কিশোর মুক্তিযোদ্ধা
jugantor
কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

  সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান  

১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার মুখে শুনেছিলাম, একাত্তরের সময় বশির কাকার বয়স ছিল চৌদ্দ কিংবা পনেরো। স্কুলের লেখাপড়ায় ছিলেন উদাসীন। একদিন ক্লাস ফোরে শিক্ষকের হাতে বেধম মার খেয়ে স্কুলের পড়ার ইতি টানেন। তারপর তার বাবার চায়ের দোকানে বসে যান। যখন তার তেরো বছর বয়স, আকস্মিকভাবে তার বাবা মারা যান। সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। বশির কাকার ছিল পত্রিকা পড়ার নেশা। তবে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়ে পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। রোজ হকার এসে এলাকার কয়েকটি বাসার পত্রিকা তার চায়ের দোকানে রেখে যেত। যাদের পত্রিকা, তারা এখান থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে বাসায় নিয়ে যেতেন। এ সুযোগে বিনা খরচে বশির কাকা পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতেন। তার পত্রিকা পড়ার অভ্যাসের কথা এলাকার অনেকেই জানতেন। ওই সময়ে সবার পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই তার চায়ের দোকানে এসে অনেকেই চা খাওয়ার পাশাপাশি দেশের খবরাখবর জানতে চাইতেন। তিনিও খুশি মনে যেটুকু জানতেন, সেটুকু সুন্দর করে বলতেন। এ কারণে এলাকায় তার আলাদা একটা কদর ছিল।

প্রতিদিন বশির কাকার চায়ের দোকানে অনেকের আনাগোনা। এলাকার যুবকরা তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জমিয়ে আড্ডা দেয়। আড্ডায় চলে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা। তিনি সবার কথাই কমবেশি শুনতেন। তবে বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হলে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। মাঝে মধ্যে নিজেও আলোচনায় যোগ দিতেন। এলাকার যুবকদের কাছে তিনি ‘বিবিসি নিউজ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক খবরাখবর তিনি এলাকার যুবকদের জানাতেন। সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে তার কথাগুলো শুনতেন এবং মূল্যায়ন করতেন। পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের পুরো ভাষণটি তিনি মুখস্থ করে ফেলেন। কেউ শুনতে চাইলে অনর্গল বলতে পারতেন। এলাকার স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন দেখলেই বলে উঠতেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি কিশোর হয়েও এলাকার স্বাধীনতাকামী যুবকদের বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেন। নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন।

নিজের পরিবারের ভার তার কাঁধে থাকায় তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে তিনি থেমেও থাকেননি, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছেন। এলাকার যেসব যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ ছিল। তিনি শত্রু পক্ষের খবরাখবর সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বশির কাকার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাকহানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিযোদ্ধারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ গেরিলা হামলা করে। এসব কথা গোপন থাকেনি। এলাকার ক’জন রাজাকার একদিন সন্ধ্যায় পাকহানাদার বাহিনী নিয়ে বশির কাকার চায়ের দোকানে আসে। তারা তার দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর তাকে গাড়িতে তুলে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিতে সেখানে চলতে থাকে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন। তবুও তিনি মুখ খুললেন না। পাক হায়েনারা এক রাতে ব্রাশফায়ার করে বশির চাচাকে হত্যা করে। তার লাশটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তারা শুধু বশির কাকাকে হত্যা করেই থেমে থাকেনি। রাজাকারের দল একদিন বশির কাকার বাড়িতে গিয়ে হামলা করে। তার ঘর-বাড়ি আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। বশির কাকা কিশোর হলেও খুব বিচক্ষণ ছিলেন। তাই শত্রু বাহিনী এলাকায় প্রবেশের পরেই তিনি তার মা ও দুই ভাইবোনদের নিরাপদে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তাই তারা সেই ভয়াল রাতে প্রাণে বেঁচে যান।

ঢাকা

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

 সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান 
১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার মুখে শুনেছিলাম, একাত্তরের সময় বশির কাকার বয়স ছিল চৌদ্দ কিংবা পনেরো। স্কুলের লেখাপড়ায় ছিলেন উদাসীন। একদিন ক্লাস ফোরে শিক্ষকের হাতে বেধম মার খেয়ে স্কুলের পড়ার ইতি টানেন। তারপর তার বাবার চায়ের দোকানে বসে যান। যখন তার তেরো বছর বয়স, আকস্মিকভাবে তার বাবা মারা যান। সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। বশির কাকার ছিল পত্রিকা পড়ার নেশা। তবে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়ে পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। রোজ হকার এসে এলাকার কয়েকটি বাসার পত্রিকা তার চায়ের দোকানে রেখে যেত। যাদের পত্রিকা, তারা এখান থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে বাসায় নিয়ে যেতেন। এ সুযোগে বিনা খরচে বশির কাকা পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতেন। তার পত্রিকা পড়ার অভ্যাসের কথা এলাকার অনেকেই জানতেন। ওই সময়ে সবার পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই তার চায়ের দোকানে এসে অনেকেই চা খাওয়ার পাশাপাশি দেশের খবরাখবর জানতে চাইতেন। তিনিও খুশি মনে যেটুকু জানতেন, সেটুকু সুন্দর করে বলতেন। এ কারণে এলাকায় তার আলাদা একটা কদর ছিল।

প্রতিদিন বশির কাকার চায়ের দোকানে অনেকের আনাগোনা। এলাকার যুবকরা তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জমিয়ে আড্ডা দেয়। আড্ডায় চলে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা। তিনি সবার কথাই কমবেশি শুনতেন। তবে বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হলে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। মাঝে মধ্যে নিজেও আলোচনায় যোগ দিতেন। এলাকার যুবকদের কাছে তিনি ‘বিবিসি নিউজ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক খবরাখবর তিনি এলাকার যুবকদের জানাতেন। সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে তার কথাগুলো শুনতেন এবং মূল্যায়ন করতেন। পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের পুরো ভাষণটি তিনি মুখস্থ করে ফেলেন। কেউ শুনতে চাইলে অনর্গল বলতে পারতেন। এলাকার স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন দেখলেই বলে উঠতেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি কিশোর হয়েও এলাকার স্বাধীনতাকামী যুবকদের বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেন। নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন।

নিজের পরিবারের ভার তার কাঁধে থাকায় তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে তিনি থেমেও থাকেননি, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছেন। এলাকার যেসব যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ ছিল। তিনি শত্রু পক্ষের খবরাখবর সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বশির কাকার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাকহানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিযোদ্ধারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ গেরিলা হামলা করে। এসব কথা গোপন থাকেনি। এলাকার ক’জন রাজাকার একদিন সন্ধ্যায় পাকহানাদার বাহিনী নিয়ে বশির কাকার চায়ের দোকানে আসে। তারা তার দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর তাকে গাড়িতে তুলে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিতে সেখানে চলতে থাকে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন। তবুও তিনি মুখ খুললেন না। পাক হায়েনারা এক রাতে ব্রাশফায়ার করে বশির চাচাকে হত্যা করে। তার লাশটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তারা শুধু বশির কাকাকে হত্যা করেই থেমে থাকেনি। রাজাকারের দল একদিন বশির কাকার বাড়িতে গিয়ে হামলা করে। তার ঘর-বাড়ি আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। বশির কাকা কিশোর হলেও খুব বিচক্ষণ ছিলেন। তাই শত্রু বাহিনী এলাকায় প্রবেশের পরেই তিনি তার মা ও দুই ভাইবোনদের নিরাপদে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তাই তারা সেই ভয়াল রাতে প্রাণে বেঁচে যান।

ঢাকা