ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও ফুসফুসের জটিলতা

  ডা. মো. আজিজুর রহমান ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী মশা কামড়ানোর ২ থেকে ৭ দিন পর উপসর্গ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়। সাধারণ উপসর্গ হল- জ্বরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বেড়ে যায়। জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। বিরামহীন মাথাব্যথা, হাড়, হাড়ের জোড় ও পেশিতে তীব্র ব্যথা, বমি ভাব বা বমি হওয়া, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, সারা শরীরের ফুসকুড়ি দেখা দেয়া, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। ডেঙ্গু যদি প্রথমবার আক্রান্ত করে এবং এটি যদি তরুণ বয়সে/শিশুদের হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেনো উপসর্গ থাকে না। জ্বরও থাকে না, এ রকমও হতে পারে। টিপিক্যাল ডেঙ্গু/ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকতে পারে।

জ্বর ১০২ এর নিচে থাকলে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যারাসিটামল খান, ১০২ এর উপরে গেলে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি দেন। বেশি বেশি ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলের জুস খান। খাওয়ার রুচি অনেক কমে যাবে, তথাপি জোর করে হলেও খেতে থাকেন। প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ খাবেন না, কারণ ব্যথার মেডিসিন খেলে রক্তক্ষরণ হতে পারে, এমন কি মৃত্যু হতে পারে। প্যারাসিটামল জ্বর এবং শরীর ব্যথায় কার্যকর ওষুধ।

এ সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে তরল গ্রহণ করার মাধ্যমে দ্রুত রোগমুক্ত হওয়া যায়। এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গু সচরাচর সেরে যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

হেমোরেজিক ফিভারের মধ্যে একটি রক্তপাত নিয়ে আসতে পারে। আরেকটি সরাসরি শকে চলে যেতে পারে। এগুলো অস্থিতিশীল। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুতে রক্তপাত হয়, তবে রোগী মারা যায় না। এর মানে হেমোরেজিক ফিভারের মধ্যে যেগুলো শকে চলে যাচ্ছে, পাশাপাশি এক্সপেনডেট ডেঙ্গু শক সিনড্রম, যেগুলো সেগুলো হল অস্থিতিশীল। তারা মারা যেতে পারে। তাদের ঝুঁকি অনেক।

শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস প্রবেশ করলে কী হয়

সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন শরীরে এর বিস্তারকাল। রক্তের মনোসাইটকে আক্রমণ করে থাকে, শরীরে আক্রান্ত মনোসাইট ও লিম্ফোসাইটের মধ্যে এক যুদ্ধ চলে। নিঃসরণ হয় অনেক রকমের কেমিক্যাল মেডিয়েটর ও সাইটোকাইন। তারা কিনা রক্তের উপশিরা সূক্ষ্ম জালিকা শিরাকে ছিদ্রময় করে তুলে। ফলে উপশিরা জালিকা শিরা দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে। পেটে ও অন্যান্য শিরা বহির্ভূত স্থানে এসে জমে। জলীয় অংশ কমাতে রক্ত হয়ে পড়ে ঘন এবং শ্লথ। ডেঙ্গুর এই জীবাণু আবার আক্রমণ করে হাড়ের ভেতরের মজ্জার অনুচক্রিকা (প্লাটিলেট) উৎপাদক ম্যাগাকারিওসাইট সেলগুলোকে। যত বেশি মনোসাইট ও লিম্ফোসাইটের যুদ্ধ, শরীরে তত এন্টিবডি উৎপাদন আর তত ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের প্রকোপ। ফুসফুসের অভ্যন্তরে বায়ুকুঠুরির মাঝের পর্দা ছিঁড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয় ফলশ্রুতিতে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং কাশির সঙ্গে রক্ত এসে একই সঙ্গে দুই ফুসফুসের পর্দায় পানি আসার কারণে শ্বাসকষ্ট হয়।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ

শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের ওপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। এ উপসর্গগুলো চোখে পড়লে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ডেঙ্গু জ্বর হলেই যে হাসপাতালে ভর্তি হতেই হবে তেমন নয়।

ভুল ধারণা

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে, অনেকেই ভাবে ডেঙ্গু একবার হলে মনে হয় আর হয় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা।

ডেঙ্গু একবার হলে যে আরেকবার হবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং দ্বিতীয়বার হলে এর মাত্রা আরও বেশি হয়। চিকিৎসকদের মতে, যে ধরনের এডিস মশার কারণে একবার ডেঙ্গু হয়, সেই একই ধরনের ভাইরাস থেকে একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবে না। এডিস মশার বাকি তিন ধরনের ভাইরাস থেকেও ব্যক্তি আবারও আক্রান্ত হতে পারে। পেঁপের রসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ভালো হয় এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডেঙ্গু নিরসনে পেঁপে পাতার রসের ভূমিকার পরীক্ষা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি যে, এটি ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে পেঁপে পাতার রসের কার্যকারিতার বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

শরীরে নারিকেলের তেল মাখলে মশা কামড়ায় না- তেল শরীরে মাখলে কত মিনিট থাকে? এরপর তো তা শুকিয়ে যায়। শরীরে তেল মাখলেই মশা কামড়াবে না সে কথা বলা ঠিক না।

লেখক : বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইবনেসিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসাল্টেশান সেন্টার, লালবাগ, ঢাকা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×