বিষাদের ডাকবাক্স

  রোকেয়া রিক্তা ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খোকন সোনারে! দমটা বুঝি ফুরিয়ে এলো এবার। তোর লক্ষ্মী হয়ে যাওয়াটা আর দেখা হল না। যাওয়ার চিঠি দরজায় কড়া নাড়ছে বারবার। যেতেই হবে বুঝি।

চলে যেতে তে কোনো কষ্ট নেই রে মানিক! শুধু তোকে একলা ফেলে যেতে বড় কষ্ট রে। তুই যদি লক্ষ্মী হতিস একটু। দুনিয়ার কোনো মোহ তে মন টানে নারে। শুধুই তোর ভাবনায় মরণব্যাধি ক্যান্সারের যন্ত্রণাও আমার হার মানায়। তোর মা-হারা অসহায় মুখের ছবিটা ভাবতেই আমার স্বর্গের লোভও পালিয়ে যায় রে কলিজার আঁধার।

লক্ষ্মী বাপ আমার বল না একটু শান্ত হবি। যখন আমি থাকব না তখন দস্যিপনা করে সবার কাছে গালমন্দ খেয়ে গোমড়ামুখে কার কাছঘেঁষে বসে গল্প শুনতে চাবি।

বল না আমার জাদু, আমি যখন থাকব না তখন দস্যিপনা রেখে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে যাবি। এখন যেমন ঘুমের কোলে ঘুমিয়ে কত শান্ত তুই হয়ে আছিস। কোনো হইচই নেই, কোনো ঝগড়াঝাটি নেই। কোলাহল নেই। এমনি শান্ত হয়ে যাবি বল?

শোন না। আমি যখন পুকুরের ওই পাড়ে আমার অন্ধকার ঘরে ঘুমিয়ে থাকব তখন কোনো দিন হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে মন ভুলে যেন এখনকার মতো মা মা করে চিৎকার করে হাঁক পাড়িস নে।

তবে কিন্তু ওই একলা ঘরে আমার আর থাকা হবে না।

ওপাড়ার বাদড়মুখো ছেলেদের সঙ্গে আর খেলতে যাসনে খবরদার!! মার খেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ওই পুকুরের পাড় দিয়ে ঘরে ফিরবি, তখন তোর শরীরের কাটা জায়গায় হাত বুলাতে না পারলে আমি কবর দেশে ঘুমাব কি করে বল।

হীরে মানিকের ক্ষণি রে আমার! মার কথাটা শুনিস বাছা!

ডাঁশা পেয়ারার লোভে গোয়ালের চালে উঠিসনে যেন! চালের খোলা ভেঙে গেলে তোর বাবা খুব মারবে কিন্তু। দরজার হাতল ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবি তুই, তখন কবর দেশের বাস আমার অসহ্য হবে রে সোনা মানিক।

খুব খুব লক্ষ্মী হয়ে যাবি বল! পাকা জামের লোভে স্কুল পালিয়ে ভরদুপুরে টইটই করে রোদে ঘুরে বেড়াবি না বল?

ওদের নিতু পাগলিকে মারিস না যেন খবরদার!

হাবাগোবা মেয়েটা, বোঝেসোঝে কম, মারবি না কিন্তু। ওর মা তোর বাবাকে বলে মার খাওবে কিন্তু তোকে। ধুলো কাদা গায়ে বিছানায় পড়ে পড়ে কাঁদবি তুই। আমার নাড়িছেঁড়া বুকের মানিকের কান বেয়ে চোখের মুক্তা ঝরে ঝরে পড়বে শক্ত খাটের উপর, গড়াগড়ি খাবে!! আমি সহ্য করতে পারব না মোটেও।

বল না আমার পাখি! এ ঘুমানোর মতো শান্ত হয়ে যাবি তুই। কাউকে মারবি না, কারও গাছে চড়ে ফলমূল চুরি করবি না, স্কুল পালাবি না। সব পড়া ভালো করে মুখস্থ করবি না হলে তপন স্যার খুব মারবে কিন্তু, মনে আছে সে দিন হাতের ওপর কেমন কালচে দাগ পড়ে গেছিল।

খাবার বেলা হাঙ্গামা বাধাসনে যেন! একটু লক্ষ্মী হ রে। খাব খাব করে কুম্ভকর্ণের মতো করিস নে যেন। থালাটা কুড়িয়ে ও তো খাসনে দু’গাল মুখে দিতেই তো তোর রাক্ষুসে ক্ষিধে পালিয়ে যায়। থালার চারপাশে ভাতের বুননিটা তোর যে কবে যাবে! দয়াময় কার হাতে যে তোর দু’গাল ভাত যোটাবে কি জানি, সে ভাত বুননি দিয়ে ছড়াস না।

গল্পছাড়া খেতে অভ্যাস কবে হবে সোনা! আমি চলে গেলে হাজারটা গল্পের বিনিময়ে তোর পেটে ভাত ঢোকাবে কে ! আঃ হাঃ পানির মগটা সামলে রাখিস। পানিতে ঘর না ভাসিয়ে কেন যে খাওয়া হয় না তোর।

একটু লক্ষ্মী হ না বাবা, আমার রাজপুত্র লোকের গালমন্দ খেয়ে ছলছল চোখে দলছাড়া একলা একলা ঘুরে বেড়াবে, আমি সুখের ঘুম ঘুমাতে পারব না তো তবে।

রোগের কাছে হার মেনে যেদিন তোকে পর করে চলে যাব, যন্ত্রণাশূন্য হয়ে কবরের অন্ধকারে ঘুমাব, তখন তুই কেঁদে কেঁদে ফিরলে আমি কেমন করে থাকব বল?

ন্যাকা ছেলের মায়ের বকা খেয়ে মাঠের এককানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার হাসাহাসি, গড়াগড়ি দেখে অজান্তে হেসে উঠবি আবার দুখে হাসি মুখ মলিন করে ফেলবি, তখন আমি সইব কি করে!

সোনা মানিকের খনি আমার, বল না লক্ষ্মী হবি খুব ভালো, খুব শান্ত হয়ে যাবি। কেউ বকবে না, গালমন্দ করবে না তোকে। কারও ধমক খেয়ে শূন্য ঘরে মাকে খুঁজে চোখ ছলছল করবে না। তেমনই লক্ষ্মী হবি বল!

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.