রমজানে কাজকর্ম এবং নিদ্রা

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন

দীর্ঘ একমাস রোজা থাকলে শরীরের সার্বিক কর্মক্ষমতা এবং ঘুমের ওপর কেমন প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে অনেকের বিশেষ কৌতূহল রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে।

সম্প্রতি আরব আমিরাতের আবুধাবির ইমপেরিয়াল লন্ডন ডায়াবেটিস সেন্টারে এ সম্পর্কে কয়েকজন গবেষক চমৎকার একটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের দেখার বিষয় ছিল রমজানে রোজা রাখলে বিশ্রামরত অবস্থায় মেটাবলিক রেট বা বিপাক ক্রিয়ার হার (resting metabolic rate), সার্বিক কাজকর্ম এবং সম্পূর্ণ শক্তি ব্যয় (total energy expenditure) বা ক্যালরি খরচের ওপর কেমন প্রভাব পড়ে? একই সঙ্গে তারা রোজা রাখলে ঘুমের ক্ষেত্রে কেমন পরিবর্তন হয় সেটাও লক্ষ করেছেন।

তারা মোট ২৯ জন রোজাদারকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এদের মধ্যে ১৬ জন মহিলা। আধুনিক পদ্ধতিতে তাদের মেটাবলিক রেট এবং প্রতিদিনের ক্যালরি বা শক্তি ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রোজার আগে কিংবা পরে রেস্টিং মেটাবলিক রেট প্রায় একই রয়েছে। রমজানের প্রথম সপ্তাহে এটা একটু বেশি থাকলেও, রোজার শেষ সপ্তাহে কিছুটা কমে গেছে।

রোজাদারদের সার্বিক কাজকর্মের পরিমাণ কমেছে। রমজানের সময় একজন রোজাদার কত কদম হাঁটছেন এবং রমজানের পরে কত কদম হাঁটছেন তার হিসাব করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেকের ঘুমানোর সময় এবং ঘুমের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে রোজা থাকা অবস্থায় হাঁটার পরিমাণ কমেছে এবং মোট ঘুমানোর সময় হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু সার্বিক ক্যালরি বা শক্তি ব্যয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেনি।

গবেষকদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, রমজান মাসের রোজা রাখার ফলে সার্বিক কাজকর্মের পরিমাণ এবং ঘুমের সময় কমলেও রেস্টিং মেটাবলিক রেট এবং মোট ক্যালরি ব্যয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পায় না।

ইতোপূর্বে কোনো কোনো পর্যবেক্ষণের ফলাফলে দেখা গিয়েছিল, রোজা থাকার ফলে ঘুমের সময় কমে যায় এবং দিনের বেলা তন্দ্রাচ্ছন্নভাব বেড়ে যায়। ফলে অনেকের মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে থাকে। সাম্প্র্রতিক পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়ে ভিন্ন ফলাফল দেখা যাচ্ছে।

রমজান মাসে ঘুমের ওপর প্রভাব সম্পর্কে সৌদি আরবের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের স্লিপ সেন্টার বা নিদ্রা কেন্দ্রে আটজন সুস্থ রোজাদার স্বেচ্ছায় এ গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছেন।

পলিসমনোগ্রামের (polysomnogram) সাহায্যে তাদের নিদ্রার বিভিন্ন পর্যায়, মস্তিষ্কের তরঙ্গমালা এবং অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। তাছাড়া রোজা থাকার ফলে তারা দিনের বেলা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকছেন কিনা বিশেষ পদ্ধতিতে সেটাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে, রমজানের মধ্যে এবং রমজানের পরে মিলিয়ে মোট পাঁচটি পর্যায়ে তাদের নিদ্রার অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রোজা রাখার পর র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM Sleep) বা দ্রুত অক্ষিঘূর্ণন পর্যায়ের নিদ্রার পরিমাণ কমে গিয়েছে। কিন্তু ঘুমের অন্যান্য পর্যায় কিংবা অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। মনে করা হচ্ছে ঘুমের পরিমাণ এবং গুণগত মান ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

যারা চা-কফি বেশি পান করেন, অধিক রাত জাগেন কিংবা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে হয়তো সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে রমজান মাসের রোজা ঘুমের জন্য বিশেষ কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না।

লেখক : স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইনজিনিয়াস পালমোফিট