নবজাতক ও শিশুদের হাইপোথায়রয়েডিজম

  ডা. শাহজাদা সেলিম ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাজমা বেগম ও পারভেজ দম্পতি সম্প্রতি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। নাজমা বেগম হাইপোথায়রয়েডিজমের রোগে ভুগছিলেন। একটু দেরিতেই তারা সন্তান নিতে সমর্থ হন। এর মধ্যে দু’বার অ্যাবরশন হয়ে যায়।

তিন সপ্তাহ পর তাদের একটু চিন্তা ক্লিষ্ট হতে হল। সুমাইয়া নামের এ বাচ্চা মেয়েটি খুব নরম তুলতুলে, খুব একটা কাঁদে না, প্রস্রাব ঠিক থাকলেও পায়খানা কম করছে বলে মনে হচ্ছে এবং নড়াচড়া খুবই কম।

সুমাইয়া নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজম (থায়রয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত সমস্যা)-এ ভুগছে। এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা খুব কম নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জায়গা, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে খাবারে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা বিরাজমান। গর্ভকালীন সময়ে যদি মা’র আয়োডিনের ঘাটতি থাকে তবে সন্তানের জন্মগত হাইপোথায়রয়েডিজমের আশঙ্কা বেড়ে যায়। নাজমা বেগমের মতো যে মহিলারা হাইপোথায়রয়েডিজমে ভুগছিলেন এবং সেটি যদি অটোইমিউন হাইপোথায়রয়েডিজম হয়ে থাকে, তা হলে তার নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজমে ভোগার আশঙ্কা বেড়ে যায়। অনেকের থায়রয়েড গ্রন্থিটি মোটেও তৈরি না হওয়া বা অকার্যকরভাবে তৈরি হওয়ার কারণে এ রোগ হচ্ছে। এদের ক্ষেত্রে এটি জীনগত ত্রুটি।

নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজমের লক্ষণ

* খুব কম নড়াচড়া করা * কান্নাকাটি কম করা বা কাঁদলে অনেকটা মিউ মিউ শব্দ হওয়া * খাদ্য গ্রহণে আগ্রহ কম * শরীরের বৃদ্ধিও খুব কম * জন্ডিস হওয়া * পায়খানা খুব কম হওয়া * শরীর তুলতুলে বা খুব নরম হওয়া * পেট খুব বেড়ে যাওয়া বা পাতিলের মতো হয়ে যাওয়া * মাথার তালু নরম থাকা * আনুপাতিক হারে বৃহদাকার জিহ্বা * নাভি বেরিয়ে আসা (আমবিলিকাল হারনিয়া) * শীতল খসখসে ও শুকনো ত্বক া ফ্যাকাশে * গলগণ্ড বা ঘ্যাগ থাকা * কিছু সংখ্যক নবজাতকের একই সঙ্গে আরও কিছু জন্মগত ত্রুটি থাকার আশঙ্কা থাকে।

যেসব বাচ্চার জন্মের সময় ওজন দুই হাজার গ্রামের কম বা চার হাজার পাঁচশ গ্রামের বেশি তাদের মধ্যে এ ধরনের রোগ থাকার আশঙ্কা বেশি থাকে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম স্ক্রিনিং বা শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

* জন্মের ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে নবজাতককে শনাক্তকরণ পদ্ধতির আওতায় আনা হয়।

* শিশুটিকে খুব যত্নসহকারে তীক্ষèভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, যাতে হাইপোথায়রয়েডিজমের যে কোনো লক্ষণ থাকলে তা ধরা পড়ে যায়।

* এরপর শিশুটি ল্যাবরেটরি টেস্ট করা হয়। একটু বেশি বয়সি শিশু হলে তার বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ)-র পরীক্ষা করা হয়।

কারণ : জীনগত ত্রুটি ছাড়া সবচেয়ে বড় কারণ হল খাদ্যে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত এলাকায় বসবাস করা। এর সঙ্গে যদি পরিবেশগত অন্য কোনো কারণ যোগ হয় তাহলে আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। থায়রয়েডের হরমোন তৈরিতে ব্যর্থতা, গ্রন্থির অস্বাভাবিকতা ইত্যাদিও থাকে। মাকে যদি গর্ভকালীন সময়ে রেডিও এক্টিভ আয়োডিন থেরাপি দেয়া হয়, তাহলে গর্ভস্থ শিশু থায়রয়েড গ্রন্থি তৈরি না হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রক্তের নমুনা ও গলার আল্ট্রাসনোগ্রাম করেই নিশ্চিতভাবে নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজম শনাক্ত করা যায়।

চিকিৎসা : যেসব নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজম ধরা পড়বে তাদের লেভোথায়রক্সিন ট্যাবলেট দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। পরবর্তীতে থায়রয়েড হরমোনের কার্যকারিতা দেখে লেভোথায়রক্সিনের মাত্রা ঠিক করা হয়। জীনগত, গ্রন্থির ত্রুটি বা থায়রয়েড গ্রন্থির অনুপস্থিতির কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। তা হলে রোগীটিকে আজীবন এবং বেশি মাত্রায় এ ওষুধটি সেবন করতে হয়। আর অন্য কারণগুলোতে কারও কারও ক্ষেত্রে কোনো এক সময় ওষুধ বন্ধ করার মতো পরিস্থিতিও হতে পারে।

চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল : যেসব নবজাতক/ শিশুর রোগ দ্রুত শনাক্ত হবে এবং সঠিক মাত্রায় থায়রক্সিন দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হবে, তাদের দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই হবে। কিন্তু রোগটি শনাক্তকরণে দেরি হলে অথবা সঠিকভাবে চিকিৎসা করা না হলে নবজাতক/ শিশুটির দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। মানসিক বৃদ্ধিও ঠিকমতো হবে না। সারা পৃথিবীতে যত কম বুদ্ধিসম্পন্ন বা হাবা-গোবা লোক আছে তাদের একটা বড় অংশই বৃদ্ধিকালীন সময়ে হাইপোথায়রয়েডিজমে আক্রান্ত ছিল বা সঠিকভাবে চিকিৎসা পায়নি।

লেখক : হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×