কিস্তিবন্দি

  মাসুম বিল্লাহ ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পারুলের দেড় বছরের ছেলেটা সকাল থেকে টিয়া পাখির মতো ট্যাঁ ট্যাঁ করে যাচ্ছে। শান্ত করার চেষ্টা করেও কান্না থামান যাচ্ছে না। শেষে পারুল মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে বলে- মরার লাইগা চ্যাতছোস তুই! যত পারস চ্যাঁচা, আমিও খালি দেহুম।

মায়ের কথায় কান্নার জোর বাড়ে, চোখের জলের ঢল নামে ওইটুকুন ছেলের। পারুল ছেলেকে বারান্দায় ফেলে রেখে ঘরে গেল। ঘর থেকে সকালের এঁটো-বাসি থালা-বাসন নিয়ে বের হতেই বাচ্চাটা মায়ের শাড়ির পাড় টেনে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। কান্নার জোর আরও বাড়ে। পারুল কলতলায় গিয়ে থালা-বাসন মাটিতে আছড়ে ফেলে মনের যত খেদ প্রকাশ করতে লাগল- ভাঙা কপাল নিয়া জন্মাইছিলাম দুইন্নায়...শ্যাষ মরাডা মরছি এই সংসারে আইসা...

কলতলা থেকে এসে ছেলেকে কোলে নিতে কান্নার জোর কমে এল, কিন্তু মায়ের বুকে মুখ রাখতে পেরে অভিমানে ঠোঁট ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার সুর তুলল। পারুল ছেলের নাকে নাক ঘষে। খল খল করে হেসে ওঠে ছেলে। পারুল ছেলের গাল টিপে দেয়, বলে, ওলে আমার সোনা মানিক।

ছেলেকে কোলে নিয়ে মলিক বাড়ির পুকুর পাড়ে এল। মালঞ্চ শাক তুলতে তুলতে গুনগুন সুর বাজে পারুলের কণ্ঠে।

ঘরে রান্নার কিছু নেই। রাস্তা ও পুকুর পাড় থেকে শাকপাতা তুলে সপ্তাহের তিন-চারটা দিন তাকে চালাতে হয়। পারুলের স্বামী আফসার দুপুরের আগে আর ফিরবে বলে মনে হয় না। মানুষটা আগে এমন ছিল না। কাপড়ের ব্যবসা করে দিন বেশ কেটে যাচ্ছিল। ব্যবসায় লস খেয়ে প্রথম ধাক্কাটা লাগে সংসারে। ব্যবসা চালু রাখতে ‘গ্রাম-বাংলা সমিতি’ থেকে ১০ হাজার টাকা লোন নেয়। স্বল্প আয়ের সংসারে প্রতি সপ্তাহে লোন পরিশোধের সময় হিমশিম খায় আফসার। দিনে দিনে ধার-দেনা বাড়তে থাকে। ব্যবসায় আবার ধরা খায়- সততা দেখিয়ে ইন্ডিয়ান শাড়ি না-কিনে দেশি শাড়ি কিনেছিল ব্যবসা করার জন্য। কাস্টমারের চোখ ও মন ইন্ডিয়ান শাড়ির দিকে, তার দেশি শাড়ি পড়ে রইল। রাগে-অভিমানে ব্যবসা থেকে মন উঠে গেল। কিন্তু সমিতির লোন, ধার-দেনা, সংসার খরচের জালে ভালো ভাবেই জড়িয়ে গেল। না-খেয়ে থাকা গেলেও সমিতির লোন শোধ না-করে উপায় নেই। পালিয়ে বেড়ায় আফসার। ছুটা-কাজ করে সংসারে একবেলা খাবার জুটাতে পারলেও ধার-দেনা শোধ করার কোনো পথ জানা নেই। বাড়ি ফেরে রাত-বিরাতে। কোনো দিন হাতে চাল-ডাল থাকে, কোনো দিন থাকে না।

পুকুর পাড় থেকে শাক তুলে পারুল ঘরে ফিরতে দুপুর এলিয়ে পড়ে। চুলা জ্বালাতে শরীর টানে না তার। খাটে শরীর রাখতে ঘুমিয়ে পড়ে পারুল। বুকের সঙ্গে ছেলেটা লেপ্টে আছে। বিকাল ফুরিয়ে এসে সন্ধ্যার বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। বাঁশের কুলোয় রাখা মালঞ্চ শাক নেতিয়ে পড়েছে। এ বাড়ির একমাত্র মুরগিটি বারান্দার এক কোণে দুপুরের পর থেকে ঝিমুচ্ছে।

তখন সন্ধ্যা। চুলোয় ভাত ফুটছে। পারুল চুলোর আঁচ বাড়িয়ে দেয়। ভাতের মাড় একটা গামলায় নিয়ে তাতে এক দলা নুন মিশিয়ে খেয়ে নেয় পারুল।

আফসার ফেরে সন্ধ্যার পর। ক্লান্ত, বিধ্বন্ত। পারুল মিহি গলায় বলে, কিস্তির টাকা আনছো?

মাথা নাড়ে আফসার। যার অর্থ ‘না’। চিৎকার করে ওঠে পারুল। শেষে তার কণ্ঠ করুণ হয়ে বাজে, কান্না গলার ভেতর থেকে উঠে আসে। আফসার পারুলকে জড়িয়ে ধরে। সেও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে, পারু রে, টাকা কই পামু...কই পামু...তুই একটা ব্যবস্থা কর...কিস্তির ফ্যারা থেইকা বাঁচা মোরে..!

পারুল দুই হাতে আফসারের মুখ তুলে ধরে বলে, তোমার পারুলরে বেইচা দেও!

কি কস তুই?- হাহাকারের মতো শোনাল আফসারের কণ্ঠ।

তুমি চিন্তা কইরো না, আমি কিস্তির টাকা শোধ করুম...!

ক্যামনে?- আঁতকে ওঠে আফসার।

এই কতা মরার আগের দিনও আমারে আর জিগাইবা না...তোমার পোলার কসম দিলাম।

আফসার মুখ হাঁ করার সুযোগ পেল না, তার আগে পারুল বাঁ হাত দিয়ে চাপা দেয়। পারুলের চোখ বেয়ে জল উপচে পড়ছে। আফসারে চোখে-মুখে হাজারটা প্রশ্ন এসে ভিড় করে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×