ইফতারে চাই ফলের সমাহার

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আখতারুন নাহার আলো

রোজার সময় শাক-সবজি কম খাওয়া হয়, এ কারণে ইফতারে ফল খাওয়াটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সব ধরনের ফলই পুষ্টিমান সমৃদ্ধ। ফলে আছে শর্করা, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, লৌহ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ বা ক্যারোটিন। ফলের মধ্যে পটাশিয়াম ও পানি থাকার কারণে দেহ শীতল হয় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

সবজির মধ্যে যে সমস্ত উপাদান থাকে, ফলের মধ্যেও সেই উপাদান থাকে। ইফতারে টক-মিষ্টি সব ধরনের ফল দিয়ে সালাদ, রায়তা করে খাওয়া যায়। ফলের রস পুষ্টিকর পানীয়। ফল খাবারের রুচি বাড়ায়। ফল সহজেই হজম হয় বলে এটা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। এতে আছে সহজ শর্করা লেভ্যুলোজ ও ফ্রুক্টোজ। ফলের চিনি শরীরকে তরতাজা রাখতে সাহায্য করে।

এতে ত্বক ও চুল সুন্দর ও মসৃণ থাকে। ব্রণ হওয়ার হাত থেকেও বাঁচায়। ইফতারে ভাজাপোড়া কমিয়ে দিয়ে ফলের প্রাধান্য দেয়া উচিত। ফল দিয়ে করা যেতে পারে সালাদ, ফালুদা, কাস্টার্ড, শরবত, আপেল-নাসপাতি পাকাকলার রায়তা, মিল্ক শেক ইত্যাদি। কয়েকটি ফল নিয়ে আলোচনা করা হল-

কাঁচা অথবা পাকা আমের শরবত : কাঁচা আমের সঙ্গে লবণ-চিনি-পুদিনাপাতা ও কাঁচামরিচ দিয়ে ব্রেন্ড করে শরবত করা হয়। আবার কাঁচা আম পুড়িয়ে লবণ ও গুড় দিয়েও শরবত করা যায়। শরীর ঠাণ্ডা রাখার জন্য এই পানীয় খুবই ভালো।

আমের পুষ্টিগুণের সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে যে সমস্ত উপাদান মেশানো হয়, সেটার পুষ্টিও মানুষ পেয়ে থাকে। যেমন- আমে আছে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম লবণে আছে সোডিয়াম।

চিনিতে আছে সহজ শর্করা, গুড়-শর্করা ও লৌহের উৎস। কাঁচামরিচ ও পুদিনা পাতায় আছে পটাশিয়াম ও ভিটামিন-সি। পুদিনাপাতা বমিভাব ও বমিরোধক হিসেবে কাজ করে। শরীর ঠাণ্ডা রাখার পাশাপাশি লিভার সুস্থ রাখতেও কাঁচা আম সাহায্য করে।

আনারস : এ সময় বাজারে প্রচুর আনারস দেখা যায়। এতে আছে অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রদাহ বিরোধী পদার্থ, বাত ও জ্বরের কারণে শরীরে ব্যথা হলে আনারসের রস তা দূর করতে সক্ষম।

টক-মিষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য এই ফল অনেকেরই প্রিয়। এতে ভিটামিন সি, ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স রয়েছে। আনারস দিয়ে শরবত গরমের সময় বেশ উপাদেয়।

পাকাকলা : ইফতারে এবং সেহরিতে পাকা কলা একটি শক্তিবর্ধক ও সহজপাচ্য এবং স্বাদযুক্ত ফল। বিরেচক (Laxative) বলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়ায় বেশ উপকারী। ফল হিসেবে খাওয়া ছাড়াও ইফতারে মিল্ক শেক করেও খাওয়া যায়। পাকাকলা রক্তস্বল্পতা রোধ করে। হাড় ক্ষয় রোধ করে, উচ্চরক্তচাপ কমায়, স্নায়ুতন্ত্রের দুর্বলতা সারায়।

কলায় যে ট্রিপটোফ্যান নামে এমাইনো এসিড আছে তা পরিবর্তিত হয়ে সেরোটোনিনে রূপান্তরিত হয়। দেহে সেরোটোনিনের মাত্রা বেশি হলে এটা হতাশা দূর করে। কলার মধ্যে যে পেকটিন আছে তা দেহের বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে।

কমলালেবু ও মাল্টা : এই দুটি ফল পাশাপাশি অবস্থান করলেও ইদানিং মাল্টার জনপ্রিয়তা কমলার চেয়ে অনেক বেশি। এই দুটি ফলের গুণাগুণ প্রায় একই রকম। এতে আছে বিটা ক্যারোটিন যা কোষের ক্ষয়রোধ করে। ক্যালশিয়ামের জন্য হাড় ও দাঁত ভালো রাখে। ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের জন্য রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে হার্টকে সুস্থ রাখে। সর্দিকাশি ও ভাইরাল ইনফেকশন থেকে বাঁচায়। ত্বকের সজীবতা বজায় রাখে। এক গ্লাস কমলা বা মাল্টার জুস ইফতারকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

পাকাপেঁপে : এটি সুস্বাদু ও সহজপাচ্য। এতে আছে বিটা ক্যারোটিন এছাড়া পাকাপেঁপে রাতকানা রোধে, অন্ত্রের গোলযোগ সারাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

বাঙ্গি : বাঙ্গির জুস ক্ষুধা বর্ধক। মূত্র ও মূত্রথলির প্রদাহ, কোষ্ঠবদ্ধতা, এসিডিটি ও আলসারে বাঙ্গি কার্যকর। বাঙ্গি শরীরের তাপমাত্রা কমায় ও ক্লান্তি দূর করে। পটাশিয়ামের জন্য রক্তচাপ কমায় ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এটি কিডনির পাথর ও হাড় ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।

সফেদা : সফেদার ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ নামক শর্করা শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এতে উচ্চ মাত্রায় লৌহ থাকার কারণে রক্তস্বল্পতা রোধ করে।

তরমুজ : সারাদিন রোজা রাখার ফলে শরীরে যতটুকু পানির ঘাটতি দেখা যায় তা তরমুজের রস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। এই ফলে পর্যাপ্ত লৌহ ও ভিটামিন এ আছে বলে রক্তস্বল্পতা ও রাতকানা রোগে বেশ উপকারী। তরমুজের রসের সঙ্গে সামান্য জিরার গুঁড়া ও লবণ দিয়ে পান করলে হৃদরোগে ভালো ফল পাওয়া যায়। তরমুজে লাইকোপিন থাকার কারণে ক্যান্সার রোধ করতে সাহায্য করে।

ডাবের পানি : ডাবের পানি বেশ শীতল ও তৃষ্ণা নিবারণ করে। একে স্বাস্থ্যকর পানীয় বলা যায়। পটাশিয়ামের জন্য রক্তচাপ কমায় ও হার্ট ভালো রাখে। প্রস্রাবের সংক্রমণ রোধ করে, ইলেকট্রোলাইটের সমতা ঠিক রাখে। ডিহাইড্রেশন রোধ করে। ডাবের পানি অ্যান্টিফাংগাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিভাইরাল হিসেবে কাজ করে। এটি ডিটক্সিফিকেশনেরও কাজ করে। ডাবের পানি দিয়ে ওষুধ খেলে সেটা ভালোভাবে শোষণ হয়। ডায়রিয়ায় ডাবের পানি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে।

পেয়ারা : দেশীয় ফলের মধ্যে আমলকী ছাড়া পেয়ারাতে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি আছে। একে প্রাচ্যের আপেলও বলা হয়। আপেলের চেয়ে বেশি ভিটামিন সি পেয়ারায় বিদ্যমান। পেয়ারায় আছে ক্যারোটিনয়েড এবং পলিফেনলস নামক রাসায়নিক যৌগ। পলিফেনল মানবদেহে ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর জারণ প্রতিরোধ করে।

ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চুল ও ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখে। পর্যাপ্ত আঁশ থাকার কারণে পেয়ারা কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কাজ করে। পেয়ারার ফ্লাভিনয়েড ডেন্টাল ক্যারিজ এর বৃদ্ধি প্রশমিত করে দাঁতের সুরক্ষা প্রদান করে।

খেজুর : রমজান মাসে খেজুরের ব্যাপক ব্যবহার বেড়ে যায় বলে খেজুরকে ইফতারের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইফতারে খেজুর গ্রহণের উপযুক্ত ব্যাখ্যা হল- সারাদিন রোজা থাকার ফলে শরীরে যে ক্যালরির ঘাটতি দেখা যায় খেজুর তা অল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করে দিতে পারে। খেজুর খুব সহজে হজম হয়ে দেহে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে থাকে।

এতে লৌহের পরিমাণ বেশি বলে রক্তস্বল্পতায় বেশ উপকারী। খেজুরের মধ্যে দ্রবণীয়-অদ্রবণীয় দু’ধরনের আঁশ বিদ্যমান। এতে আছে ক্যালসিয়াম, সালফার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও ম্যাগনেশিয়াম। এছাড়া আছে পর্যাপ্ত শর্করা।

এটি শারীরিক দুর্বলতা রোধ করে ও অবসাদ দূর করে। দাঁতের জন্য খেজুর উপকারী। ইফতারিতে ড্রেট-মিল্ক-শেক তৈরি করে খেলে বেশ উপকার হবে।

দেখা যাচ্ছে যে, ইফতারে যদি আমরা ভাজা খাবার কমিয়ে ফল দিয়ে ইফতারের প্লেট সাজাই তাহলে সেটা হবে স্বাস্থ্যকর ও রুচিকর। এই প্লেটে অবশ্যই একটি বা দুটি খেজুর থাকতে হবে।

লেখক : চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান, পুষ্টি বিভাগ (অব.) বারডেম হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামলী, ঢাকা