময় বৃদ্ধ মা-বাবা সেই সন্তানের কাছেই হয়ে যান বোঝা। তাদের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। সরেজমিন বৃদ্ধাশ্রম ঘুরে তিন প্রবীণের চিত্র তুলে ধরা হল।

ঘটনা ১........................................

সরকারি চাকরিতে অবসরপ্রাপ্ত মো. আজমল হোসেন (ছদ্মনাম)। নিজের সবটুকু চেষ্টা দিয়ে ভালোভাবে মানুষ করিয়েছেন তার সন্তানদের। আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত তার তিন ছেলে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তার সন্তানরা আজ প্রতিষ্ঠিত।

মো. আজমল হোসেনের আজ সুখে-শান্তিতে বাস করার কথা। কিন্তু আজ তিনি সন্তানসন্তানিদের নিয়ে ভালো নেই। জীবনের শেষ বেলায় তার স্থান হয়েছে রাজধানীর একটি প্রবীণ নিবাসে। সেখানেই কাটে তার সকাল, দুপুর আর রাত। সকালের সূর্যের আলো দেখার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়।

কিন্তু চোখে ঘুম নেমে আসতে তার কেটে যায় গভীর রাত অবধি। তার দু’চোখের পাতায় ঘুম আসে না।

তাকে কেন বৃদ্ধাশ্রমে দেয়া হল এ প্রশ্নের জবাবে কিছুই বলতে চান না তিনি। তার কথার ধরনে বোঝা গেল সম্পত্তির কারণেই আজ তাকে থাকতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলেরা কৌশল করে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সবই হাতিয়ে নিয়েছে।

বৃদ্ধাশ্রমে তার ঠাঁই হয়েছে ছোট্ট একটি কক্ষে। অথচ একসময় তার বিত্তবৈভব দেখে এলাকাবাসী অবাক হতো। ছিল তার বিপুল ধন-সম্পদ। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুরতা, সন্তানদের অবহেলা আর ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে তিনি আজ বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিয়েছেন।

সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের অনাগত ভবিষ্যতকে আরও সমৃদ্ধশালী করার মানসে তিনি সন্তানদের নামে সব কিছু লিখে দিলেন, আর এটাই হল তার সর্বনাশের কারণ। সম্পদ লিখে দেয়ার পর সন্তানরা আর আগের মতো তার কাছে ভেড়ে না। সন্তানদের স্ত্রীরা তাকে অবজ্ঞা করে।

বৃদ্ধাশ্রমে বেশ ভালোই আছেন তিনি। তার বয়সী অনেকেই আছেন এখানে। শত কষ্ট-বেদনায় দিনের পর দিন যাদের পেটে-বুকে আগলে রেখেছিলেন সেসব বিবেকহীন সন্তান তাদের দূরে ঠেলে রেখেছেন। একবারও কী তারা ভেবে দেখেছেন যে, তাদের জীবনেও বার্ধক্য আসবে, আপনার সন্তান দ্বারা নিগৃহীত হতে পারেন তারাও।

ঘটনা ২ .............................................

বয়স ৬৫ ছুঁইছুঁই। পুরান ঢাকায় তার জন্ম। সর্বোচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাট চুকিয়ে সরকারের উচ্চপদে চাকরি করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।

অফিস এবং পরিবারের সবার মধ্যমণি হিসেবে ছিলেন সবসময়। কর্মজীবনে সফল এ নারী তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তাকে আমরা সুলতানা চৌধুরী বলে উল্লেখ করছি।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কর্মজীবনে সফল নারী সুলতানা চৌধুরীর শেষ জীবনে স্থান হয়েছে রাজধানীর একটি প্রবীণ নিবাসে। সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে একমাত্র সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠিয়েছিলেন।

হয়তো ভেবেছিলেন সন্তানের পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই জীবনের বাকিটা সময় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটাবেন তিনি। সন্তান বিদেশ যাওয়ার কিছুদিন পর সুলতানা চৌধুরী তার স্বামীকে চিরতরে হারান।

নিজের সম্বল বলতে পুরান ঢাকার বাড়ি বিক্রি করে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পুরো টাকাটাই তার ছেলের জন্য ব্যয় করেন।

তিনি ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ সময়ে অসহায় মাতার সহায় হবে তার আদরের নাড়িছেঁড়া ধন। কিন্তু বিধি বাম। এ নারীর শেষ আশ্রয়স্থল এখন প্রবীণ নিবাসেই। শেষ জীবনে পেনশনে পাওয়া সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে পরে নিঃসঙ্গ জীবন পার করছেন এ বৃদ্ধা।

শেষ জীবনে এসে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হবে সেটি কল্পনাতে ছিল না তার। সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের জন্য আনন্দে কাটবে তার শেষ সময়টা এমটাই ছিল তার ভাবনায়।

‘শেষ জীবনে সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকতেই চাইছিলাম। কিন্তু তার আর হল না। নাতি-নাতনি নিয়ে সারা ঘর মাতিয়ে রাখাই ছিল তার পরিকল্পনায়। কিন্তু ইচ্ছের সেই হইহুল্লো আজ নীরবতা হয়ে কানে বাজে। উল্টো বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে একাকিত্বে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

কিন্তু এমন কেন হল? নিজেকেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমিও তো নিজে এ প্রশ্ন করি বাবা। উত্তর পাই না। সৎ থেকে সততার সঙ্গেই ছেলেকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এমনটা কেন হল ভাবতেই কান্না আসে।

এখন কীভাবে কাটে একাকী জীবন? ‘সময় মতো নামাজ আদায় করি, ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করি। এছাড়া পেপার-পত্রিকাসহ কিছু বই আছে সেগুলো পড়ি। আর স্বামীর ছবি বুকে জড়িয়ে স্মৃতিচারণ করি।

জীবনের শেষ মুহূর্তেও ছেলে এবং আত্মীয়স্বজন ভালোবাসা না পেলেও বৃদ্ধাশ্রমে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই এ বৃদ্ধা মার। তার মতো আরও যারা আছেন তাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করে কেটে যায় একটি পর একটি দিন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter