ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি

  অধ্যাপক ডা. মো. রাশিদুল হাসান ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি

সাতার কাটা শিখলে যেমন পারা যায় ঠিক তেমনি ইনহেলার ব্যবহার শিখলে সহজে পারা যায়।

একজন রোগীর একই ধরনের ইনহেলার ব্যবহার করা উচিত। যেমন পাউডার হলে সবগুলো পাউডার ইনহেলার। গ্যাসের হলে সবগুলো গ্যাস জাতীয় ইনহেলার।

আমাদের দেশে সাধারণত ৩ ধরনের শ্বাসের ওষুধ পাওয়া যায়-

* মিটার ডোজ ইনহেলার বা পাফার

* ড্রাই পাউডার ইনহেলার

* নেবুলাইজার।

মিটার ডোজ ইনহেলার (পাফার) কীভাবে কাজ করে

মিটার ডোজ ইনহেলার বা পাফার জাতীয় ইনহেলারে ওষুধ উচ্চচাপে একটি ধাতব পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এই জাতীয় ইনহেলারে চাপ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হালকা কুয়াশার মতো ওষুধ তৈরি হয় যা রোগী নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে টেনে নেয়। এ ইনহেলারগুলো ভালো কাজ করে যদি এর সঙ্গে একটা চোঙ্গা বা স্পেসার লাগিয়ে তার মাধ্যমে ওষুধ শ্বাসে নেয়া হয়।

মিটার ডোজ ইনহেলার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়

* ইনহেলারের ক্যাপ খুলে নিন

* ইনহেলারটি উল্টা করে ধরে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিন।

* আপনার চিবুকটি উঁচু করে সোজা সামনে তাকান

* ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলুন

* ইনহেলারের মাউথপিস দুই পাটি দাঁতের ভেতর স্থাপন করে ঠোঁট দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরুন যাতে বাতাস বের হওয়ার জন্য কোনো ছিদ্র না থাকে।

* ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে শুরু করুন এবং ক্যানিস্টারে শক্ত করে চাপ দিন। ফস শব্দ করে ওষুধ বের হয়ে আসবে- আপনি ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে লম্বা শ্বাস নিন।

* মুখ থেকে ক্যানিস্টার বের করে ফেলুন। যদি সম্ভব হয় অন্তত ১০ সেকেন্ড শ্বাস বন্ধ করে রাখুন।

* ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলে দিন। শ্বাস নেয়ার সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়া জরুরি। শ্বাস যেভাবেই ফেলুন নাক, মুখ দিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

* আপনার আরও ওষুধ প্রয়োজন হলে ২-৮ বার পর্যন্ত পুনরায় করুন।

* ইনহেলারে পুনরায় ক্যাপটি লাগিয়ে নিন।

কখন বুঝবেন ওষুধ শেষ হয়ে গেছে

কতগুলো ইনহেলারে ডোজ কাউন্টার আছে। ডোজ ‘০’ হলে বুঝতে হবে ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। ওষুধ শেষ হয়ে গেলে স্প্রে খুব ধীর গতিতে বের হয়। ঝাঁকালে হালকা এবং খালি অনুভব করা যায়।

যে ইনহেলারের ওষুধগুলো নিয়মিত দৈনিক ১ থেকে ৪ বার নিতে হয়, সেগুলো হিসাব করে বলা যায় একটি ইনহেলার কতদিন চলবে। তাই নিয়মিত নেয়ার ইনহেলারগুলো ব্যবহারের আগে হিসাব করে নিন। যেমন- একটি ১২০ পাফের ইনহেলার যদি দৈনিক ৪ চাপ ব্যবহার করা হয় তাহলে ১ মাস চলবে, যদি দৈনিক ২ চাপ ব্যবহার করা হয় তাহলে ২ মাস অথবা ১ চাপ দৈনিক ব্যবহার করলে ৪ মাস চলবে।

শুরুর দিনে তারিখ লিখে রাখুন এবং নিয়মিত নেয়ার ওষুধ গ্রহণ করতে ভুল করবেন না। নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার সিওপিডি রোগে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।

ইনহেলার পরিষ্কার করবেন কীভাবে

ব্যবহারের পর মাউথপিস পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন। পাফার থেকে ঠিকমতো ওষুধ বের হলে আর কোনো কিছু করার দরকার নেই। পাফারের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে প্লাস্টিকের বাইরের আবরণটি ধাতব ক্যানিস্টার থেকে আলাদা করে কলের পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ঝেড়ে বাড়তি পানি ফেলে দিয়ে শুকিয়ে নিন। ধাতব ক্যানিস্টারটি কখনও ধুবেন না।

মিটার ডোজ ইনহেলার (পাফার ইনহেলার) ও স্পেসার

পাফার থেকে সরাসরি যেমন শ্বাসে ওষুধ নেয়া যায় আবার স্পেসারের মাধ্যমে পাফার থেকে শ্বাসে ওষুধ নেয়া যায়। স্পেসার ২ ধরনের। বড় এবং ছোট স্পেসার।

কীভাবে স্পেসার কাজ করে

স্পেসারের কাজ হল শ্বাসে নেয়ার আগে ইনহেলার থেকে স্প্রে হওয়া ওষুধ কিছু সময়ের জন্য স্পেসারের ভেতরে ভাসমান অবস্থায় ধরে রাখা। এর সুবিধা হল- রোগী ধীরে ধীরে শ্বাসে ওষুধ নেয়ার সুযোগ পায় এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই ওষুধ শ্বাসে টেনে নিতে পারে। স্পেসারের মাধ্যমে ওষুধ শ্বাসে নিলে স্পেসার ছাড়া ওষুধ নেয়ার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি ওষুধ শ্বাসে যায়।

স্পেসারের মাধ্যমে ওষুধ নিলে গলায় ওষুধের কারণে অস্বস্তি অনুভব হয় না। মুখে বা গলায় ফাংগাসের সাদা আস্তর এবং মুখে, জিহ্বা বা গলায় ঘা হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। বাজারে অনেক নকল স্পেসার পাওয়া যায় যেগুলোর ভেতর দিয়ে ওষুধ ঠিকমতো শ্বাসনালীতে যায় না। আসল স্পেসারগুলোতে একটা কার্যকরি ভাল্ব থাকে। এসব স্পেসার দিয়ে শ্বাস নিলে বাতাস স্পেসার থেকে ফুসফুসে ঢুকে কিন্তু শ্বাস স্পেসারে ফেললে ভাল্ব থাকার কারণে বাতাস স্পেসারের মধ্যে ঢুকতে পারে না।

জরুরি অবস্থায় স্পেসারের মাধ্যমে ৫ মিনিট পরপর ৫ চাপ করে শ্বাসে উপশমকারী ওষুধ নিতে হয় এবং অন্তত ১ থেকে ৫ বার নিতে হয় যা নেবুলাইজারের মাধ্যমে শ্বাসে ওষুধ দেয়ার মতো কার্যকরী।

স্পেসারের সঙ্গে পাফার ব্যবহার

* গুঁড়া সাবান দিয়ে স্পেসারটি ধুয়ে শুকিয়ে নিন। স্পেসারের ভেতর মুছবেন না।

* সোজা হয়ে বসুন বা দাঁড়ান

* স্পেসারের ব্যবহারের আগে স্পেসারটি ঝাঁকিয়ে দেখে নিন। বুঝে নিন ভাল্বটা কার্যকরী আছে।

* ইনহেলারটি উল্টা করে, খাড়া ভাবে ধরুন, ক্যাপটি মুখে নিন। ভালোভাবে ঝাঁকান।

* ইনহেলারের মাউথপিস স্পেসারের নির্দিষ্ট স্থানে ঢুকান যা মাউথপিসের ঠিক উল্টা দিকে থাকে।

* স্পেসারের মাউথপিস দাঁতের মাঝে স্থাপন করুন এবং ঠোঁট দিয়ে মাউথপিস এভাবে চেপে ধরুন যাতে কোনো ফাঁক না থাকে।

* ঘাড়টি পেছন দিকে সামান্য হেলিয়ে রাখুন।

* ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলুন।

* ইনহেলারটিতে একটা চাপ দিন। এরপর ধীরে ধীরে অন্তত ৫ সেকেন্ড শ্বাস মুখ দিয়ে ফুসফুসে টেনে নিন এবং অন্তত ১০ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন। এবার ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলুন, আবার ধীরে ধীরে শ্বাস টেনে নিন। ২ থেকে ৪ বার এভাবে শ্বাস নিন এবং ফেলুন।

* অন্তত ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন পরবর্তী ডোজ ওষুধ শ্বাসে নেয়ার আগে।

স্পেসার পরিষ্কার করবেন কীভাবে

* মাসে অন্তত ১ বার স্পেসারের অংশগুলো খুলে ফেলুন।

* পানির সঙ্গে গুঁড়া সাবান মিলিয়ে তারপর সেই পানি দিয়ে স্পেসারের অংশগুলো ধুয়ে ফেলুন।

* এরপর স্পেসার আর সাধারণ পানি দিয়ে ধুবেন না।

* স্পেসারের ভেতরে লেগে থাকা গুঁড়া সাবানের কণা ওষুধ শ্বাসে নেয়ার সময় ওষুধের কণাকে বাতাসে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।

* কখনও ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়ার পর শুকনা কাপড় দিয়ে স্পেসার মুছবেন না অথবা স্বাভাবিক পানি দিয়ে ধুবেন না।

নেবুলাইজার

এটি একটি মেশিন যার ভেতর চাপযুক্ত বাতাস শিশির কণার মতো প্রবাহিত হয় তরল ওষুধের ভেতর দিয়ে। এ বাতাসের চাপে সূক্ষ্ম শিশির কণার মতো ওষুধের কুয়াশা তৈরি হয়- যা রোগী শ্বাসে টেনে নেয়। এই মেশিনগুলো সাধারণত ইলেকট্রিসিটি দিয়ে চলে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাটারি দ্বারা পরিচালিত হয়।

একই মেশিন একাধিক রোগী ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে যদি করতেই হয় ভালোভাবে পরিষ্কার করে করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে মাউথপিস ব্যবহার না করে ফেসমাস্ক ব্যবহার করা উত্তম।

নেবুলাইজার ব্যবহার পদ্ধতি

শুকনা এবং পরিষ্কার মেশিন, ফেসমাস্ক অথবা মাউথপিস, নেবুলাইজার এ ওষুধের পাত্র টিউব ব্যবহার করতে হবে।

নেবুলাইজার মেশিনের ব্যবহার

* মেশিনটি একটি শক্ত জায়গায় রাখুন। যেমন- টেবিল বা কাঠের চেয়ারের ওপর।

* নেবুলাইজার ওষুধ পাত্রে পরিমাণ মতো ওষুধ ঢালুন।

* নেবুলাইজার মেশিনের সঙ্গে টিউবের মাধ্যমে নেবুলাইজার পাত্র, মাউথপিস বা ফেসমাস্ক লাগিয়ে নিন।

* মাউথপিস মুখের ভেতর পুরে নিন বা মাস্ক মুখের ওপর ধরুন।

* সোজা হয়ে বসুন, নেবুলাইজার মেশিন চালু করুন। ধীরে ধীরে শ্বাস নিন ও ফেলুন। ওষুধের জলীয় কুয়াশা বা ঠাণ্ডা জলীয় বাষ্প শ্বাসের মাধ্যমে ভেতরে যাচ্ছে আর আসছে। এভাবে পুরা ওষুধ শ্বাসে প্রবেশ করতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগবে।

* ওষুধ শেষ হলে মেশিনের সুইচ বন্ধ করুন।

নেবুলাইজার মেশিন কীভাবে পরিষ্কার রাখবেন

* প্রতিবার ব্যবহারের পর মাউথপিস, ফেসমাস্ক এবং ওষুধের পাত্রটি ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।

* মেশিন সংরক্ষণের আগে মেশিনের প্রতিটি অংশ শুকিয়ে নিন। ভেজা বা পানিযুক্ত কোনো অংশ সংরক্ষণ করলে সেই পানির ভেতর রোগজীবাণু বাসা বাঁধতে পারে। ফলে নেবুলাইজারে শ্বাসে ওষুধ নেয়ার পর শ্বাসনালীতে বা ফুসফুসে নিউমোনিয়া বা ব্রংকাইটিস দেখা দিতে পারে।

* মেশিনের প্রতিটি অংশ শুকনা রাখুন।

* টিউবগুলো পানি দিয়ে ধুবেন না। শুধু টিউব নেবুলাইজারে লাগিয়ে কিছুক্ষণ নেবুলাইজার মেশিন চালান। ফলে টিউবের ভেতর কোনো জলীয় বাষ্পের কণা বা ওষুধের কণা থাকলে বাতাসের প্রবাহে পরিষ্কার হয়ে যাবে। টিউবের রং পরিবর্তন হলে টিউব বদলে ফেলুন।

* প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১ বার নেবুলাইজারের ওষুধ পাত্রটি, মাউথপিস, ফেস মাস্ক একটা গামলা জাতীয় পাত্রে নিন। এরপর এই পাত্রে ১/২ পরিমাণ ভিনেগার ১/২ পানি দিয়ে কিছু সময় ভিজিয়ে রাখুন (১৫ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট) তারপর ট্যাপের পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।

* ৩ মাস পরপর নেবুলাইজার টিউব, নেবুলাইজারের ওষুধের পাত্র, ফেস মাস্ক বা মাউথ পিস বদলে ফেলুন।

লেখক : বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইনজিনিয়াস হেলথকেয়ার লি: (পালমোফিট), শ্যামলী, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×