জয় করবো মানসিক চাপ

  ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনে চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করি, বৈরী পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করি। কখনও আমরা এতে সফল হই, আবার কখনও খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হই। যখন বৈরী পরিস্থিতিতে, প্রতিকূল পরিবেশে আমরা দিশেহারা হই, অতিরিক্ত অস্থির হই তখনই মনের মধ্যে এক ধরনের অশান্তি, চাপ অনুভব করি। কাজেই মানসিক চাপ হচ্ছে কোনো বৈরী পরিস্থিতিতে মনের এমন একটা কষ্টকর, অশান্তিময় বা দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা যাতে মনের স্বাভাবিক কার্যক্রম, গতিধারা ব্যাহত হয়।

জীবনের বিভিন্ন ঘটনায়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ নানাভাবে মানসিক চাপ অনুভব করে। আবার একই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার চাপ অনুভব করে এবং কে কতটুকু মানসিক চাপ অনুভব করবেন তা নির্ভর করে তিনি কিভাবে সেই ঘটনাকে দেখছেন অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। সব সময় যে বৈরী পরিবেশ বা প্রতিকূল পরিস্থিতিই আমাদের চাপে ফেলে তা নয়, কখনও কখনও অনেক সুখের ঘটনা বা পরিস্থিতিও মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। যেমন ধরা যাক বিয়ে। বিয়ে অবশ্যই মানুষের জীবনে একটি সুখময় ঘটনা কিন্তু একই সঙ্গে এটা প্রচণ্ড মানসিক চাপেরও সৃষ্টি করে। Social readjustment rating scale (SRRS) অনুযায়ী বিয়েতে চাপের মাত্রা ৫০। চাপের ফলে আমাদের মনের জগতে দুধরনের Response হতে পরে। একটা হচ্ছে উদ্বেগ বা Anxiety এবং আরেকটা হচ্ছে Depression বা বিষণ্ণতা। Stress বা চাপ যখন কোনো Danger বা বিপদজনক পরিস্থিতির কারণে হয় তখন তা উদ্বেগ বা Anxiety সৃষ্টি করে। চাপ যখন কোনো loss বা ক্ষতির কারণে হয় তখন তা বিষণ্ণতার সৃষ্টি করে। যে সব ঘটনাকে আমরা Danger বা loss event বলে মনে করি এবং চাপ অনুভব করি সবসময়ই যে তা সত্যিকারের বিপদ বা ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে তা কিন্তু নয়। অনেক সময়ই আমরা ভুল ভাবে ঘটনা গুলোকে দেখি, ব্যাখ্যা করি এবং চাপ অনুভব করি। এ ব্যাখ্যার কাজটি করে আমাদের cognitive process। প্রশ্ন হচ্ছে cognition বলতে আমরা কী বুঝি? সোজা কথায় cognition বা cognitive process হচ্ছে আমাদের Thinking process বা আমাদের চিন্তার প্রক্রিয়া। জীবনের ঘটনা প্রবাহের দিকে খেয়াল করলে দেখবেন চরম খারাপ বা পরম ভালো ঘটনা জীবনে খুব কমই ঘটে। অধিকাংশ সময়ই মাঝামাঝি বা মধ্যবর্তী কোন রাস্তায় জীবন চলে। কিন্তু আমার চিন্তার প্রক্রিয়া অধিকাংশ বৈরী পরিস্থিতিকেই চরম খারাপ বলে চিহ্নিত করে। ফলে আমি ঘটনার বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি চাপ অনুভব করি। অর্থাৎ কোনো ঘটনা যতটুকু না ভয়ঙ্কর বা ক্ষতিকর বা দুঃখময় আমার অন্তর জগত, আমার চিন্তার প্রক্রিয়া তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ রূপে চিহ্নিত করে, ফলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভূত হয়। একে বলে cognitive distortion বা cognitive biasness। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই Distorted cognition বা Biased cognition আমাদের মানসিক চাপকে মানসিক ব্যধির পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাকে বলে Stress disorder বা চাপ জনিত মানসিক ব্যধি। কেননা মানসিক চাপ স্বাভাবিক জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জীবনে সমস্যা, চাপ, উদ্বেগ থাকবেই। আমাদের এর সঙ্গে cope করতে হবে, adjust করতে হবে। যখন এই চাপের সঙ্গে আমি পড়ঢ়ব করতে পারব না বা খাপ খাইয়ে চলতে পারব না এবং এটা আমার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন পারিবারিক, সামাজিক, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে পারফরম্যান্সসহ জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তখন এটা শুধু মানসিক চাপ নয়, এটা চাপ জনিত মানসিক ব্যধি বা Stress disorder।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মানসিক চাপকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করব কিংবা এই চাপ যখন disorder বা ব্যধিরূপে প্রকাশ পাবে তখন এর চিকিৎসা কী?

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, আমি কতটুকু চাপ অনুভব করব তা নির্ভর করে ঘটনা বা event এর প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বা আমার cognitive process এর ওপর। কাজেই প্রথমেই আমার সেই cognitive process কে ঠিক করতে হবে। জীবন সমস্যা সংকুল। পৃথিবীতে চলতে গেলে সমস্যা থাকবেই। কিন্তু এটা আদৌ কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে আমরা প্রত্যেকেই চাই ‘আমাদের জীবনে যদি কোনো সমস্যা না থাকত!’ যখন আমি সমস্যা মুক্ত একটা জীবন কামনা করি, কল্পনা করি তখনই আমার মূল সমস্যা তৈরি হয়। কারণ তখন আসলে আমি আর সমস্যা বা প্রবলেমকে মোকাবেলা করার জন্য, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকি না। কিন্তু যদি আমি এভাবে চিন্তা করি যে, জীবনে সমস্যা থাকবেই, আমি আমার মতো করেই সমস্যার সমাধান করব। সব ক্ষেত্রেই যে আমি সফল হব এমন কোনো কথা নেই, কিন্তু আমি আমার মতো করে চেষ্টা করব। সব ক্ষেত্রেই জিততে হবে, সফল হতে হবে এ শক্ত অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে জীবন শুধু কতগুলো জয়-পরাজয় বা সফলতা-বিফলতার সমষ্টি নয়। জীবন হচ্ছে একটা বিশাল ক্যানভাস যাতে আপনি তুলির আঁচড়ে বিভিন্ন রকম ছবি আঁকবেন-আনন্দের সঙ্গে আঁকবেন, আপনার মতো করে আঁকবেন। কাজেই প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে যদি আমি একটা সিদ্ধান্ত নেই যে, আজকে সারাদিন আমাকে অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে এবং আমি আমার মতো করে তা করব, হয়তো শতভাগ সফলতা আসবে না কিন্তু আমার মতো আমি চেষ্টা করব। তখন আমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম। এটা হচ্ছে চর্চার ব্যাপার। প্রতিদিন চেষ্টা করুন, চর্চা করুন এক সময় আপনি অবশ্যই একজন দক্ষ এবং পরিণত জীবন যোদ্ধায় পরিণত হবেন।

যদি আপনার মানসিক চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, আপনি তাকে আর বহন করতে পারছেন না, আপনার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। সাইকিয়াট্রিস্ট তখন আপনার সমস্যাটির সঠিক ডায়াগনোসিস করবেন এবং এর প্রতিকারের ব্যবস্থা নেবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এবং কখন মানসিক চাপ জনিত ব্যধির কারণে আপনি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবেন?

প্রথমে আসা যাক কী কী লক্ষণ দেখা দিলে আপনি সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হবেন, অর্থাৎ চাপ জনিত মানসিক ব্যধির লক্ষণগুলো কী কী?

প্রথমত এ রোগের উৎপত্তির জন্য একটি Stressor বা কোনো চাপ উদ্দীপক ঘটনা থাকবে যার সঙ্গে রোগী খাপ খাওয়াতে পারবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোগীর বিভিন্ন মানসিক এবং শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ পাবে। এদের মধ্যে প্রধান কিছু লক্ষণ হচ্ছে-

* বুক ধড়ফড় করা

* বুকে চাপ চাপ অনুভব হওয়া

* সারাক্ষণ মানসিক অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করা

* মাথা ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা

* মুখ শুকিয়ে আসা

* ঘুমের সমস্যা

* বিষণ্ণতা

* খাবারে অরুচি

* খিটখিটে মেজাজ

* প্রয়োজনীয় কাজ, ঘটনা ভুলে যাওয়া

* কোন কিছুতে মনযোগ দিতে সমস্যা হওয়া ইত্যাদি

যারা ক্রনিক বা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপে ভুগছেন বা চাপ জনিত মানসিক রোগে ভুগছেন তারা সময় মতো চিকিৎসা না করালে তাদের অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যাও তৈরি হয় যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ বা হার্টের সমস্যাসহ অন্য শারীরিক সমস্যা। মানসিক চাপ জনিত সমস্যার Biological basis সম্বন্ধে কিছু জানা প্রয়োজন। এ সমস্যার সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের বেশকিছু নিউরোনাল সার্কিট যেমন- Cortico-striato-thalamo-cortical (CSTC) tract Gi abnormal activity, নিউরোট্রান্সমিটার যেমন- ডোপামিন, সেরোটনিন ইত্যাদির পরিমাণগত তারতম্যসহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সমন্বিত কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। প্রচণ্ড Stress বা মানসিক চাপ আমাদের শরীরের আরেকটি চধঃযধিু যেমন- Hypothalamo-pituitary-adrenal (HPA) axis এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায় যা অনেক শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপনের জন্য অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা মানসিক চাপজনিত ব্যধির সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

প্রচলিত চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে-

* Pharmacotherapy * Psychotherapy

এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা মানসিক চাপ জনিত ব্যধি থেকে মুক্ত করা সম্ভব। তাকে সুন্দর- আনন্দময় জীবনের সন্ধান দেয়া সম্ভব।

তাই সব শেষে বলতে হয় অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা চাপ জনিত মানসিক ব্যধিকে অবহেলা করবেন না। বরং এর নিরাময়ের ব্যবস্থা নিন, সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যপক, ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ঢাকা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×