অনিদ্রায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ

  ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ ২৭ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনিদ্রায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

‘ইনসমনিয়া’ শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতা। এটি একটি ভয়ঙ্কর এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। যে ব্যক্তি এ সমস্যায় না পড়েছেন তার পক্ষে ভয়াবহতা অনুভব করা অসম্ভব।

ইনসমনিয়া কী

ইনসমনিয়া হচ্ছে একটি অনিদ্রা জনিত রোগ বা এক ধরনের Sleep disorder যাতে ঘুমের পরিমাণ অথবা ঘুমের গুণগত মান এদের যে কোনো একটি বা উভয়টিতেই সমস্যা থাকে। একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ দিনের মধ্যে গড়ে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমায়।

এটি একটি স্বাভাবিক অবস্থা। কিন্তু যেসব রোগী ‘ইনসমনিয়া’তে ভোগেন তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের পরিমাণ অনেক কমে যায় কিংবা ঘুমানোর পরও রোগী ফ্রেশ ফিল করেন না বা রোগীর মধ্যে একটা ঝিমুনি ভাব কাজ করতে থাকে। রোগীরা সাধারণত তিনভাবে এ ঘুমের সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজির হতে পারেন, যেমন-

* ঘুম আসতে সমস্যা হয়। রোগী বিছানায় গেলেন, এপাশ-ওপাশ করছেন কিন্তু ঘুম আসছে না। কারও কারও ক্ষেত্রে সারারাতই এভাবে কেটে যায়।

* স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায়। এমনকি রোগী সাধারণত যে সময় ঘুম থেকে ওঠেন তার ২/৩ ঘণ্টা আগেই ঘুম ভেঙে যায় এবং এরপর আর ঘুম আসতে চায় না।

* রাতে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙে যায় এবং আবার ঘুম আসতে সমস্যা হয়। একে বলে Fragmented Sleep.

প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে তিন রাত এবং একটানা কমপক্ষে তিন মাস উপরোক্ত অবস্থা চলতে থাকলে তাকে আমরা ইনসমনিয়া ডিসঅর্ডার বলি।

ইনসমনিয়া মূলত দু’রকম

* প্রাইমারি ইনসমনিয়া- যার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

* সেকেন্ডারি ইনসমনিয়া-ইনসমনিয়া যখন অন্য কোনো কারণে অর্থাৎ কোনো মানসিক বা শারীরিক রোগের কারণে হয়। যেমন-

* মানসিক চাপ (stress disorder), উদ্বেগ (Anxiety বা Anxiety Disorder), টেনশন ইত্যাদি।

* Depressive disorder বা বিষণ্ণতা রোগ।

* Obsessive Compulsive disorder (OCD) বা শুচিবায়ু।

* মাদকাসক্তিসহ অন্য আসক্তি যেমন, ইন্টারনেট অ্যাডিকশন, ফেসবুক অ্যাডিকশন ইত্যাদি।

আরও নানাবিধ লঘু মানসিক ব্যাধি বা Minor Psychiatric disorder এর কারণে ইনসমনিয়া দেখা দিতে পারে।

* অন্যান্য Major Psychiatric disorder বা গুরুতর মানসিক ব্যাধি- যেমন, সিজোফ্রেনিয়া, ডিলিউশনাল ডিসঅর্ডার, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।

* শারীরিক অসুস্থতা যেমন, অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগ, বাত ব্যথা জনিত রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ও অনেক মায়েদেরও ইনসমনিয়া বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়।

আবার, ইনসমনিয়া ডিস অর্ডার নিজেই একটি রোগ।

ইনসমনিয়া থেকে মুক্তির উপায় কী

ইনসমনিয়া দু’রকম। প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি।

প্রাইমারি ইনসমনিয়ার চিকিৎসা বিষয়ে আসি। যেহেতু এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া অনেক সময়ই সম্ভব হয় না, তাই এর চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল এবং কষ্ঠসাধ্য। প্রাইমারি ইনসমনিয়ার চিকিৎসা প্রক্রিয়াটিকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি।

* সাইকোথেরাপি।

* ফার্মাকোথেরাপি।

প্রথমে সাইকোথেরাপি প্রসঙ্গে আসি। বিভিন্ন ধরনের সাইকোথেরাপি বিভিন্নভাবে এবং ধাপে প্রয়োগ করা যায়। যেমন-

* এ রোগীদের ঘুম সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং ধারণা থাকে। প্রথমেই আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করতে হবে।

* Cognitive behavior therapy (CBT) একটি কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি।

* Sleep restriction therapy.

* Relaxation therapy.

* Sleep hygiene- এটি খুবই কার্যকরী একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। পাঠকদের সুবিধার্থে Sleep hygiene নিয়ে কিছু আলোচনা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। Sleep hygiene এর ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কাজগুলো অতীব জরুরি।

* সন্ধ্যার পর চা কফি ইত্যাদি Stimulant বা উত্তেজক জাতীয় কিছু খাবেন না।

* রাতের খাবার রাত ৯-১০টার মধ্যে শেষ করে ফেলবেন। রাতের বেলা ভারি খাবার বা Heavy meal avoid করবেন।

* প্রতি রাতে একই সময় ঘুমাতে যাবেন এবং সকালে একই সময় ঘুম থেকে উঠবেন।

* বিছানাকে শুধু ঘুমের জন্য বা বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করবেন। বিছানায় শুয়ে ফেসবুক, মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না।

* যদি ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না আসে তবে বিছানা ছেড়ে ওঠে পড়বেন। Relaxation বা Relaxing জাতীয় অন্য কাজ করবেন। Meditation করতে পারেন। ঘুম এলে পর ঘুমাতে যাবেন। যত দেরিতেই ঘুম আসুক না কেন সকালে পূর্ব নির্ধারিত একই সময় ঘুম থেকে ওঠবেন।

* ঘুমুতে যাওয়ার আগে গোসল করে নিলে ভালো হয়।

বিভিন্ন রকম সাইকোথেরাপি যখন পরিপূর্ণ ভাবে কাজ না করবে বা ব্যর্থ হবে তখন অবশ্যই ফার্মাকোথেরাপি বা ঔষধ প্রয়োজন হবে। মনে রাখবেন অপর্যাপ্ত ঘুম বা ইনসমনিয়া আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মকে ব্যাহত করবে। এ ক্ষেত্রে আমরা স্বল্প মেয়াদে অথবা ক্রনিক ইনসমনিয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে কিছু ঔষধ ব্যবহার করি। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কখনোই এ জাতীয় ঔষধ খাবেন না।

সেকেন্ডারি ইনসমনিয়ার চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে সহজ। চিকিৎসার মাধ্যমে ইনসমনিয়ার কারণটি দূর করতে পারলে ঘুম স্বাভাবিক হয়ে আসে। এক্ষেত্রেও স্বল্প মেয়াদে কিছু সিডেটিভ জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা প্রয়োজন। তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।

শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে গেলে পর্যাপ্ত এবং পরিতৃপ্ত ঘুম একান্ত প্রয়োজন। তাই ইনসমনিয়ার কার্যকরী চিকিৎসা প্রয়োজন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপতাল, ঢাকা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×