সাইনোসাইটিস চিকিৎসার আদ্যোপান্ত

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ডা. রফিক আহমেদ

নাক ও চোখের চারপাশে হাড়ের ভিতরের বায়ুপূর্ণ কুঠুরিকে সাইনাস বলা হয়। যখন এই সাইনাসগুলোতে প্রদাহ হয়- তখন তাকে বলা হয় সাইনোসাইটিস। আইটিস অর্থ ইনফ্লামেশন। প্রধান সাইনাসগুলো জোড়ায় জোড়ায় থাকে।

কপালের দুই পাশে ২টি ফ্রন্টাল সাইনাস, চোখের নিচে দুই পাশের দুইটিকে ম্যাক্সিলারি সাইনাস, মাথার কংকালের মধ্যে স্ফিনয়ডাল এবং ইথময়ডাল সাইনাস রয়েছে। ইথময়ডাল সাইনাসের সংখ্যা অধিক এবং তা সংখ্যা (১০ থেকে ১৩)টি পর্যন্ত হতে পারে। সাইনাসগুলোর সঙ্গে মধ্য কর্ণের এবং নাকের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে।

এদের মূল কাজ- বায়ুকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করা, মাথার হাড়কে হালকা রাখে। শব্দ এবং গলার স্বর নিয়ন্ত্রণ করে, দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে ইত্যাদি। মাথার কংকালের মধ্যে যদি এই বাতাস না থাকতো তাহলে এই মাথা নিয়েই আমাদের চলাচল করা সম্ভব হতো না অর্থাৎ মাথাকে হালকা রাখে এই সাইনাসগুলো।

সাইনাসে প্রদাহ হলে নাক দিয়ে সর্দি পড়তে পারে মাথা ব্যথা করতে পারে। সাইনাসের মধ্যে পুঁজ জমতে পারে, টিউমার হতে পারে ইত্যাদি। সাইনোসাইটিসকে বিভিন্ন কারণে বিজ্ঞজনেরা রাইনো (নাক) সাইনোসাইটিস বলছেন- যদিও একথার মধ্যে মতভেদ আছে।

যদি কারও সাইনোসাইটিস ১২ সপ্তাহের বেশি সময় কাল সমস্যা করে তখন তাকে ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদি) সাইনোসাইটিস বলা হয়। এই সমস্যা আবাল-বৃদ্ধি-বনিতা সবারই হতে পারে। এই সমস্যায় নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, মাথা ধরা, মাথা ব্যথা করতে পারে। সাধারণত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে সাইনাসজনিত সমস্যা হয়ে থাকে।

ফাংগাস, অ্যালার্জিজনিত কারণেও সাইনোসাইটিস সৃষ্টি হয়। রিস্ক ফ্যাক্টরের সংখ্যা এক বা একাধিক। যার মধ্যে অন্যতম নাকের হাড় বাঁকা, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, পলিপাস, অ্যাজমা, এসপিরিন জাতীয় ওষুধ। প্রকৃতি থেকে ডাস্ট অর্থাৎ ধুলাবালি, কলকারখানার ধোঁয়া, সুগন্ধি, ঝাঁঝাল গন্ধ, মরিচের গুঁড়া, ধূমপান, দন্ত রোগসহ আরও অনেক কারণের জন্য রাইনোসাইনোসাইটিস হতে পারে। গ্যাস্ট্র এসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স, পোস্ট নেজাল ড্রিপসিন্ড্রম ইত্যাদি কারণও জড়িত থাকতে পারে।

উপসর্গ : নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে সর্দি ঝরা, নাকের মধ্যে শুলশুল করা, চুলকানো, চোখ চুলকানো চোখ দিয়ে পানি পড়া, মাথা ধরা, ব্যথা করা, নাকের গন্ধ-বাসনার অনুভূতি লোপ পেতে পারে। গলার প্রদাহ, শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে। অ্যাজমার রোগীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়া, খাদ্যের স্বাদ পাওয়া যায় না, সর্বোপরি জ্বরও হতে পারে।

আহারে অরুচি আসতে পারে, দাঁত ব্যথা করতে পারে। নাক-কান-গলা এদের মধ্যে একটির সঙ্গে অন্যটির সংযোগ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

নাকের এক্স-রে করলে প্যারান্যাজাল সাইনাসের সমস্যা, নাকের হাড় বাঁকা বোঝা যায়।

রক্তের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালার্জির পরীক্ষা করা ইত্যাদি করে রোগ নির্ণয় করা যায়। বুকের এক্স-রে সব ধরনের রোগীদের জন্য বাধ্যতামূলক। প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, এছাড়া বয়স ৪০ পার হলে রক্তের সুগার এবং ইসিজি করা হয়।

একজন চিকিৎসক সাধারণত এই পরীক্ষাগুলো করে বুঝতে পারেন-ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাসজনিত কারণে নাকি অন্য কোন অ্যালার্জিজনিত কারণে সাইনোরাইনাইটিস হয়েছে।

যার অ্যালার্জিজনিত কারণে রাইনাইটিস হয়-তার যে কেবল মাত্র একটি অ্যালার্জেনের জন্য সমস্যা হবে তা নয়। একই ব্যক্তির একাধিক অ্যালার্জেন-অ্যালার্জিক রাইনাইটিস করে যাকে বলা হয় মিশ্র প্রকৃতির অ্যালার্জিক রাইনাইটিস।

এ যাবৎ কাল ৫৬টি অ্যালার্জেন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে যার মধ্যে ২৫ প্রকার খাদ্য রয়েছে।

চিকিৎসা : এক কোর্স এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিন প্রয়োজনে মন্টিলুকাস্ট, কিটোটিফেন, অক্সি বা জাইল মেটাজলিন নাকের ড্রপ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষ করে যাদের নাক বন্ধ থাকে- তাদের ক্ষেত্রে কর্টিকোস্টেরয়েড নাকের স্প্রে পর্যন্ত দিতে হয়। যেহেতু অ্যালার্জির জন্য একাধিক ফ্যাক্টর থাকে কাজেই ওষুধও একাধিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। ২ সপ্তাহের বেশি এন্টিহিস্টামিন ব্যবহারেও যদি ভালো ফল না পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে ওষুধের গ্রুপ বদল করতে হয়। মেনথল ভ্যাপার সকাল-বিকাল ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। তারপরও যদি কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়া যায়, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞগণ অ্যান্ট্রাল ওয়াশ পর্যন্ত করেন। সেটিও একাধিকবার প্রয়োজন হতে পারে।

অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় রোগীরা মেডিসিন, নাক-কান, গলা এবং বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞগনের চিকিৎসা নেন। তবে সবার আগে একজন রেজিস্ট্রার ফিজিশিয়ানের নিকট যাবেন। তিনি রক্তের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালার্জির পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, এবং সাইনাসের এক্স-রে করে রোগী কোন ধরণের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট গেলে উপকৃত হবেন-তিনি তার নিকট পাঠাবেন।

যারা দীর্ঘমেয়াদী রাইনোসাইনোসাইটিসে আক্রান্ত তাদের জীবন যাত্রার মানে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন-ঠান্ডা খাওয়া, ঠান্ডা লাগানো নিষেধ। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় এমনকি কর্ম ক্ষেত্রে যদি ধুলাবালির প্রকোপ থাকে, সে ক্ষেত্রে সাধারণ মাস্ক নয়, সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করবেন। বাড়িতে লোমশ গৃহপালিত জীব-জন্তু পোষা যাবে না। যথা- গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, হরিণ, মহিষ ইত্যাদি। সর্বক্ষেত্রে সূতির কাপড় ব্যবহার করতে হবে। কার্পেট ব্যবহার করা যাবে না। কেরোসিন বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করা যাবে না।

স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য সঠিক পরিমাণে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ করা। বিশুদ্ধ বায়ু সেবন এবং বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ধুমপান করা যাবে না।। এমনকি উক্ত বাড়িতে ধুমপায়ী বাস করলেও পরোক্ষভাবে রোগীর সমস্যা থাকবে। সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। প্রতিদিন নিয়মিত ও প্রয়োজনমতো ব্যায়াম, খেলাধুলা, কায়িক পরিশ্রম করা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

যে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। অসুস্থ হলে সুখ চলে যায়। সুখ না থাকলে মন মর্জিও ভালো থাকে না। যে কোন অসুস্থতাই মনে করে দেয় সুস্থ থাকা কতটা জরুরি। তারপরও যদি সাইনোসাইটিস থেকে মুক্তি না মেলে তখন অপারেশন পর্যন্ত করার প্রয়োজন হয়।

টেলিস্কোপ ছাড়া সাইনাসের অভ্যন্তরে অবলোকন করা বা কোনো রকম অপারেশন করা সম্ভব নয়। সাইনাস নাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারির মাধ্যমে ৯০% এরও বেশি সাইনাসজনিত সমস্যা নিরাময় করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে ক্রনিক সাইনোসাইটিস ও নাকের পলিপের একমাত্র চিকিৎসা এন্ডোস্কোপিক সার্জারি করা। বাংলাদেশে এ চিকিৎসা শুরু হয়েছে- তবে সার্জনদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল