বার্ধক্যে মানসিক স্বাস্থ্য

  ডা. সাইফুন নাহার ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বার্ধক্যে মানসিক স্বাস্থ্য
প্রতীকী ছবি

৫৮ বছর বয়সের মুনীর সাহেব খ্যাতনামা ব্যবসায়ী। বিভিন্ন ধরনের কাজের চাপ আর সংসারের চাপে থাকেন সারাক্ষণ। ৪৩ বছর বয়সে উচ্চরক্তচাপ এবং ৪৬ বছর বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। মুনীর সাহেবের বাবার ও এই দুটি রোগ ছিল। তাই তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন তার ও এ রোগ হতে পারে।

নিয়মিত চিকিৎসায় তার রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকায় তিনি ভালোই ছিলেন। দুই বছর আগে, তিন সন্তানের মাঝে সবার ছোট মেয়ে আলিয়াকে অনেক শখ করে নিজের পছন্দের বনেদী পরিবারে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আলিয়ার স্বামী মদে আসক্ত ছিল।

প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার আলিয়া শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে বাবার ঘরে চলে আসে। মুনীর সাহেবের প্রতিনিয়ত মনে হতে থাকে ‘আমি হেরে গেছি, পারলাম না মেয়েটাকে সুখী করতে’, তার নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকে, ভাবতে থাকেন ‘আর একটু খোঁজ খবর নিয়ে কেন বিয়ে দিলাম না, আমিই আমার মেয়ের সর্বনাশের জন্য দায়ী’ ইত্যাদি। প্রচণ্ড হতাশা তাকে আঁকড়ে ধরে।

নিজের কাজ, নিজের শরীর কোনো কিছুর প্রতি তার যত্ন নিতে ইচ্ছা করে না। ওষুধও নিয়মিত খান না। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ দুটোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে আসে। এতে তিনি আরও ভেঙে পড়েন। দুর্দান্ত, প্রতাপশালী মুনীর সাহেবের ক্রমাগত মনে হতে থাকে- ‘বেঁচে থেকে কি লাভ?’

নীরা রহমান ৬২ বছর বয়সের কাজপাগল নারী। পেশাগত জীবন থেকে অবসরে গিয়েছেন দুই বছর আগে। দশ বছর আগে তার স্বামী হার্ট এ্যাটাক করে মারা গিয়েছেন। শুরুতে খুব অসহায় বোধ করলেও পরে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। বড় ছেলে স্বপরিবারে কানাডায় সেটেল্ড।

ছোট ছেলে দেশেই থাকেন মায়ের সঙ্গে। আয়ান তার ছোট ছেলের ঘরের নাতি। সংসারের টুকিটাকি কাজ, ধর্ম-কর্ম, আয়ানের দেখাশোনা আর তার সঙ্গে গাল-গল্প করে ভালোই কাটছিল তার। আয়ানের বাবার খুব ইচ্ছা ছিল আয়ানকে ক্যাডেট কলেজে পড়াবে। বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছে আয়ান, সে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেয়েছে; বাবা-মা, দাদি সবাই খুব খুশি।

কিন্তু হঠাৎ নীরা লক্ষ্য করলেন তার নিজেকে খুব একা লাগছে, অসহায় লাগছে, কেমন একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে তার মনে, রাতে ঘুমাতে পারছেন না, দিনে কোনো কাজে মন দিতে পারছেন না, মাথাটা কেমন ঝিম ধরে থাকছে।

নীরা তার মনের, শরীরের পরিবর্তনগুলো টের পাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না কেন এমন হচ্ছে। আয়ান পড়াশোনা করে জীবনে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, আদর্শ মানুষ হবে এই স্বপ্ন তিনিও দেখেন, কিন্তু আয়ানের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টা তাকে কেন এত অস্থির করে তুলছে, বুঝতে পারছিলেন না নীরা।

আজমেহের বেগম ৬৫ বছর বয়সের নারী। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া ছাড়া শরীরের জটিল কোনো রোগ নেই। স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখে আছেন। ইদানীং তার চিন্তা ও আচরণে লক্ষণীয় কিছু পরিবর্তন এসেছে।

যেমন- তার স্মরণশক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে, কি খেয়েছেন, কি দিয়ে খেয়েছেন, গোসল করেছেন কিনা, নামাজ পড়েছেন কিনা ইত্যাদি মনে রাখতে পারেন না। রাতের বেলা এক ধরনের ভয় কাজ করে, তার ঘরে চোর ঢুকতে পারে, তাকে কেউ আক্রমণ করতে পারে ইত্যাদি। সারা রাত চিৎকার করেন, অন্যদের ডাকাডাকি করেন, ঘুমাতে পারেন না। অনেক সময় খেয়ে ভুলে যান, বলেন আমি তো খাইনি। আপনজনদের মাঝে কেউ তাকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করেন, কেউ হন বিরক্ত।

মুনীর সাহেব, নীরা রহমান এবং আজমেহের বেগমের মতো অনেকেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং বিভিন্ন প্রকার মানসিক রোগে আক্রান্ত হন।

৬০ বৎসর বয়সের ঊর্ধ্বে ১৫% মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণগুলোর মাঝে ৬.৬% মানসিক এবং স্নায়ুবিক কারণে হয়ে থাকে।

২০১৫-৫০ সালের মধ্যে ৬০ বৎসর এর বেশি বয়সের মানুষের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ (অর্থাৎ, বর্তমানে আছে ১২%, তা বেড়ে হবে ২২%)।

৬০ বৎসর বয়সের ঊর্ধ্বে ১৫% মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণগুলোর মাঝে ৬.৬% মানসিক এবং স্নায়ুবিক কারণে হয়ে থাকে।

বার্ধক্যে মানসিক রোগের কারণ

* বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সার্বিক কর্মক্ষমতা লোপ পেতে থাকে; চুলে পাক ধরে, দাঁত পড়ে, ত্বকে ভাঁজ পড়ে, হাড় ক্ষয় হতে থাকে, প্রজনন ক্ষমতা থাকে না বা কমতে থাকে।

* কর্মজীবন থেকে অবসরে যায়। সন্তানরা বড় হয়, তাদের নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়, অনেক সময় জীবিকা অর্জনের জন্য দূরে চলে যায় বা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বৃদ্ধ হলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, একাকীত্বের অনুভূতি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে।

* মধ্যবয়স থেকেই মানুষ জীবনের হিসাব নিকাশের খাতা খুলে বসে; কি পেলাম, কি পেলাম না এসব ভেবে ভেবে অস্থির থাকে, মানসিক চাপ তৈরি হয়।

* বয়স হলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, বিভিন্ন প্রকার দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ ও হাড়ক্ষয়রোগ ইত্যাদি দেখা দেয়। যেহেতু, মন আর শরীর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তাই একটি খারাপ থাকলে অন্যটিও খারাপ থাকে। যেমন হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে বিষণ্ণতার হার শারীরিকভাবে সুস্থ ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। আবার যাদের হৃদরোগ ও বিষণ্ণতা রোগ আছে তারা যদি বিষণ্ণতা রোগ এর চিকিৎসা না নেন, তাহলে তা হৃদরোগের পরিণতিকে খারাপের দিকে নিয়ে যাবে।

* দ্রুত নগরায়ন, ভৌগোলিক পরিবর্তন, শিল্পায়ন, সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যের প্রভাব, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন ইত্যাদি বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বার্ধক্যজনিত মানসিক রোগের মাঝে বিষণ্ণতা রোগ, উদ্বেগজনিত রোগ, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ, দেরিতে শুরু হওয়া সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার বা দ্বি-প্রান্তিক আবেগীয় রোগ, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বার্ধক্যে মানসিক রোগের সতর্কতামূলক লক্ষণ

* একটানা হতাশা, বিষণ্ণতায় ভোগা

* ইতিবাচক আবেগ অনুভব না করা

* অতিরিক্ত ঘুমানোর অথবা ঘুম না হওয়ার সমস্যা থাকা

* আত্মঘাতী চিন্তা করা

* ক্ষুধা, শক্তি স্তর এবং মেজাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন

* মনোযোগে সমস্যা হওয়া, অস্থির থাকা

* অতিরিক্ত চাপ বা উদ্বেগ অনুভূতি তৈরি হওয়া

* স্বল্পমেয়াদি-সাম্প্রতিক স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা লোপ পাওয়া

* রাগ, আন্দোলন বা আগ্রাসন বৃদ্ধি পাওয়া

* অবাধ্যতামূলক আচরণ প্রবণতা বা করা

* অস্বাভাবিক আচরণ বা চিন্তা করা

* স্থায়ী পাচক সমস্যা, শরীরের ব্যথা বা মাথাব্যথা যার সুনির্দিষ্ট শারীরিক রোগের কারণে হচ্ছে বলে প্রমাণ করা যায় না/ব্যাখ্যা করা যায় না- এমন লক্ষণ দেখা দেয়া।

বৃদ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে করণীয়

* বৃদ্ধদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান।

* বয়সজনিত দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও শারীরিক রোগ, মাদকাসক্তি ইত্যাদির সুব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

* বয়সবান্ধব সেবা এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

* বয়স্কদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

* মানসিক ও শারীরিক রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রদান অপরিহার্য।

* মনোসামাজিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং ওষুধ এর সমন্বয়ে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

* যেহেতু ডিমেনশিয়া সম্পূর্ণ ভালো করার কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, সেহেতু ডিমেনশিয়া রোগী এবং তাদের পরিচর্যাকারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

* বৃদ্ধদের নির্যাতন বন্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা।

* কমিউনিটিতে বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা।

* বয়স্কদের মাঝে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্তকরণ এবং তার ব্যবস্থাপনা করা।

* বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সদ্ব্যবহার করা। কারণ, যদিও আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যতটুকু রয়েছে তার ও পুরোটা ব্যবহৃত হয় না অসচেতনতা, অজ্ঞতা আর কুসংস্কার এর কারণে।

মানসিক স্বাস্থ্য এবং সার্বিক সুস্থতা বৃদ্ধ বয়সেও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ অন্যবয়সে। তাই, যদি কারও পরিবারের বয়স্ক সদস্যের মাঝে মানসিক রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, তবে যত দ্রুত সম্ভব প্রাথমিক চিকিৎসক অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত, রোগ গুরুতর হওয়ার আগেই সম্ভাব্য মানসিক রোগ নিরূপণ ও সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা উচিত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×