অপর্যাপ্ত ঘুম

  ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য গ্রহণের মতোই মানবজাতির জন্য একটি মৌলিক বিষয় হল ঘুম। আবালবৃদ্ধবনিতা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ সব বয়সের মানুষই ঘুমায়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর আমরা সবাই ঘুমাই। ঘুম আমাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার অপরিহার্য অংশ। পরিতৃপ্তিদায়ক ঘুম আমাদের কর্মদীপ্ত করে। যা শিখি তা মনে রাখার জন্য, মনোযোগ তৈরি করতে, সমস্যা সমাধানে সহায়তা এবং নতুন চিন্তাধারা পুনর্জীবিত করতে পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক ঘুম প্রয়োজন। একজন সুষ্ঠু সবল যুবক সাধারণ দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টায় ঘুমায়। ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন কতটুকু ঘুম কোন বয়সের জন্য প্রয়োজন তার একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে।

বয়স দৈনন্দিন ঘুমের চাহিদা

০-২ মাস দৈনিক ১২-১৮ ঘণ্টা ঘুম

৩-১১ মাস ১৫ ঘণ্টা

১-৩ বছর ১২-১৪ ঘণ্টা

৩-৫ বছর ১১-১৩ ঘণ্টা

৫-১০ ১০-১১ ঘণ্টা

১০-১৭ ৫-৭ ঘণ্টা

পূর্ণ বয়স্ক ৭-৯ ঘণ্টা

অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং জটিল রোগের ঝুঁকিগুলোও জড়িত। আরামদায়ক ও পর্যাপ্ত রাতের ঘুম আমাদের সক্রিয় এবং সতেজ করে তোলে। উচ্চরক্তচাপ ও রক্তের উচ্চমাত্রার গ্লুকোজের ওপর অপর্যাপ্ত ঘুমের সরাসরি প্রভাব পড়ে। অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাব আমাদের মস্তিষ্কের ওপর সরাসরি পড়ে। যারা অপর্যাপ্ত ঘুমায় তারা বিচারিক চিন্তা-চেতনায় অপরিপক্বতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে। হার্ভার্ড মেডিকেলের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে আমাদের শরীরে কর্টিসল নামক একটি হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে আমাদের উচ্চরক্তচাপ ও রক্তের উচ্চমাত্রার গ্লুকোজের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে অ্যামাইলয়েড (ধসুষড়রফ) প্রোটিন নামক একটি প্রোটিন আমাদের নার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে, যা আমাদের ভুলে যাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আলঝেইমার নামক মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে মহিলাদের breast cancer-এর ঝুঁকি বেশি থাকে।

অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাব

মানসিক স্বাস্থ্য : অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সরাসরি প্রভাব আছে। অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং দ্রুত মুড পরিবর্তন হয়। ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিজঅর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগে ঘুমের পরিবর্তন লক্ষণীয়। দীর্ঘ সময় না ঘুমানোর প্রভাবে এ রোগগুলোর প্রকোপও বৃদ্ধি পায়।

মাইক্রো ঘুম : অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে অপ্রত্যাশিত ও অনিয়ন্ত্রিত ঘুম যা (কিছু সেকেন্ড থেকে কিছু মিনিট স্থায়ী হয়) মাইক্রো ঘুম নামে পরিচিত। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও জানে না কখন সে ঘুমিয়ে পড়ে। এ মাইক্রো ঘুম হওয়ার দরুন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া : অপর্যাপ্ত ঘুম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অকার্যকর করে দেয় এবং এরই প্রভাবে রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য আমাদের শরীরে কিছু কেমিক্যাল দায়ী যা সাটোকাইন নামে পরিচিত। অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে এ সাইটোকাইন (এক ধরনের অ্যান্টিবডি, যা জীবদেহে কোনো বিশেষ ক্ষতিকর পদার্থ, প্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ প্রোটিন যা ওই ক্ষতিকর পদার্থকে ধ্বংস করে) এর কাজের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, এর প্রভাবে রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়।

ওজন : অতিরিক্ত ওজনের জন্য দায়ী করা হয় অপর্যাপ্ত ঘুমকে। যারা ৫ ঘণ্টা বা তার কম সময় ঘুমায় তাদের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি সংখ্যকের মোটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে আমাদের শরীরে কর্টিসল নামক একটি হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি লেপটিন নামক আরেকটি হরমোনের পরিমাণ কমে যায়, যা আমাদের খাবার পরিতৃপ্তির জন্য দায়ী। এ দুই হরমোনের ভারসাম্যহীনতার জন্য বেশি খাওয়ার চাহিদা বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি ঘ্রেলিন নামক অপর একটি হরমোনের পরিমাণও বেড়ে যায়। এ হরমোনটি আমাদের খাদ্য গ্রহণ করার উদ্দীপনাকে বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাবে আমাদের শরীরে ইনসুলিনের অতিরিক্ত নিঃসরণ হয়। অতিরিক্ত ইনসুলিন বের হওয়ার প্রভাবে শরীর মেদ বহুল হয়ে পড়ে।

রক্তচাপ ও রক্তনালি : অপর্যাপ্ত ঘুম আমাদের রক্তনালিকে পরিবর্তন করে। রক্তনালির পরিবর্তন ও অতিরিক্ত ওজন আমাদের উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

অপর্যাপ্ত ঘুম কীভাবে বোঝা যায়

* খিটখিটে ভাব নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠা।

* সকালবেলা বিছানা ছাড়তে কষ্ট অনুভব করা।

* সারাদিন ক্লান্তি ভাব থাকা।

* সারাদিন ঘুমানোর তাগিদ অনুভব করা।

যদি কেউ এ সমস্যাতে ভুগেন তাহলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং এ অপর্যাপ্ত ঘুমের পেছনে ঘুমজনিত অন্য কোনো রোগ (যেমন : স্লিপ এপনিয়া, ইনসমনিয়া, ন্যাক্রোলেপ্সি) আছে কিনা, তা জেনে নিন।

লেখক : স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইনজিনিয়াস পালমোফিট, মোহাম্মদপুর, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×