২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস

যক্ষ্মা নির্মূলের এই তো সময়

  ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যক্ষ্মা নির্মূলের এই তো সময়
প্রতীকী ছবি

আমাদের দেশে যক্ষ্মা এখনও একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে শুধু যে নিু আয়ের মানুষরাই আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়, বরং এই রোগ যে কারোরই হতে পারে। সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার যক্ষ্মারোগী মারা যাচ্ছে। সারা বিশ্বে এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

যক্ষ্মা রোগীর কাছাকাছি থাকেন এমন লোকজন- যেমন, পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, নার্স বা সেবা-শুশ্রূষাকারীর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, মাদক সেবন, বার্ধক্য, অপুষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যক্ষ্মার ঝুঁকি থাকে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যেমন- এইডস রোগী, দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধসেবী মানুষের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যক্ষ্মা কেবল ফুসফুসে হয় না

শতকরা ৮৫ ভাগ যক্ষ্মা ফুসফুসে হয়ে থাকে। ফুসফুসের আবরণী বা প্লুরাতে যক্ষ্মা হয়। লসিকা গ্রন্থি, মস্তিষ্কের আবরণী, হাড়, অন্ত্র ও ত্বকেও যক্ষ্মা হতে পারে। শুধু হৃৎপিণ্ড, নখ এবং চুল যক্ষ্মা রোগের আওতামুক্ত।

ফুসফুসের যক্ষ্মা আবার দুই ধরনের স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ বা কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী এবং স্পুটাম স্মিয়ার নেগেটিভ বা কফ জীবাণুমুক্ত যক্ষ্মা রোগী। এ দুই গ্রুপের মধ্যে স্মিয়ার স্পুটাম পজেটিভ রোগীরাই মারাত্মক সংক্রামক।

এদের ফুসফুস থেকে নির্গত যক্ষ্মা জীবাণু বাতাসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ লোকের শরীরে প্রবেশ করে এবং নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পর এদের মধ্যে কেউ কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার আওতায় আসেনি এমন একজন স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ রোগী বছরে একজন করে নতুন যক্ষ্মা রোগীর জন্ম দেয়।

যক্ষ্মার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেই কি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হবে

যক্ষ্মা রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত নাও হতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেও যক্ষ্মার জীবাণু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুসে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এর ফলে যক্ষ্মার সংক্রামক রোগ হতে পারে। তবে এর উপসর্গগুলো তেমন বোঝা যায় না এবং রোগ ছড়ায় না, বরং সুপ্তাবস্থায় থাকে।

যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, যক্ষ্মার জীবাণু খুব দ্রুত তাদের শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং দ্রুতাকারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় রক্ষাকারী কোষগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। একে সক্রিয় যক্ষ্মা বলা হয়ে থাকে।

আবার বছরের পর বছর যদি যক্ষ্মা রোগের জীবাণু শরীরে থেকে যায়, তাহলে কোনো এক সময় পরবর্তীতে সুপ্ত যক্ষ্মা থেকে সক্রিয় যক্ষ্মায় রূপ নিতে পারে।

ফুসফুসের যক্ষ্মার লক্ষণ

তিন সপ্তাহের অধিক সময় ধরে কাশি (শুকনো/কফযুক্ত) অন্যতম লক্ষণ। কাশির সঙ্গে রক্ত যেতেও পারে, নাও যেতে পারে। বুকে ব্যথা হওয়া, অস্বাভাবিকভাবে ওজন হ্রাস পাওয়া, অবসাদ অনুভব করা, সন্ধ্যায় হালকা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর (৯৯-১০১ ডিগ্রি) থাকতেও পারে/নাও থাকতে পারে, রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া ও ক্ষুধা মন্দা।

যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা

যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা সাধারণত দুই ভাগে বা ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়ে থাকে।

ক্যাটাগরি এক : ছয় মাস ধরে ওষুধ খাওয়া।

ক্যাটাগরি দুই : আট-নয় মাস ধরে ওষুধ খাওয়া।

এছাড়া, চিকিৎসা ব্যর্থতা কিংবা রোগী পুনরায় যক্ষ্মা আক্রান্ত হলে সেভাবেই চিকিৎসা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।

কখন সতর্ক হবেন

তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাশি (কাশির সঙ্গে রক্ত যেতেও পারে, নাও যেতে পারে), জ্বর, অরুচি, ওজন কমা, অবসাদ ইত্যাদি দেখা দিলে অবশ্যই যক্ষ্মা পরীক্ষা করা উচিত। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে লসিকাগ্রন্থির স্ফীতি, মলত্যাগের অভ্যাসে আকস্মিক পরিবর্তন, কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য, কখনও ডায়রিয়া, বুকে বা পেটে পানি জমা ইত্যাদিও যক্ষ্মার উপসর্গ হিসেবে বিবেচ্য।

যক্ষ্মা প্রতিরোধে করণীয়

যক্ষ্মা প্রতিরোধে জন্মের পরপর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেয়া। ফুসফুসের যক্ষ্মা ছোঁয়াচে। কেবল স্পর্শে এ রোগ ছড়ায় না। এ রোগ ছড়ায় হাঁচি, কাশি আর কফের মাধ্যমে। তাই রাস্তাঘাটে হাঁচি-কাশির বেগ এলে মুখে রুমাল চাপা দেয়া উচিত। যত্রতত্র কফ ফেলা উচিত নয়।

যক্ষ্মা নিয়ে ভয় নেই

যক্ষ্মা হলেও আতঙ্কিত হবেন না। আগে বলা হতো ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই’। এখন বলা হচ্ছে, যক্ষ্মা ওষুধে ভালো হয়। যক্ষ্মা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ছয় থেকে নয় মাসের পূর্ণ ডোজ ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিনামূল্যে এ ওষুধ প্রদান করে থাকে। ওষুধ অনিয়মিত খেলে পরবর্তী সময়ে ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মা হতে পারে, যা সারানো খুব জটিল।

দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি ক্লিনিক বা হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এনজিও ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়সহ যক্ষ্মার চিকিৎসা করা হয় ও ওষুধ দেয়া হয়। পূর্ণ মেয়াদে ওষুধ সেবন করতে হবে। তাই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কন্সালটেশন সেন্টার, লালবাগ, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×