ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বরের চিকিৎসা

  অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিম উদ্দিন ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া (জিকা নামে আরও একটা জ্বর) এডিস মশাবাহিত ভাইরাল ইনফেকশন।

ডেঙ্গু

তিনটা পর্যায়ে হয়। ফেব্রাইল, এফেব্রাইল (ক্রিটিক্যাল), কনভালেসেন্ট ফেজ।

ফেব্রাইল ফেজ

ভাইরাস জ্বরের যত উপসর্গ (জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা, পেট ব্যথা, বমি) সব হয়। ডেঙ্গু জ্বরের বিশেষত্ব হল গিরার চেয়ে হাড়ের ব্যথা বেশি (ব্রেক বোন ডিজিজ), চোখের পেছনে ব্যথা (চোখ ঘুরালে ভীষণ ব্যথা লাগে)।

২০০০ বা পরবর্তী সময়ের চেয়ে ইদানীং ডেঙ্গুর পার্থক্য হল এখন ব্রেনের প্রদাহ হয় (এনকেফালাইটিস)। এতে রোগীর খিঁচুনি হয়, অজ্ঞান হয়, নার্ভে ইনফেকশন হয়ে প্যারালাইসিস (গুলেন বারি, স্কুইন্ট) হয়, হার্টে মায়োকার্ডাইটিস হয় যেখানে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে। লিভারে প্রদাহের সঙ্গে অগ্নাশয় ও পিত্তথলির (পাথর না থাকলেও) প্রদাহ হয়। কিডনি ফেইলুর হয়। আগে এগুলো ডেঙ্গু কালীন অন্য রোগের উপসর্গ ভাবলেও এখন ডেঙ্গুর এটিপিক্যাল উপসর্গ বলছে। আসলে রোগ তো আর পাল্টায় নাই। ডেঙ্গু ডেঙ্গুই আছে, মশা ও এডিসই আছে, বদলেছে আমাদের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা। ২০০০-২০১০ সালের সময়ের হিমোরেজিক ডেঙ্গুতে আমরা ইসিজি চেঞ্জ পেয়েছি এমনকি হার্ট অ্যাটাক বলে এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে ধরা পরেছে যে এটা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) ছিল। এ অঞ্চলের (সিয়ারো) ডেঙ্গু গাইড লাইনে এগুলো ছিল না।

এফেব্রাইল ফেজকে ক্রিটিক্যাল বলার কারণ হল এ সময় রক্তক্ষরণ, শক এবং মৃত্যু হতে পারে।

ডেঙ্গুকে তিনভাবে বর্ণনা করা হয়। ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) ও ডেঙ্গু শক সিন্ড্রম। এখন ডিএইচএফ আগের তুলনায় বেশি; কারণ দ্বিতীয়বার হলে ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) হয়। একবার ডেঙ্গু হলে এক বছরের মধ্যে ডেঙ্গু হয় না। পরবর্তী সময় হওয়ার আশঙ্কা ০.৫%। রক্তক্ষরণ থাকলেই সেটা হিমোরেজিক নয়; জ্বরের সঙ্গে প্লাটিলেট সংখ্যা এক লাখের কম হতে হবে আর হিমাটক্রিট ২০% বাড়তে হবে অথবা বেশি থাকলে চিকিৎসায় ২০% কমাতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের সময় অনেকের পুনর্বার মাসিক (রক্তক্ষরণ) হয়, এটা প্লাটিলেট স্বাভাবিক থাকলেও হয়; এটা হিমোরেজিক ডেঙ্গু নয়। ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩ কে একত্রে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রম বলে। এ ধরনের পার্থক্যটা মূলত রক্তচাপ ও পালসের ওপর নির্ভর করে। যেমন প্রেসার পালস রেকর্ড না করা গেলে সেটা শক।

এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রম

২০১৩ সাল থেকে এটিপিক্যাল উপসর্গগুলোকে আমলে নিয়ে আরেকটি ক্যাটাগরি করা হয়েছে যেটার নাম এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রম। এটিপিক্যাল উপসর্গের সঙ্গে এখানে এসজিওটি, এসজিপিটি অনেক বাড়ে (এক হাজারের বেশি)। সব ডেঙ্গুতেই ওটি, পিটি বাড়ে তবে এত নয়; ওটি পিটির চেয়ে বেশি বাড়ে কারণ মায়োসাইটিস বা মাংসের প্রদাহ হয়। প্লাটিলেটও অনেক কমে।

ওয়ার্নিং সিম্পটম (সতর্কতামূলক উপসর্গ)

চিকিৎসা করতে গিয়ে ওয়ার্নিং সিমটম উপলব্ধি করতে হবে। বিশেষ করে বাচ্চাদের বেলায়। পেটের ব্যথা কমছেই না, বমি কোনো মতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না, রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে বা রোগী ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, পাল্স ব্লাড প্রসার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। হাত দিলে পেট শক্ত মনে হয় (পেরিটনাইটিস)। এগুলো হিমোরেজিক ডেঙ্গু খারাপ হওয়ার লক্ষণ; হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করার বার্তা। সময়োপযোগী উপযুক্ত চিকিৎসা পেলে ভালো হয়ে যাবে।

প্রতিকার

প্যারাসিটামল : ডেঙ্গু ফিভার অন্য ভাইরাসের মতোই। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কিছু লাগবে না।

পানি (ফ্লুইড) : পানি এবং পর্যাপ্ত পানিই ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা। প্রথম থেকেই তিন লিটার পানি নিশ্চিত করতে পারলে সাধারণত অসুবিধা হয় না। হিমোরেজিক ফিভারে রক্ত নালি লিক করে তাই রক্তকণিকা, প্রোটিন, পানি, লবণ সব এলোমেল হয়ে যায়; ক্রিটিক্যাল ফেজের দিনগুলোতে (২/৩ দিন) এগুলো হয়। লিকের জন্য শক হয়, শক প্রতিরোধের জন্য পানি দিতে হয়।

রক্ত ভরা : রক্তক্ষরণ হতে থাকলে, ব্লাড প্রেশার কমলে হিমাটক্রিট কমলে রক্ত দিতে হয়।

ক্যারিশমা হল ব্যালান্স ঠিক রাখা কারণ বেশি দিলে পানি ফুসফুসে (প্লুরাল ইনফিউশন), পেটে (এসাইটিস), ব্রেইন (ইডিমা) জমবে। সেজন্য গ্রেড-২ বা ওয়ার্নিং উপসর্গ থাকলে, গ্রেড থ্রি, ফোর হলে শকে গেলে, মাল্টি অর্গান ফেইলর হলে হাসপাতালে বিশেষ করে আইসিইউতে চিকিৎসা দিতে হবে ও ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুসারে ফ্লুইড দিতে হবে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় ফ্লুইড (পানি) ম্যানেজমেন্টই আসল। ডেঙ্গু চিকিৎসায় করটিকোস্টেরয়েড, প্লাটিলেট, প্লাটিলট রিচ প্লাসমা কোনোটারই কার্যকারিতা নাই।

কনভালেসন্ট পিরিয়ড : কনভালেসন্ট পিরিয়ডে জ্বর অনেক দিন (প্রোলংগড) থাকতে পারে, কোনো সংযুক্ত ইনফেকশন হল কিনা সেটা খুঁজতে হবে। অনেকে ডিপ্রশনে বা অযৌক্তিক দুর্বলতায় (ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রমে) ভুগতে পারেন।

ভ্যাক্সিন

ডেঙ্গুর ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হলেও ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয়নি। চিকুনগুনিয়ায় উদ্যোগ আছে।

বৃষ্টির এ মৌসুমে জ্বর ডেঙ্গু হয়, এখন তাই ব্যাপক হচ্ছে; সবচেয়ে বেশি হয় সেপ্টম্বর-অক্টোবরে। এ সময় যে কোনো জ্বর হলেই ডেঙ্গু ভেবে চিকিৎসা শুরু করা ভালো। তিন-চার দিন টানা জ্বর থাকলে সম্ভব হলে টিসিডিসি, এসজিপিটি, ডেঙ্গু এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্ট করা যেতে পারে (কোনোটাই অত্যাবশ্যকীয় নয়)। আক্রান্তদের প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ কার্যকরী নয়। পরিমিত পানিই সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতে ২০১৮ ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। অনিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা অনিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু চিকিৎসা করা যাবে না। শিশু, গর্ভবতী মা, প্রবীণ, ডায়াবেটিস বা অন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি (কো-মরবিডিটি) যাদের আছে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

চিকুনগুনিয়া

প্রথম ভারতবর্ষে ধরা পড়ে কলকাতায়, ১৯৬৩ সালে। জ্বরের সঙ্গে গিরার ব্যথা মূল উপসর্গ। এতে র‌্যাশ থাকে রক্তক্ষরণ হয় না, রোগী শকে যায় না এবং রোগী মারা যায় না।

ব্যথা

সব গিরায়ই ব্যথা হতে পারে তবে পা ও হাতে বেশি হয়। গিরা নাও ফুলতে পারে তবে ব্যথা (আর্থালজিয়া) মারাত্মক। চিকুনগুনিয়া শব্দটার অর্থ হল বাকা হয়ে (যাওয়া) দাঁড়ানো (stooped)। ঘাড়, পিঠের মাজার দাঁড়ায় অনেক ব্যথা হয় বলে এটা হয়। নামাজ পড়তে সিঁড়ি ভাঙতে মনে হবে গিরা মচমচ করে ভেঙে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে পাশ ফিরতে, টয়লেট করতে চরম ব্যথা। ব্যথা তিন সপ্তাহের মধ্যেই সারে, অনেকের তিন মাসের বেশি লাগে। সব ব্যথা সম্পূর্ণ সেরে যায়। ডেঙ্গুতে মাজায় ব্যথা হতে পারে, মাসল পেইন, বোন পেইন হলেও গিরায় এত সিরিয়াস ব্যথা হয় না বেশি দিন থাকে না।

র‌্যাশ

ম্যাকুলোপ্যাপুলার, ডেঙ্গুর মতো কনফ্লুয়েন্ট পেটিকিয়াল (রক্ত ক্ষরণ) নয়। ডেঙ্গুর মতো এটা সুস্পষ্ট হয় না। বাচ্চাদের, বয়স্ক রোগী ও অন্য অসুখে অসুস্থদের উপসর্গ মারাত্মক হতে পারে।

রক্তে প্লাটিলেট কমে না। সাত দিন পরে আইজিএম এন্টিবডি টেস্ট করে ডায়াগনোসিস কনফার্ম করা যেতে পারে। চিকিৎসার জন্য এটার দরকার নাই। ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়া একই সঙ্গে হতে পারে, একটা আরেকটার জন্য প্রোটেকশন দেয় না। এ বছরে আউট ব্রেক হয় নাই। ন্যাশনাল গাইড লাইন আছে।

চিকিৎসা

প্রথম সপ্তাহে জ্বরের চিকিৎসা ডেঙ্গুর মতো ই-রেস্ট, ৩ লিটার পানি, ৩ গ্রাম প্যারাসিটামল (অন্য কোনো ওষুধ নয়)।

জ্বর চলে গেলে (এ ফেব্রাইল ফেস) : হেমরেজিক ডেঙ্গুতে সতর্ক থাকতে হয় কারণ এ ক্রিটিক্যাল সময়ে রোগী শকে যেতে পারে। চিকুনগুনিয়াতে এই বিপদ নেই। জ্বরের পরে ব্যথা অনেককে ভীষণ ভোগায়, এনএসএইড লাগে। করটিকোস্টেরয়েড, হাইড্রোক্সি ক্লোরকুইনোলিন কোনো বিশেষ ফল দেয় না। রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে যত ব্যথাই হোক সম্পূর্ণ সেরে যাবে, জয়েন্টের কোনো ক্ষতি হবে না।

প্রতিরোধ

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রতিরোধ একই। মশা ঠেকাতে হবে। পাত্রের (জলকান্দা, নির্মীয়মান বাড়ির চৌবাচ্চা, ফেলে দেয়া টায়ার, নারিকেলের খোসা, পেপসি-কোলার ক্যান ইত্যাদি) পানি ৫ দিনের বেশি জমবে না, মশার লার্ভা হয়ে পাত্রে মশার বংশ বিস্তার হবে। ঘরের মশা মারার জন্য সম্ভব সব ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে, গৃহপালিত এডিস মশাকে মারতে হলে পাত্রে, টেবিলের নিচে, পর্দার ভাঁজে, ওয়েটিং রুমে স্প্রে করতে হবে। এবারের মশা প্রচলিত স্প্রেতে মরছে না, কার্যকরী স্প্রে হয়তো শিগগিরই আসবে।

লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×